অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে নেমে বিতর্কের মুখে পড়া মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রোববার (১৮ অক্টোবর) বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ইশরাককে ডেকে নিয়ে এ নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। সরকার-সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েকজনের হাতেও অস্ত্র দেখা যায়। অভিযানের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। এ ঘটনায় বিএনপি ও সরকারের ভেতরেও অস্বস্তি তৈরি হয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নিয়ে আপত্তি না থাকলেও একজন প্রতিমন্ত্রীর সরাসরি অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কাজে লাগানোর পরিবর্তে তিনি কেন নিজেই এভাবে অভিযানে গেলেন, তা নিয়ে দলের ভেতরেও অসন্তোষ দেখা দেয়।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির এক সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি শুধু ইশরাকের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদেরও বিব্রত করেছে। একজন প্রতিমন্ত্রীর এমন আচরণের দায় শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিসভার ওপরও বর্তায় বলে তিনি মনে করেন।
শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানীর ১৩টি স্থানে আকস্মিক পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি আবাসিক এলাকার পরিচ্ছন্নতা এবং সেবার মান যাচাই করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন তিনি। কয়েকটি ক্ষেত্রে পরিস্থিতির উন্নয়নে সময়সীমাও বেঁধে দেন প্রধানমন্ত্রী।
এদিন বিকেলেই গেন্ডারিয়ায় ইশরাকের অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নেওয়ার ঘটনা ঘটে। দল ও সরকারসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের ধারণা, প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শন ও জনসেবার মান উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়ে যে ইতিবাচক আলোচনা তৈরি হয়েছিল, ইশরাকের কর্মকাণ্ডে তা অনেকটাই আড়ালে পড়ে যায়।
এ পরিস্থিতিতে প্রতিমন্ত্রীকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার ঘটনাকে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের আচরণ ও জবাবদিহির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শনিবার বিকেলে রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুন্টিঘর রেলগেট এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে যান ইশরাক হোসেন। তাঁর নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে তিনি চিৎকার করে বলছেন, ‘এই ধর ধর ধর...।’ এ সময় তাঁর পাশ থেকে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘একেবারে গুলি করে দেব।’
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা দেহরক্ষীরা কয়েকজনকে ধরতে দৌড়াচ্ছেন। তাঁদের একজনকে এক তরুণকে লাথি মারতেও দেখা যায়। এ সময় কয়েকজনকে বলতে শোনা যায়, ‘স্যার আমি কিছু করিনি। আমি গরিব মানুষ স্যার।’ আরেকটি ভিডিওতে আটক ব্যক্তিদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার দৃশ্য দেখা যায়।
ঘটনাস্থলে ইশরাকের ব্যক্তিগতভাবে নিয়োগ করা দুই দেহরক্ষী তোফাজ্জল হোসেন ও লাভলুর পাশাপাশি একজন সরকারি দেহরক্ষীও উপস্থিত ছিলেন। ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের হাতেও অস্ত্র দেখা যায়।
ভিডিওর কিছু অংশে ইশরাকের হাতে থাকা পিস্তল অস্পষ্ট করে দেওয়া হলেও অন্য অংশে অস্ত্রটি স্পষ্ট দেখা যায়। তবে গুলি করার হুমকি দেওয়া ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে, ঘটনার পরদিনই ইশরাককে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবর সামনে এলেও এ বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর পদত্যাগের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের দিকে নজর রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলের।
