দুনিয়ার কর্মের ওপর ভিত্তি করে পরকালের অনন্ত জীবনে মানুষের চূড়ান্ত গন্তব্য নির্ধারিত হবে। সেখানে কেবল দুটি পথ খোলা থাকবে— একটিতে অনন্ত সুখ ও শান্তির জান্নাত, আর অন্যটিতে কঠোর শাস্তির স্থান জাহান্নাম। কুরআন মজিদে আল্লাহ তাআলা জাহান্নামীদের বিভিন্ন আক্ষেপ ও পাপের কথা বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন, যাতে মানুষ দুনিয়ার জীবনে সতর্ক হয়ে পরকালের সীমাহীন জীবনে সফল হতে পারে।
যে তিনটি কাজ তথা অপরাধ মানুষকে জাহান্নামে ঠেলে দেবে, তা সুরা আল-মুদ্দাসসিরে আল্লাহ তাআলা সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। সে ওঠে এসেছে এমন তিনটি নির্দিষ্ট ও মারাত্মক অপরাধের কথা, যা মানুষকে জাহান্নামের ভয়াবহ আগুনে নিক্ষেপ করবে। তাই পরকালের কঠিন শাস্তি থেকে মুক্তি পেতে এই অপরাধগুলো সম্পর্কে জানা এবং তা থেকে বেঁচে থাকা প্রতিটি মুমিনের জন্য অপরিহার্য। কী সেই অপরাধগুলো?
জাহান্নামীদের স্বীকারোক্তি
কিয়ামতের দিন জান্নাতবাসীরা জাহান্নামীদের জিজ্ঞাসা করবেন— কোন অপরাধ বা আচরণ তোমাদের ‘সাকার’ নামক ভয়াবহ জাহান্নামে নিয়ে এল? তখন জাহান্নামীরা নিজেদের তিনটি বড় ভুলের কথা স্বীকার করবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা তাদের সেই কথোপকথন এভাবে তুলে ধরেছেন—
مَا سَلَكَكُمْ فِي سَقَرَ - قَالُوا لَمْ نَكُ مِنَ الْمُصَلِّينَ - وَلَمْ نَكُ نُطْعِمُ الْمِسْكِينَ - وَكُنَّا نَخُوضُ مَعَ الْخَائِضِينَ
‘(জান্নাতবাসীরা জিজ্ঞাসা করবে) কিসে তোমাদের সাকারে (জাহান্নামে) প্রবেশ করাল?’ তারা বলবে, ‘আমরা নামাজ আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না, আমরা অভাবগ্রস্ত-মিসকিনদের খাবার দান করতাম না এবং আমরা অনর্থক ও মিথ্যায় মগ্ন ব্যক্তিদের সঙ্গে অনর্থক আলাপে মগ্ন থাকতাম।’ (সুরা আল-মুদ্দাসসির: আয়াত ৪২-৪৫)
এই আয়াতগুলোতে তিনটি মৌলিক অপরাধের কথা সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে—
১. সালাত বা নামাজ বর্জন করা: যা বান্দার সঙ্গে রবের মূল সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়।
২. অসহায়দের অধিকার না দেওয়া: মিসকিন ও অভাবীদের খাবার না দেওয়া এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়া।
৩. অনর্থক কথা ও কাজে লিপ্ত থাকা: সময় অপচয় করে অন্যায়, মিথ্যা বা অনর্থক কথাবার্তা ও চর্চায় নিজেকে ডুবিয়ে রাখা।
১. নামাজ বর্জনের ভয়াবহ পরিণাম
নামাজ ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ এবং ইমানের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ বর্জন করা একজন মানুষকে দ্বীন থেকে দূরে ঠেলে দেয় এবং তাকে জাহান্নামী বানিয়ে দেয়। এ বিষয়ে সতর্ক করে প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ইরশাদ করেছেন—
إِنَّ بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشِّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكَ الصَّلاَةِ
‘নিশ্চয়ই কোনো ব্যক্তির এবং শিরক ও কুফরের মাঝে একমাত্র পার্থক্য হলো সালাত বা নামাজ ত্যাগ করা।’ (মুসলিম ৮২)
২. অসহায়দের সাহায্য না করা ও কৃপণতা
ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের ধর্ম নয়; সামাজিক বিচার ও মানবিক দায়িত্বের ওপরও এখানে জোর দেওয়া হয়েছে। ধন-সম্পদ থাকার পরও দরিদ্র ও কৃপণের মতো মিসকিনদের না দেওয়া আল্লাহর অসন্তোষ ডেকে আনে। আল্লাহ তাআলা অন্যত্র ইরশাদ করেন—
وَلَا يَحُضُّ عَلٰى طَعَامِ الْمِسْكِيْنِ - فَوَيْلٌ لِّلْمُصَلِّيْنَ - الَّذِيْنَ هُمْ عَنْ صَلَاتِهِمْ سَاهُوْنَ
‘আর সে অভাবগ্রস্ত-মিসকিনদের খাদ্যদানে উৎসাহিত করে না। সুতরাং দুর্ভোগ সেই নামাজ আদায়কারীদের জন্য, যারা তাদের নামাজ সম্পর্কে উদাসীন।’ (সুরা আল-মাউন: আয়াত ৩-৫)
৩. অনর্থক কথাবার্তা ও গুনাহের চর্চায় মগ্ন থাকা
নিজের মূল্যবান সময় ও মুখকে অনর্থক আলোচনা, গিবত, মিথ্যা কিংবা অনৈসলামিক চর্চায় ব্যয় করা জাহান্নামে যাওয়ার অন্যতম কারণ। একজন প্রকৃত মুমিন তার সময় ও জবানকে কেবল ভালো কাজে ব্যয় করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—
مِنْ حُسْنِ إِسْلاَمِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لاَ يَعْنِيهِ
‘কোনো ব্যক্তির সুন্দর ও উত্তম সুসংহত ইসলাম চর্চার পরিচয় হলো— তার জন্য যা অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয়, তা সম্পূর্ণ বর্জন করা।’ (তিরমিজি ২৩১৭)
পরকালের হিসাব-নিকাশের দিন কেউ কারো পাপের দায় নেবে না। সুরা আল-মুদ্দাসসিরের এই গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক নসিহত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, জীবন ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই সংশোধন হতে হবে। নামাজ কায়েম করতে হবে, অভাবগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং জবানকে অনর্থক ও ক্ষতিকর আলাপ থেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আর এসব অপরাধ থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখাই হলো সফলতা ও নাজাতের সহজ পথ। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে নিয়মিত নামাজ আদায়কারী, অসহায়দের সাহায্যকারী এবং অনর্থক কাজ ও কথা থেকে মুক্ত থেকে তার প্রিয় বান্দা হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।