২০২০ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭,৯৬৩ শিশু নিহত হয়েছে। সড়ক ও সড়ক পরিবহন খাতে অব্যবস্থাপনা এবং ট্রাফিক আইন বিষয়ে অসচেতনতার কারণে শিশুরা সড়ক দুর্ঘটনায় উদ্বেগজনক মাত্রায় হতাহত হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
আজ বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।
সড়ক দুর্ঘটনায় শিশু মৃত্যুর ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়
১. বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী হিসেবে নিহত হয়েছে ২,১৯৩ শিশু (২৭.৫৩%)।
২. পথচারী হিসেবে রাস্তা পারাপার ও রাস্তায় হাঁটার সময় যানবাহনের ধাক্কায় নিহত হয়েছে ২,৮১২ শিশু (৩৫.৩১%)।
৩. মোটরবাইকের চালক ও আরোহী হিসেবে নিহত হয়েছে ২,৯৫৮ শিশু (৩৭.১৪ শতাংশ)।
পথচারী হিসেবে নিহত হওয়ার যানবাহনভিত্তিক বিশ্লেষণ
১. বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ ইত্যাদি ভারী যানবাহনের চাপা বা ধাক্কায় নিহত হয়েছে ১,১২৬ শিশু (৪০.০৪ শতাংশ)।
২. প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের চাপা বা ধাক্কায় নিহত হয়েছে ৩১৭ শিশু (১১.২৭ শতাংশ)।
৩. থ্রি-হুইলারের (সিএনজি, অটোরিকশা, নসিমন, ভটভটি ইত্যাদি) ধাক্কায় নিহত হয়েছে ১,২৭১ শিশু (৪৫.১৯ শতাংশ)।
৪. বেপরোয়া মোটরসাইকেলের ধাক্কায় নিহত হয়েছে ৯৮ শিশু (৩.৪৮ শতাংশ)।
শিশু নিহত হওয়া সড়কের ধরন
দুর্ঘটনায় শিশু নিহত হওয়া সড়কের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, মহাসড়কে নিহত হয়েছে ১,৯৭৪ শিশু (২৪.৭৮%), আঞ্চলিক সড়কে ২,০৮২ শিশু (২৬.১৪%), গ্রামীণ সড়কে ২,৭১৩ শিশু (৩৪.০৭%) এবং শহরের সড়কে নিহত হয়েছে ১,১৯৪ শিশু (১৫%)।
দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণ
শিশু নিহত হওয়ার সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভোরে ২০৪ (২.৫৬%), সকালে ২,১৬৮ (২৭.২২%), দুপুরে ১,৮১৩ (২২.৭৬%), বিকালে ২,৬৩৪ (৩৩.০৭%), সন্ধ্যায় ৫৪৬ (৬.৮৫%) এবং রাতে ৫৯৮ (৭.৫০%) দুর্ঘটনা ঘটেছে।
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শিশুদের বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণ
০ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশু নিহত হয়েছে ১,৫৩২ জন (১৯.২৩%), ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশু নিহত হয়েছে ২,৮৮৪ জন (৩৬.২১%) এবং ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু নিহত হয়েছে ৩,৫৪৭ জন (৪৪.৫৪%)।
সড়ক দুর্ঘটনায় শিশু মৃত্যুর হার বৃদ্ধির কারণসমূহ
১. দেশের সড়ক ও সড়ক পরিবহন শিশুবান্ধব না হওয়া;
২. নিরাপদে সড়ক ব্যবহার সম্পর্কে শিশুদের মধ্যে সচেতনতার অভাব;
৩. পরিবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদে সড়ক ব্যবহার সম্পর্কে শিশুদের পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ না দেওয়া;
৪. অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক কর্তৃক যানবাহন চালানো;
৫. দুর্ঘটনায় আহত শিশুদের উপযুক্ত চিকিৎসা ব্যবস্থার সংকট;
৬. আহত শিশুদের চিকিৎসায় পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা।
সুপারিশসমূহ:
১. সড়ক ও সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা শিশুদের জন্য নিরাপদ করা;
২. নিরাপদে সড়ক ব্যবহার বিষয়ে পরিবারে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের সচেতন করা;
৩. অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক কর্তৃক যানবাহন চালানো বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা;
৪. জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার সুযোগ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা;
৫. সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসায় বিশেষ সরকারি তহবিল গঠন করা;
৬. ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’ বাস্তবায়ন করা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার সময় নিহত হয়েছে ২,৫১৩ শিশু (৩১.৫৫ শতাংশ) এবং বসতবাড়ির আশপাশের সড়কে খেলার সময় নিহত হয়েছে ৯৬২ শিশু (১২.০৮ শতাংশ)।
শিশুরা গ্রামীণ সড়কে বেশি হতাহত হচ্ছে। কারণ গ্রামীণ সড়কগুলো বসতবাড়ি ঘেঁষা এবং এই সড়কের যানবাহনসমূহ কোনো প্রকার নিয়ম-নীতি মেনে চলে না। সড়ক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিও থাকে না। আবার শিশুরাও সড়ক ব্যবহারের কোনো নিয়ম-নীতি জানে না।
বিষয়টি নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে যেমন কোনো উদ্বেগ নেই, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও কোনো প্রকার সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অথচ এই অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে নীরবে আমাদের শিশুরা নিহত হচ্ছে, পঙ্গু হচ্ছে। এটা জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। প্রতিটি শিশুই অমিত সম্ভাবনাময় এবং আজকের শিশুরাই আমাদের ভবিষ্যৎ।
