ইসলামে হারাম এলাকা বলতে এমন একটি পবিত্র ও সুরক্ষিত ভৌগোলিক সীমানাকে বোঝায়, যেখানে আল্লাহতায়ালা সাধারণ জায়গার তুলনায় বিশেষ সম্মান ও কিছু নির্দিষ্ট কাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। পবিত্র মক্কা নগরীর মসজিদে হারাম ও এর চারপাশের নির্দিষ্ট পরিধি এবং মদিনার নির্দিষ্ট স্থান হারাম এলাকার অন্তর্ভুক্ত। হারাম এলাকার সীমানা সুনির্দিষ্ট পিলার দিয়ে চিহ্নিত করা।
হারাম এলাকা হিসেবে মক্কা-মদিনা মুসলমানদের কাছে পবিত্র দুই নগরী। এ দুই নগরীর নির্দিষ্ট হারাম এলাকায় শিকার, গাছপালা নষ্ট করা ও রক্তপাতের বিষয়ে বিশেষ বিধান রয়েছে ইসলামে। হারানো বস্তু কুড়িয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ নির্দেশনা। এসব বিধানের কিছু ইহরাম ছাড়াও প্রযোজ্য। হজ, উমরা ও জিয়ারতের উদ্দেশ্যে প্রতিবছর অসংখ্য মুসলমান এসব এলাকায় যান। তাই সেখানে প্রযোজ্য শরিয়তের বিধান সম্পর্কে জানা এবং সেগুলো মেনে চলা জরুরি।
কোরআনে কারিমে হারামের মর্যাদা: পবিত্র কোরআনে কাবাঘরকে নিরাপত্তার স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যে এতে প্রবেশ করে, সে নিরাপদ।’ -সূরা আলে ইমরান: ৯৭
অন্য আয়াতে মক্কাকে নিরাপদ জনপদ হিসেবে উল্লেখ করে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা কি দেখে না যে, আমি হারামকে নিরাপদ স্থান করেছি, অথচ তাদের আশপাশ থেকে মানুষকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়?’ -সূরা আনকাবুত: ৬৭
আয়াত দু’টি কাবাঘর ও মক্কার বিশেষ মর্যাদা এবং নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে হারাম এলাকায় কোন কাজগুলো নিষিদ্ধ, সে বিষয়ে হাদিসে আরও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
শিকার ও বন্যপ্রাণীকে তাড়া করা: মক্কার হারাম এলাকার ভেতরে শিকারযোগ্য বন্যপ্রাণী শিকার করা কিংবা তাড়া করে ভয় দেখানো নিষিদ্ধ। শিকার করতে সহযোগিতা করাও এ বিধানের পরিপন্থী। এ নিষেধাজ্ঞা শুধু ইহরাম পরিহিত ব্যক্তির জন্য নয়, হারাম এলাকার নিজস্ব বিধান হিসেবেও প্রযোজ্য। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মক্কার শিকার তাড়া করা যাবে না। -সহিহ বোখারি: ১৮৩৪
মদিনার হারাম এলাকাতেও শিকার ও বন্যপ্রাণীর বিষয়ে বিশেষ বিধান রয়েছে। সেখানে অবস্থানকালে স্থানীয় বিধান মেনে চলা জরুরি।
প্রাকৃতিক গাছপালা কাটা বা নষ্ট করা: মক্কার হারাম এলাকার প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গাছ কাটা, ডাল ভাঙা কিংবা ঘাস উপড়ে ফেলা নিষিদ্ধ। ইহরাম না থাকলেও এ বিধান মানতে হবে। তবে হাদিসে ‘ইযখির’ নামের এক ধরনের ঘাস কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তাই সব উদ্ভিদের বিধান এক ধরে নেওয়া ঠিক নয়। -সহিহ বোখারি: ১৮৩৪
মদিনার হারাম এলাকাতেও গাছ কাটা ও প্রাকৃতিক উদ্ভিদ নষ্ট করার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনাকে হারাম ঘোষণা করে জানান, সেখানকার গাছ কাটা যাবে না। -সহিহ বোখারি: ১৮৬৭
