এ বছরের ‘সপ্তডিঙার গুপ্তধন’-এর পর আপনাকে কি ব্লকবাস্টার নায়ক বলব?
না, আমি কোনওদিন কোনও তকমায় বিশ্বাস করিনি। আমার কৃতজ্ঞতা এবং ভালোবাসা সমস্ত দর্শকদের প্রতি। এটা আমার চরম পাওয়া।
প্রায়ই শোনা যায়, বাংলায় কিছু হচ্ছে না।
এটা বললে অকৃতজ্ঞর মতো কথা হবে। বিশেষ করে শেষ ছবিটা। আমার এ বছর সতেরো বছর হয়ে গেল ইন্ডাস্ট্রিতে। আমি ইন্ডাস্ট্রিতে থাকতেই পারতাম না, যদি না কিছু হত। চাকরি ছেড়ে এসে এখানে এত ভালোবাসা পাচ্ছি। কাজেই আমার দর্শকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা রয়েছে। বাট হ্যাভিং সেড দ্যাট, যে পরিমাণ বাংলাভাষী মানুষ গোটা বিশ্বে আছে, সেই তুলনায় বাংলা ছবি দেখা হচ্ছে না। এবার আমরা যদি বলি দর্শকরা দেখছেন না, দর্শকরা উল্টে বলবেন, আপনারা সেরকম ছবি বানাচ্ছেন না। এটা কিন্তু পরস্পর দোষারোপের জায়গা নয়। আমাদের প্রচুর ইমপ্রুভমেন্টের জায়গা আছে, সেরকম ছবি দেখারও অভ্যাস এবং কনস্ট্রাক্টিভ ক্রিটিসিজমের জায়গাটা করতেই হবে। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
ব্লকবাস্টার নায়ক রূপে যতটা সেলিব্রেশন পাওয়া উচিত ছিল, ততটা কি পেয়েছেন?
না, তার অনেকগুলো কারণ আছে। আমরা যে মধ্যবিত্ত মানসিকতায় বড় হয়েছি, আনন্দ উদযাপন করতে শিখিনি। আনন্দ সেলিব্রেট করতে গেলে আমাদের ভিতর থেকে একটা পোকা কড় কড় করে ওঠে, যে শেখায়, অতি বাড় বেড়ো না। ব্যর্থতা কীভাবে হ্যান্ডেল করতে হয়, তার অনেক ক্লাস হয়, বইও আছে। সাফল্য কীভাবে উপভোগ করতে হয় মাটিতে পা রেখে, আমরা হয়তো জানি না।
অবশেষে ‘এম্পারর ভার্সেস শরৎচন্দ্র’-তে সৃজিত মুখোপাধ্যায় আপনাকে অন্যতম কেন্দ্রচরিত্র দিলেন?
হুম, বলল ‘তোর তো খুব অভিমান। আমি নাকি তোকে ভালো চরিত্র দিই না। দেখ, এটা করবি কি না।’ আমি বললাম, ‘না না, সেরকম ব্যাপার নয়।’ সৃজিতের সঙ্গে আমার কয়েকবার ক্রিয়েটিভ ডিফারেন্সস হয়েছে, বাদানুবাদ হয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগত ঝগড়া কখনও হয়নি। সেটা সৃজিতের ম্যাচিওরিটির জন্য হয়নি। সৃজিত কখনওই মনে করিনি যে, আমি ওকে রিজেক্ট করেছি। সৃজিত বিভিন্ন ধরনের চরিত্র আমাকে দিয়েছে। এর আগে আমাকে ‘শাহজাহান রিজেন্সি’-তে ‘স্যাটা বোস’ দিয়েছিল। আর এখানে ‘সব্যসাচী’। দুটোই স্বয়ং গুরু (উত্তমকুমার) করে গিয়েছেন। এই রোলটা দেওয়ার জন্য ওকে ধন্যবাদ। এতগুলো ছদ্মবেশ, বিভিন্ন শরীরী ভাষা। তার মধ্যে দু’হাতে বন্দুক। যেরকম শারীরিক শক্তি, তার চেয়েও ক্ষুরধার মানসিক বুদ্ধি। আমার কাছে যেটা ইমপর্ট্যান্ট লাগছে এই ছবিটার যে গুরুত্ব, ইতিহাস ও শিকড়কে ফিরে দেখা। ভারতের স্বাধীনতা অর্জনে বাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামী, বাঙালি লেখক, বাংলার মানুষ, বাংলার দার্শনিকদের ঠিক কতটা অবদান একটু মনে করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন। এখন তো আরও।
এই কিংবদন্তি চরিত্রে অভিনয় করার জন্য আলাদা প্রস্তুতির দরকার ছিল?
