সড়ক-মহাসড়কে চলাচল করতে বর্তমানে ভয় পাচ্ছেন যাত্রী-চালকরা। সংঘবদ্ধ ডাকাত চক্রের দৌরাত্ম্যে দেখা দিয়েছে আতঙ্কের পরিবেশ। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সিলেট, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর এবং উত্তরাঞ্চলগামীসহ মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে প্রায় হানা দিচ্ছে ডাকাতরা।
শুধু ডাকাতি নয়, ছোট-বড় গ্রুপে ঘটছে ছিনতাইয়ের ঘটনাও। সড়কের গুরুত্বপূর্ণ কিছু পয়েন্টে যানজটে আটকে থাকা বা ধীরগতিতে চলাচল করা যানবাহনেও ছিনতাই করা হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত তিন মাসে (জুন থেকে আগস্ট) ১২৩টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে ৪৬৭টি। হাইওয়ে পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, বর্তমানে মহাসড়কে ডাকাতির ঘটনাগুলো মৌসুমভেদে কমবেশি ঘটছে। তবে চিহ্নিত কিছু পয়েন্টে নজরদারির পাশাপাশি যখনই ডাকাতি বা এমন কোনো ধরনের প্রস্তুতির খবর পাওয়া যাচ্ছে, তখনই দ্রুততার সঙ্গে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তিন মাসে ডাকাতি ১২৩টি ও ছিনতাই ৪৬৭টি
পুলিশ সদর দপ্তরের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা তথ্যমতে, গত তিন মাসে মহাসড়কসহ বিভিন্ন স্থানে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে ১২৩টি এবং ছিনতাই বা এই জাতীয় অপরাধ ঘটেছে ৪৬৭টি। এর মধ্যে গত সেপ্টেম্বরে সারা দেশে ২৮টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এ মাসে ছিনতাইয়ের মতো দস্যুতার ঘটনা ঘটে ১৫৩টি। তার আগের মাস আগস্টে ডাকাতি হয় ৪২টি এবং ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে ১৫৪টি। জুলাইয়ে ডাকাতি ৫৩টি এবং ছিনতাইয়ের ঘটনা দেখানো হয়েছে ১৬০টি।
এই তথ্যগুলো মূলত মামলার রেকর্ড অনুসারে যুক্ত করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। তবে এর বাইরেও এমন আরও অনেক ঘটনা রয়েছে, যা মামলা বা থানা পর্যায়ে যায়নি বলে মনে করেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।
তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে এবং নগর-মহানগরে সুনির্দিষ্ট বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গত ১৪ অক্টোবর রাতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নয়ারহাটে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে চক্রের তিন সদস্যকে আটক করে পুলিশ। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি হ্যান্ডকাফ ও দুটি ওয়াকিটকি উদ্ধার করা হয়, যা দিয়ে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে ডাকাতির চেষ্টা করছিল।
গত ১০ অক্টোবর গভীর রাতে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে অস্ত্রের মুখে একজন সাবেক এএসপির বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। পরে বাসার মালামাল ট্রাকে করে নিয়ে মহাসড়ক ব্যবহার করে পালিয়ে যায় ডাকাতরা। এ ঘটনায় অবশ্য গত বৃহস্পতিবার জেলা ডিবি পুলিশ ওই চক্রের পাঁচ সদস্যকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছে।
অন্যদিকে গত ৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় গাজীপুরের শ্রীপুর-গোসিঙ্গা আঞ্চলিক সড়কে ‘ফিল্মি স্টাইলে’ এক ভয়ানক ছিনতাই বা ডাকাতির ঘটনা ঘটে। সেখানে ১০ থেকে ১২টি মোটরসাইকেলে আসা একদল সশস্ত্র গ্রুপ একটি প্রাইভেট কারের গতি রোধ করে কয়েক রাউন্ড গুলি চালায়। পরে গাড়িতে থাকা বিকাশের পরিবেশকের প্রায় ৩ কোটি টাকা লুট করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ৮ ও ৯ অক্টোবর গভীর রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ডের কুমিরা ও ভাটিয়ারী অংশে একাধিক প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাস লক্ষ্য করে লোহার পাইপ ও ভারী বস্তু ফেলে যাত্রী ও প্রবাসীদের স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থ লুটের একাধিক ঘটনা ঘটে। এটা যাত্রীসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। গত ৪ অক্টোবর গভীর রাতে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মোগড়াপাড়া এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে ডাকাতির চূড়ান্ত প্রস্তুতিকালে দেশীয় অস্ত্রসহ আন্তজেলা ডাকাত দলের ছয় সদস্যকে পুলিশ হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে।
