সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরী থেকে কাঁচা চামড়ার বর্জ্য (বিশেষ করে ‘র হাইড ট্রিমিংস’ বা চামড়ার টুকরা) বিদেশে পাচার ও রপ্তানি হওয়ার কারণে তীব্র কাঁচামাল সংকটে পড়েছে দেশের জিলেটিন (ওষুধ, প্রোটিন পাউডার কারখানা) শিল্প। প্রায় ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে গড়ে ওঠা দেশে ৬টি জিলেটিন কারখানা।
বরিশাল সদর রুপাতলীতে গ্লোবাল ক্যাপসুলস লিমিটেড, সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে বাংলাদেশ জেডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন কোম্পানি লিমিটেড, ধামরাই কালামপুর সুতিপাড়ায় জাওফিং জিলেটিন লিমিটেড, বিসিক চামড়া শিল্প নগরীর ভিক্টরি জেলাটিন প্রোডাক্টস লিমিটেড, যশোর অভয়নগর শংকরপাশায় ফয়সাল জিলেটিন ফ্যাক্টরী এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম পোর্ট এরিয়া জে অ্যান্ড পি জিলেটিন কোম্পানি রয়েছে জিলেটির কারখানায় প্রয়োজনীয় কাঁচা চামড়ার টুকরা বা বর্জ্য পাচ্ছে না, কারণ এ বর্জ্য বিদেশে চলে যাচ্ছে। বছরে প্রায় ৫ হাজার মেট্রিক টন জিলেটিন উৎপাদনের জন্য ৩০ হাজার মেট্রিক টন কাঁচা চামড়ার টুকরা প্রয়োজন হয়। কিন্তু সারা দেশে বছরে কাঁচামাল উৎপাদিত হয় মাত্র ২০ হাজার মেট্রিক টন।
দেশীয় কারখানায় রিসাইকেলের জন্য এই পুরো কাঁচামাল প্রয়োজন হলেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী তা কিনে বিদেশে পাচার করছেন। ফলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যাপ্ত কাঁচামাল পাচ্ছে না। এর মধ্যে বাংলাদেশ জেডডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন কোম্পানি লিমিটেডসহ প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ও রপ্তানি আদেশ বাতিলের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শিল্পটির উৎপাদন ও বিদেশি বিনিয়োগ রক্ষায় এবং নিরবচ্ছিন্ন কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাঁচা চামড়ার টুকরা বা বর্জ্য রপ্তানি স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা।
রপ্তানি ও বাণিজ্য তথ্যের একটি পরিসংখ্যান (২০২৫-২০২৬) অনুযায়ী, বাংলাদেশে সব মিলিয়ে প্রায় ৬টি প্রতিষ্ঠান জিলেটিন বা জিলেটিনজাত পণ্য রপ্তানি বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে। তবে ওষুধ ও খাদ্য শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সিংহভাগ উন্নত মানের হার্ড জিলেটিন এখনো বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
কাঁচামালের অভাবে কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। জিলেটিন শিল্পে মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি সম্ভাবনা থাকলেও এই বর্জ্য সংকটের কারণে তা বড় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শিল্পটির সুরক্ষায় এবং দেশীয় কারখানা সচল রাখতে কাঁচা চামড়ার টুকরা বা বর্জ্য রপ্তানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে।
সংকট এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে শিল্প খাতের কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। শিল্প খাতের কারখানা মালিকরা তাই কাঁচা চামড়ার বর্জ্য রপ্তানি নিষিদ্ধের আবেদন করেছেন সরকারের কাছে। কারখানার মালিকদের হয়ে এ আবেদন করেছে খোদ বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএলএলএফইএ)। অ্যাসোসিয়েশন দেশের একমাত্র জিলেটিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ জেডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন কোম্পানি লিমিটেডের নাম উল্লেখ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এ আবেদন করে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ জেডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন কোম্পানি লিমিটেডের আবেদনও মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও শিল্প খাত সংশ্লিষ্টদের সূত্রে জানা যায়, জিলেটিন তৈরির মূল কাঁচামাল কাঁচা চামড়ার বর্জ্য বা টুকরা। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এ কাঁচামাল সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরী থেকে সংগ্রহ করে নিজস্ব কারখানায় পরিবেশসম্মত উপায়ে রিসাইকেল করে। এরপর জিলেটিন তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করে। বাংলাদেশ জেডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন কোম্পানি ও ইয়ংলি বায়োটেকনোলজিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বিসিক চামড়া শিল্পনগরীর বর্জ্য রিসাইকেল করে জিলেটিন ও শিল্প প্রোটিন পাউডার তৈরি করছে। প্রতিষ্ঠান দুটির দাবি, দেশে এই কাজ তারাই প্রথম শুরু করেছে। এখন কাঁচামালের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ধাক্কা লেগেছে রপ্তানিতেও।