আমি সৃজিতকে ফলো করেছি। ‘পথের দাবী’ আগে পড়া ছিল। নতুন করে আর পড়িনি। এটা আমি খুব স্ট্রিক্টলি ফলো করি। আমার চেনা গল্প, আমার চেনা সিনেমার রেফারেন্সে যদি কোনও কাজ করি, চিত্রনাট্যে মনোযোগ দিই। কারণ আমাকে পরিচালকের ভিশন ফলো করতে হবে।
পুজোর সময় এই রকম সিরিয়াস ছবি আসছে। দর্শক কতটা আগ্রহী হবে?
আমাদের শিকড়ে ফিরে যাওয়ার কথা রয়েছে। এই ছবিগুলোর কথা বেশি করে বলা উচিত। আমাদের ইতিহাসটা যেন গুলিয়ে না যায়। আমরা একটু আয়নার সামনে দাঁড়াই। আমাদের এই মনীষীরা, স্বাধীনতা সংগ্রামীরা অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো লেখককে শাসকের হুমকি শুনতে হয়েছে! বই ব্যান করে দেওয়া হয়েছে। আমরা তো চুনোপুঁটি। ওঁকেই যদি শাসকরা এইভাবে ট্রিট করে, একশো বছরে খুব কি বদল হয়েছে? তা হলে আমরা কী করলাম! ওঁরা যদি বেঁচে থাকতেন, তা হলে আমাদের কী বলতেন। আমরা কি এই দেশটার স্বপ্ন দেখেছিলাম? শরৎবাবু নিজেও বলছেন, এই চরিত্রটায় রাসবিহারী বসুর ছায়া আছে। কোথাও নেতাজির ছায়াও আছে। কোথাও যদুগোপাল মুখার্জির। মাস্টারদার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। এই মানুষগুলো সত্যিই সুপার হিউম্যান ছিলেন। আমার সুযোগ হল তাঁদের প্রণাম জানানোর। মুক্ত চিন্তার দরকার। কিন্তু তার পরেও কী কী বাধা আসতে পারে তার জন্য ছবিটা দেখা দরকার। আর বাক্স্বাধীনতার মানে কিন্তু এই নয়, যে যা খুশি বলে যাব। বা যেখানে খুশি বলে যাব, যাকে খুশি বলে যাব। আমি যেটা বলব তার দায়িত্ব আমাকে নিতে হবে।

শরৎচন্দ্রের (টোটা রায়চৌধুরি) লেখা চরিত্র ‘সব্যসাচী’ আপনি। সেখানে এই ছবিতে তাঁর সঙ্গে স্ক্রিন স্পেস কীরকম?
