Published on
:
3 min read
এই সময়: গত দেড় বছর ধরে রুপোলি ঝলকে চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল বিনিয়োগকারীদের। সেই সময়ে শেয়ার-মিউচুয়াল ফান্ড বিক্রি করে, এমনকী ধার করেও মোটা অঙ্কের লাভের আশায় রুপো কিনেছিলেন লগ্নিকারীদের একাংশ। তাঁদের কেনার চাপেই গত ২৯ জানুয়ারি শিখর ছুঁয়েছিল রুপোর দাম। তার পর থেকেই ক্রমশ ফিকে হয়ে চলেছে হোয়াইট মেটাল-এর সেই ‘রুপোলি যুগ’। যার জেরে ধাতুটির দাম শিখরে পৌঁছনোর প্রায় ন’মাস পরে তা সর্বকালীন উচ্চতা থেকে ৫৫ শতাংশ নীচে নেমে এসেছে। যা বিনিয়োগকারীদের উপরে বিপুল ক্ষতির বোঝা চাপিয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের গোড়ায় দেশে রুপোর দাম সর্বকালীন উচ্চতা ৪.২৭ লক্ষ টাকা প্রতি কিলোগ্রামে পৌঁছেছিল। যেখান থেকে তা গত শুক্রবার নেমে এসেছে ১.৯৩ লক্ষ টাকায় (এমসিএক্স দর)। অর্থাৎ যদি কোনও ব্যক্তি সর্বকালীন দামে রুপোয় এক লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করে থাকেন, সেই ক্ষেত্রে তাঁর লগ্নিমূল্য নেমে এসেছে ৪৫,০০০ টাকায়। যা বিনিয়োগকারীদের একাংশের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
হঠাৎ রুপোর দামে কেন এত বড় ধস নামল?
রুপোর দামে ধসের নেপথ্যে একাধিক কারণ তুলে ধরেছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। যার মধ্যে রয়েছে,
ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা
গত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকেই তেহরানের উপরে ওয়াশিংটনের হামলা এবং তার পাল্টা জবাবে উত্তপ্ত হয়েছে পশ্চিম এশিয়া। যার জেরে হরমুজ় জটে জ্বালানির স্বাভাবিক সরবরাহ দীর্ঘদিন ধরেই কার্যত বন্ধ। এমন পরিস্থিতিতে অপরিশোধিত তেলের আগুন দামে কোথাও থমকে গিয়েছে কোথাও আবার মন্থর হয়েছে বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদনের গতি। মনে রাখতে হবে, সৌর বিদ্যুৎ, চিকিৎসা, ইলেকট্রনিক্স, ইলেকট্রিক ভেহিকল-সহ বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উপাদান রুপো। ফলে শিল্পক্ষেত্রগুলিতে রুপোর চাহিদাও তুলনামূলক ভাবে কমেছে। যা রুপোর দাম কমানোর ক্ষেত্রে সহায়তা করেছে।
তেলের দাম
সম্প্রতি সৌদি আরবের অয়েল ফিল্ড থেকে শুরু করে তেলের পাইপলাইন— একাধিক ক্ষেত্রে হামলা চালিয়েছে হুথি গোষ্ঠী। যার জেরে ফের তেলের দাম চড়চড় করে বাড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে, অপরিশোধিত তেলের ফিউচার ব্রেন্ট ক্রুড-এর দাম শুক্রবার ব্যারেলপিছু ১১৪ ডলারে পৌঁছে গিয়েছে। যার জেরে বিনিয়োগকারীদের বড় অংশের কাছে অপরিশোধিত তেলের ফিউচার এবং ডলার আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে তাঁরা রুপো থেকে প্রফিট বুকিং করে তেল এবং ডলারের মতো ইনভেস্টমেন্ট ইনস্ট্রুমেন্ট-এ লগ্নি করছেন। ফলে রুপো ক্রমশ সস্তা হচ্ছে।
মূল্যবৃদ্ধির উদ্বেগ
বিশ্বজুড়ে জ্বালানির খরচ বৃদ্ধি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যগুলির দাম ক্রমশ বাড়িয়ে চলেছে। যার জেরে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কাও মাথাচাড়া দিচ্ছে। গত সেপ্টেম্বরেই মার্কিন মুলুকে মূল্যবৃদ্ধির চাপে ফেডেরাল রিজ়ার্ভ কর্তৃপক্ষ তাঁদের মানিটারি পলিসি রেট ০.২৫ শতাংশ বাড়িয়েছেন। যা ডিসেম্বরে ফের বাড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে বলে অনুমান বিশেষজ্ঞদের একাংশের। তাঁদের মতে, ফেড কর্তৃপক্ষ যদি ফের সুদের হার বৃদ্ধি করেন, সেই ক্ষেত্রে ডলার আরও মজবুত হবে। যা সোনা-রুপোর মতো পণ্যে ‘সেলিং অর্ডার’ বাড়িয়ে দেবে।
রুপোর দাম কি বাড়বে?
প্রতিটি গ্লাস যখন অর্ধেক ভর্তি থাকে, তখন বাকি অর্ধেক অংশ খালি থাকে। রুপোর পরিস্থিতিও ঠিক সেই রকমই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। তাঁদের মতে, রুপোর দাম আগামী দিনে বৃদ্ধির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু অনেকগুলি ‘ইফস অ্যান্ড বাটস’ রয়েছে। যেমন, গত কয়েক সপ্তাহে মার্কিন বন্ড ইল্ড ক্রমশ কমেছে। এর মূল কারণ বিশ্বজুড়েই শেয়ার বিক্রি করে চলেছেন বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ। তাঁদের মধ্যে একাংশ শেয়ার বিক্রি করে সেই টাকাই রাখছেন শেয়ারের থেকে অনেকটাই নিরাপদ সরকারি বন্ডে। যার জেরে বন্ড ইল্ড কমছে। এমন পরিস্থিতি যদি দীর্ঘদিন চলতে থাকে, সেই ক্ষেত্রে ‘নন ইল্ডিং মেটাল’ হিসেবে বন্ডের পরেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে সোনা-রুপো। সেই ক্ষেত্রে সোনার তুলনায় রুপোর বৃদ্ধির সুযোগ অনেক বেশি থাকবে। তবে মনে রাখতে হবে, এগুলি সবই সম্ভাবনার কথা। আপাতত স্বল্পমেয়াদে রুপোয় বিনিয়োগ আপনার ‘পালস রেট’ বাড়িয়ে দিতে পারে বলেই জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
এ বিষয়ে মার্কেট রিসার্চ সংস্থা বোনানজ়া-র পক্ষ থেকে নৃপেন্দ্র যাদব জানিয়েছেন, সম্প্রতি উৎসবের মরশুমে চাহিদা মেটাতে আগামী ছ’মাসের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবসায়ীদের ৬,৫০০ মেট্রিক টন রুপো আমদানির অনুমতি দিয়েছে। যা দেশের বাজারেও রুপোর সরবরাহে স্থিতিশীলতা বজায় রাখবে। ফলে দেশের বাজারেও রুপোলি ধাতুর দামে প্রিমিয়াম তৈরির সম্ভাবনা নেই। এমন পরিস্থিতিতে স্বল্পমেয়াদে রুপোর দামে বড় বৃদ্ধির সম্ভাবনা অনেকটাই কম বলে দাবি করেছেন তিনি। যদিও দীর্ঘমেয়াদে রুপোয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
