শেখ সাদলী আল জাদিদ ও মালিক ফারিহা মেহনাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ৪৬তম ব্যাচের সহপাঠী। ভর্তি পরীক্ষায় সাদলী ১১তম ও ফারিহা ২০তম স্থান অধিকার করেন। ১৭তম বিজেএসে তৃতীয় হয়ে সিভিল জজ পদে নিয়োগ পান সাদলী। পরের বছর ১৮তম বিজেএসে তৃতীয় হয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত হন ফারিহা। এই যুগলের গল্প তুলে ধরেছেন শাহ বিলিয়া জুলফিকার।
শাহ বিলিয়া জুলফিকার

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরই দুজনের পরিচয়। প্রথম বর্ষের শেষ দিকে সেই পরিচয় রূপ নেয় প্রণয়ে। তখন সাদলীর সময় কাটছিল একধরনের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে। নতুন পরিবেশ, একাকিত্ব আর পড়ার চাপে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। একসময় ইয়ার ড্রপ দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন, যদিও পরে সরে আসেন। তবু পড়ায় মন বসত না। বই খুলতে ইচ্ছে করত না, নিজের ওপর আস্থাও কমে গিয়েছিল। তখন তাঁকে পড়ার জগতে ফিরিয়ে আনেন ফারিহা। চূড়ান্ত পরীক্ষার আগে নিয়মিত পড়া বুঝিয়ে দিতেন। এভাবেই গড়ে ওঠে তাঁদের সম্পর্ক।
করোনার দিনগুলো
দ্বিতীয় বর্ষে এল করোনা। ভেঙে পড়ল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ। সাদলী ফিরে গেলেন গ্রামের বাড়িতে। ইন্টারনেট দুর্বল, তাই অনলাইন ক্লাসে নিয়মিত থাকা সম্ভব হলো না। তখনো এগিয়ে এলেন ফারিহা। কী পড়তে হবে, কীভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে—সবই গুছিয়ে দিলেন। তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষে সাদলী নিজের পড়া নিজেই পড়তেন, কিন্তু ফারিহা ছিলেন পাশেই। এভাবে স্নাতক থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করেন দুজনে। ক্রিমিনোলজি কোর্সে সাদলীর
দেখা সিরিজ আর সিরিয়াল কিলারদের নিয়ে পড়া ব্লগও তখন কাজে লেগেছিল।
বিজেএসের প্রস্তুতি
চাকরির প্রস্তুতির সময় সাদলী থাকতেন লালবাগে। ফারিহা পান্থপথ থেকে এসে সদ্য খোলা চিলোক্সের একটি শাখায় তাঁর সঙ্গে বসতেন। সাদলী যা বুঝতেন না, ফারিহা নিজে পড়ে বুঝে আবার তাঁকে বোঝাতেন। শুধু কি তাই? গুরুত্বপূর্ণ টপিকের নোটও খাতায় তুলে দিতেন ফারিহা। সাদলী তা অন্যদেরও দিতেন, আর তাঁরাও সেই নোট পড়ে প্রশংসা করতেন।
একটি স্বপ্ন ছেড়ে দেওয়া
ছোটবেলা থেকে ফারিহার স্বপ্ন ছিল বিদেশে পড়ার। প্রথম বর্ষ থেকে বৃত্তির লক্ষ্য নিয়ে মন দিয়ে পড়েছেন। কিন্তু সাদলী বিদেশে যেতে আগ্রহী ছিলেন না। তাই ফারিহাও যাননি। সাদলীর সঙ্গে জীবন কাটানোর সিদ্ধান্তই তাঁর কাছে বড় হয়ে ওঠে। ফারিহার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছেড়ে দেওয়ার এই সিদ্ধান্তকে সাদলী দেখেন জীবনের অন্যতম বড় ত্যাগ হিসেবে।
লালমনিরহাটের সংসার
এরপর এল বিজেএস। ১৭তম বিজেএসে তৃতীয় হয়ে সিভিল জজ পদে নিয়োগ পান সাদলী। পোস্টিং হয় লালমনিরহাটে। সেখানেই সংসার পাতেন দুজন। ঢাকায় বেড়ে ওঠা ফারিহার জন্য নতুন শহরে মানিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। তবু দিন কেটে যায় ধীরে ধীরে।
এবার ফারিহার পালা
১৮তম বিজেএসের প্রস্তুতি শুরু করেন ফারিহা। যিনি এত দিন সাদলীর পাশে ছিলেন, তিনিই নেমে পড়েন নিজের স্বপ্নপূরণের লড়াইয়ে। তৃতীয় হয়ে সিভিল জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পদে সুপারিশ পান তিনি।
ভবিষ্যতের জটিল পরিকল্পনায় বিশ্বাস করেন না এই দম্পতি। ব্রুস লি-র ‘বি ওয়াটার মাই ফ্রেন্ড’ দর্শনের মতো জীবনের স্রোতে ভেসে চলেন। ছুটির দিনে দুজনের দিন কাটে ধীরলয়ে। শহরের অলিগলিতে ঘোরা, মনোরম কোনো জায়গায় সময় কাটানো, আর রান্নাঘরে নতুন নতুন খাবারের পরীক্ষা। পিৎজ্জা থেকে সর্কক্রাউট, তাহিনি থেকে হামাস—সবই চলে তাঁদের হাতে।