জানা যায়, আশুলিয়ার মির্জানগরের তাকসুরে অবস্থিত বাংলাদেশ জেডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন কোম্পানি লিমিটেড। চীনা বিনিয়োগে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানটি ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম চামড়া ও ট্যানারি বর্জ্য রিসাইক্লিং কারখানা। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লু চেংফেং সম্প্রতি এ সংকটের বিষয়ে সরকারের কাছে আবেদন করেছেন।
এর ভিত্তিতে বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএলএলএফইএ) গত ৮ অক্টোবর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে কাঁচা চামড়ার টুকরা রপ্তানি নিষিদ্ধ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবমতে, বছরে ৫ হাজার মেট্রিক টন জিলেটিন উৎপাদনে প্রায় ৩০ হাজার মেট্রিক টন কাঁচা চামড়ার টুকরা দরকার। অথচ সারাদেশে বছরে এ কাঁচামাল উৎপাদিত হয় প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টন। এর পুরোটাই দেশীয় কারখানায় রিসাইকেলের জন্য প্রয়োজন।
কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এ কাঁচামাল কিনে বিদেশে পাঠাচ্ছেন। তারা প্রতি কেজি চামড়ার টুকরা ১৩ থেকে ১৪ টাকা দরে রপ্তানি করছেন। অন্যদিকে ওই টুকরা রিসাইকেল করে উৎপাদিত জিলেটিন প্রতি কেজি প্রায় ৬১০ টাকায় (৫ মার্কিন ডলার) রপ্তানি করছে কারখানাটি। অর্থাৎ কাঁচামাল রপ্তানি হলে দেশ কম দাম পাচ্ছে। আর দেশে কাঁচা চামড়ার বর্জ্য বা টুকরা প্রক্রিয়াজাত হলে অনেক বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়।
কাঁচামালে কী তৈরি হয় :
চামড়ায় দুধরনের বর্জ্য পাওয়া যায়। প্রথমটি কাঁচা চামড়ার টুকরা, ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ‘র হাইড ট্রিমিং’। ট্যানারিতে চামড়া কেটে আকার ঠিক করার সময় বাদ পড়া বাড়তি অংশই এই টুকরা। এ টুকরা থেকে ফুড গ্রেড ও ফার্মা গ্রেড জিলেটিন তৈরি হয়। ঔষধ শিল্পে ক্যাপসুলের খোলস তৈরিতে জিলেটিন অপরিহার্য।
এর পাশাপাশি জেলি, মার্শম্যালো, ক্যান্ডি, দুগ্ধজাত খাবার ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে এটি ব্যবহৃত হয়। দ্বিতীয়টি ওয়েট ব্লু ট্রিমিং ও ডাস্ট, অর্থাৎ রাসায়নিক দিয়ে প্রক্রিয়াজাত নীলচে চামড়া ছাঁটার সময় বেরিয়ে আসা টুকরা ও গুঁড়া। এ থেকে হয় শিল্প প্রোটিন পাউডার, যা চামড়া মসৃণ করতে ও গাছের সার হিসেবে কাজে লাগে। প্রসাধনী ও আলোকচিত্র শিল্পেও এর ব্যবহার আছে। বিদেশে এ জিলেটিনের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে বলে শিল্প মালিকরা জানান।
শিল্প খাত সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, বৈশ্বিক খালি ক্যাপসুল বাজার ২০২৫ সালের ৩ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০৩০ সালে ৪ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। অথচ বাংলাদেশ এখনো বিদেশনির্ভর। ২০২৫ সালে ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের জিলেটিন ও ১ দশমিক ৯৮ মিলিয়ন ডলারের ক্যাপসুল শেল আমদানি হয়েছে।
বিএফএলএলএফইএর চেয়ারম্যান টিপু সুলতান বলেন, কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি কাঁচামালের প্রাপ্যতা না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ২৫ লাখ মার্কিন ডলারের জিলেটিন রপ্তানির আদেশ পাওয়া গেছে, কিন্তু সময়মতো কাঁচামাল না পেলে ওই আদেশ বাতিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কাঁচামাল রপ্তানি বন্ধ না হলে কারখানাটি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাঁচা ও ওয়েট-ব্লু চামড়া রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে, তা হবে কেস টু কেস ভিত্তিতে। তবে বর্জ্য রপ্তানির বিষয়ে তেমন কিছু জানা যায়নি।
কারখানা কর্তৃপক্ষ ও বিনিয়োগকারীরা বলছেন, কারখানায় বিনিয়োগ প্রায় ১০০ কোটি টাকা। উৎপাদন বন্ধ হলে এ বিনিয়োগ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় দেড় হাজার শ্রমিক, কর্মচারী-কর্মকর্তা কাজ করেন। কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে তাদের কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। জিলেটিনের উৎপাদন ব্যাহত হলে এর ওপর নির্ভরশীল শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হোঁচট খাবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে। লু চেংফেংয়ের দাবি—সাভারের বিসিক ট্যানারি শিল্পনগরী থেকে কাঁচা চামড়ার বর্জ্য বা টুকরা বিদেশে রপ্তানি নিষিদ্ধ করতে হবে। দেশীয় একমাত্র জিলেটিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি বিনিয়োগ রক্ষায় জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশের শিল্প কারখানায় ব্যবহারের জন্য কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, কাঁচা চামড়ার টুকরা যেহেতু লোকাল ও বিশ্ববাজারে রপ্তানি হচ্ছে, তাই একটি কম্পিটিটিভ বাজার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে ওয়েট ব্লু ডাস্ট ও ট্রিমিং গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে আমরাই প্রথম এগুলো রিসাইক্লিং করছি, যা পরিবেশের জন্য একটি বড় আশীর্বাদ।
বিআলো/অর্নব