সেটা এক্ষুনি বলছি না। এটাই বলছি টোটাদার সঙ্গে আমি ‘আবর্ত’ করেছিলাম। সেখানে খুব বেশি সময় আমরা স্ক্রিনে ছিলাম না। তো একসঙ্গে স্ক্রিনে থাকার খিদেটা এখনও মেটেনি আমাদের। আমরা চাই, একসঙ্গে স্ক্রিনে থেকে পার্টটা করতে।
আপনার কাজ দেখে উত্তমকুমারের কথা মনে পড়তে পারে।
‘পথের দাবী’, ‘সব্যসাচী’ এটা তো মনে পড়বেই। কিন্তু আলাদা করে ছবিটা দেখে মনে হবে না, এই ছবির ফরম্যাটটাই আলাদা। ‘পথের দাবী’র অ্যাডপটেশন নয়। বরং আমি মজা করে বলছি, আজকের ভাষায় বলতে গেলে এটা ‘পথের দাবী’র বিটিএস। শরৎবাবু কেন এটা লিখছেন এই বিষয়গুলো রয়েছে। ওঁর এত জনপ্রিয় লেখার থেকে এটা তো অন্যরকম। লেখার সঙ্গে সঙ্গে জনপ্রিয়তা শুরু হল। তাতে আরও ভয় পেয়ে গেল ব্রিটিশ সরকার। আরও রেগে গেল। এবার উনি সেটাকে কীভাবে ফেস করছেন। বলছেন, আমার হাতে বন্দুক, বোমা নেই। কলমের শক্তি আছে। কেন তিনি ‘পথের দাবী’-তে এরকম একটা চরিত্র তৈরি করছেন, যেটাকে আমরা অক্ষরিক অর্থে বলতে পারি অতিমানবিক। কারণ প্রয়াসটা অতিমানবিক। এবং তার পরে একটা সময় ওঁর রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মতান্তর হয়েছিল। সেটাও এখানে আছে।
শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে জুটি বেঁধে একাধিক কাজ করেছেন এবার প্রতিপক্ষ।
পরপর তিনটে পুজোতে আমার ওদের সঙ্গে ছবি ছিল। প্রত্যেকেই প্রতিপক্ষ। লড়াই, প্রতিযোগিতা অবশ্যই থাকবে। কে কটা শো পেল, কে কী বলছে, কার ব্যবসাটা কী হল – এই নিয়ে আমরা শিকারি বাজের মতো নজর রাখি। আমি শুধু আশা করতে পারি, প্রতিযোগিতা যতটা সভ্য ভাবে মানুষের সামনে আনা যায় তত ভালো। সবাই রক্তমাংসের মানুষ। কেউ ধোয়া তুলসীপাতা নই। কিন্তু সেটা যেন জনসমক্ষে না হয় এটাই আশা করব। আমার একটা অন্য ভিউ পয়েন্ট আছে। একজন ইন্ডাস্ট্রির মেম্বার হিসাবে আমি গর্বিত যে, আমাদের ইন্ডাস্ট্রি কিন্তু করে দেখাল একটা পুজোতে চারটে স্বাদের গুরুত্বপূর্ণ ছবি তারা আনল প্রযোজক, পরিচালক, টেকনিশিয়ান্স, আর্টিস্ট সকলে মিলে। সেটা নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার।
‘দেশু’র সঙ্গে লড়াইটা কী রকম হবে?
একটা নয়, প্রত্যেকটা ছবির কথাই বলব। ‘বহুরূপী’র সঙ্গে আমার সবচেয়ে নিবিড় সম্পর্ক। ওটায় আমি ছিলাম। যে চরিত্রে যিশু অভিনয় করছে সেটার গান বা টিজার দেখে বুঝতে পারছি ওই চরিত্রটার সঙ্গে ওই পুলিশের কোনও মিল নেই। সম্পূর্ণ অন্য আঙ্গিক। গল্পের ধাঁচটা এক থাকলেও বলার ভঙ্গি বদলে যাচ্ছে। শিবুদা, নন্দিতাদি ওঁদের গোটা টিমটা তারা তো একদিনে এই জায়গাটায় পৌঁছয়নি। ওঁরা নিজেদের মার্কেট তৈরি করেছিল ধীরে ধীরে। একেনের প্রসঙ্গে আসি। একটা লেখা, সেখান থেকে একটা সিরিজ, সিরিজ থেকে সিনেমা, তুমুল জনপ্রিয়তা। একেনের যে বেসিক স্কেচটা ছিল তার সঙ্গে অনির্বাণের কোনও মিল নেই। অনির্বাণ এতটাই জনপ্রিয় করেছে চরিত্রটাকে একেন বললেই অনির্বাণের মুখ ভেসে ওঠে। এই জার্নিটাকে অ্যাপ্রিসিয়েট করি। আর ‘দেশু’র ক্ষেত্রে অনেকেই বলছে, কী করে এত আগে গোল্ডেন টিকিট বিক্রি হয়? ওরা তো করে দেখিয়েছে। আর একটা ব্যাপার বলছি। চোরোগোপ্তা থাকবেই। আমি শুধু বলছি আরেকটু ট্রান্সপারেন্সি থাকুক। ‘স্বচ্ছতা’ শব্দটা কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ। (হাসি)