হারানো জিনিস নিজের কাছে রেখে দেওয়া: মক্কার হারাম এলাকায় টাকা, ব্যাগ, মোবাইল বা অন্যকোনো হারানো জিনিস পেলে তা নিজের সম্পদ মনে করে রেখে দেওয়া যাবে না। হজরত রাসুলুল্লাহ (স.) নির্দেশ দিয়েছেন, সেখানকার হারানো বস্তু তোলা যাবে এমন ব্যক্তির জন্য, যিনি মালিককে খুঁজে দেওয়ার উদ্দেশ্যে যথাযথভাবে ঘোষণা করবেন। -সহিহ বোখারি: ১৮৩৪
হারানো জিনিসের মালিককে খুঁজে দেওয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব না হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া উচিত। এতে প্রকৃত মালিকের কাছে সম্পদটি ফেরত দেওয়ার সুযোগ থাকে।
রক্তপাত ও যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত হওয়া: মক্কার হারাম এলাকার বিশেষ মর্যাদার কারণে সেখানে যুদ্ধ ও রক্তপাতের ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। হজরত রাসুলুল্লাহ (স.) মক্কা বিজয়ের দিন জানান, আল্লাহতায়ালা এ শহরকে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই সম্মানিত করেছেন। কেয়ামত পর্যন্ত এর সেই মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে। -সহিহ বোখারি: ১৮৩৪
এই বিধান পবিত্র এলাকার নিরাপত্তা ও মানুষের জানমালের প্রতি সম্মানের গুরুত্ব তুলে ধরে। হজ ও উমরার সময় ভিড়ের মধ্যে অন্যকে কষ্ট দেওয়া, সংঘাতে জড়ানো কিংবা কারও অধিকার নষ্ট করা থেকেও বিরত থাকা উচিত।
হারাম এলাকার সীমানা অতিক্রমের সময় সতর্ক থাকা: মক্কার হারাম এলাকা শুধু মসজিদে হারামের চত্বর নয়। শহরের চারপাশে নির্ধারিত বিস্তৃত অঞ্চল এর অন্তর্ভুক্ত। বিভিন্ন প্রবেশপথে সীমানা চিহ্নিত করা আছে। পরিচিত সীমানা-নির্দেশক স্থানগুলোর মধ্যে মদিনার পথে তানঈম, জিইরানার দিক এবং জেদ্দার পথে শুমাইসি উল্লেখযোগ্য।
মদিনার হারাম এলাকারও নির্ধারিত সীমানা রয়েছে। হাদিসে একে ‘আয়র’ থেকে ‘সাওর’ পর্যন্ত বিস্তৃত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য বর্ণনায় দুই কালো পাথুরে ভূমির মধ্যবর্তী অঞ্চলকে সীমানা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। -সহিহ মুসলিম: ১৩৭০
তাই দুই পবিত্র নগরীতে ভ্রমণের সময় সীমানা-নির্দেশক চিহ্ন ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত।
বিধান লঙ্ঘিত হলে করণীয়: হারাম এলাকার কোনো বিধান লঙ্ঘিত হলে করণীয় কাজের ধরন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন হয়। কিছু ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ বা অন্য বিধান প্রযোজ্য হওয়ার প্রশ্ন আসে। তাই এমন পরিস্থিতিতে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পাশাপাশি সৌদি আরবের স্থানীয় আইন ও কর্তৃপক্ষের নির্দেশনাও মেনে চলতে হবে।
হারাম এলাকার মর্যাদা রক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জানমাল ও নিরাপত্তা রক্ষা এবং আল্লাহতায়ালার সৃষ্টির প্রতি সম্মান প্রদর্শন। হজ, উমরা ও জিয়ারতে গিয়ে এসব বিধান জানা থাকলে অনিচ্ছাকৃত ভুল এড়ানো সহজ হয়। সেখানকার বিশেষ বিধান জেনে মেনে চলা এবং অন্যের অধিকার ও নিরাপত্তার প্রতি যত্নবান হওয়া প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব।