তার আগে ৩০ আগস্ট রাতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের নির্জন গজারি বন এলাকায় চলন্ত গাড়িতে লোহার রড ছুড়ে ও ব্যারিকেড দিয়ে দুর্ধর্ষ ডাকাতি করা হয়।
এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহর এলাকায় বেশ কিছু দুর্ধর্ষ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার রাতেই রাজধানীর কদমতলী, শ্যামপুর ও বিমানবন্দর রেলস্টেশন এলাকায় পৃথক ছিনতাইয়ের ঘটনায় ছুরিকাঘাতে তিনজন আহত হন বলে জানা যায়। আহতরা হলেন আসিফ (২২), মানিক (৪৮) ও অজ্ঞাত ব্যক্তি (৩৫)। একই দিন চট্টগ্রামের হালিশহরে অস্ত্রের মুখে এক সাংবাদিককে জিম্মি করে বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে ৭০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। গত ৪ অক্টোবর চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে চলন্ত সিএনজিতে এক বৃদ্ধার স্বর্ণালংকার ছিনতাই হয়। অন্যদিকে গত ২৫ সেপ্টেম্বর নরসিংদীতে চালককে হত্যা করে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কারওয়ান বাজার সিগন্যালে গাড়ির জানালা দিয়ে এক যাত্রীর মোবাইল ছিনিয়ে নেয় ধারালো ছুরি হাতে থাকা ছিনতাইকারী। এ রকম বিভিন্ন স্থানে আরও বেশ কিছু ছিনতাইয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
যেসব পয়েন্টে ডাকাতদের তৎপরতা বেশি
পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত অন্তত ১৫টি প্রধান স্পটকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বা ডাকাতিপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড, কাঁচপুর ব্রিজ, কেওঢালা, মোগড়াপাড়া ও ছোট সাদিপুর এলাকা সবচেয়ে বেশি অপরাধপ্রবণ। এ ছাড়া মুন্সীগঞ্জের ভবেরচর, কুমিল্লার দাউদকান্দি, চান্দিনা, মাধাইয়া বাজার ও চৌদ্দগ্রামের নির্জন কিছু অংশে প্রায়ই ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ফেনীর ফাজিলপুর এবং চট্টগ্রামের মিরসরাই, সীতাকুণ্ড, কুমিরা, বাঁশবাড়িয়া ও ভাটিয়ারী এলাকায় চলন্ত গাড়িতে ইট-লোহার পাইপ ছুড়ে বা ব্যারিকেড দিয়ে রাতে ডাকাতি ও লুটপাট চালানোর খবর পাওয়া যায়, যার প্রধান লক্ষ্য থাকেন প্রবাসী ও পণ্যবাহী লরি।
এ ছাড়া মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফরিদুপর, ঢাকা থেকে রাজশাহী ও রংপুর রুট, ঢাকা-সিলেট রুটের কিছু পয়েন্ট এবং গাজীপুর থেকে ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে গভীর রাতে ছিনতাই-ডাকাতির ঘটনা প্রায় ঘটছে।
মৌসুমভেদে ডাকাতি কমবেশি, দুই ধরনের তৎপরতা
হাইওয়ে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানান, সড়ক-মহাসড়কে সাধারণ দুই ধরনের ডাকাতি হয়ে থাকে। একটি হচ্ছে নির্জন সড়ক এলাকা বেছে নিয়ে ডাকাতি এবং আরেককটি হচ্ছে প্রবাসী বা টার্গেট করে ডাকাতি। নির্জন বা নীরব এলাকা হিসেবে গাজীপুর-ময়মনসিংহ রুটসহ আরও কিছু এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রবাসীরা যখন ঈদসহ বিভিন্ন সময়ে দেশে ফেরেন, তখন টার্গেট করে কিছু ডাকাতির ঘটনা ঘটানো হয়। এ জন্য হাইওয়ে পুলিশ ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি হেল্প ডেস্ক স্থাপন করে, যাতে কোনো প্রবাসী পুলিশি নিরাপত্তা (স্কট) নিতে পারেন বা আশঙ্কা জানালে হাইওয়ে পুলিশ সংশ্লিষ্ট যাত্রীর চলাচলের রুটে বিশেষ খেয়াল রাখতে পারে।
অন্যদিকে ডাকাতির ঘটনাগুলোও বিভিন্ন মৌসুমে বৃদ্ধি পায় বলে জানান হাইওয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে তারা খবরের কাগজকে জানান, বিশেষ করে ঈদের সময় ডাকাত চক্রের অতৎপরতা বৃদ্ধি পায়। এভাবে দৌরাত্ম্য বাড়ে শীতকালেও। কারণ শীতের সময়গুলোতে কুয়াশার প্রভাব থাকার সুযোগ কাজে লাগাতে চায় ডাকাতরা। তবে বর্ষাকালে তাদের অপতৎপরতা অনেকটা কম থাকে।
কঠোর শাস্তি নিশ্চিত না হলে অপরাধপ্রবণতা বাড়তে থাকে
এ প্রসঙ্গে অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘মহাসড়কে প্রায়ই ডাকাতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। অনেক সময় সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রকাশ পাচ্ছে, যা দেখে সংশ্লিষ্ট রুটে চলাচলকারী অন্য যাত্রী-চালকদের মধ্যেও আতঙ্ক বাড়ছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক মূল্যায়ন করে সাধারণত পেশাদার ডাকাত-ছিনতাইকারীরা তৎপরতা চালিয়ে থাকে। অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোরতা বা শৈথিল্যের ওপর ভিত্তি করেও অনেক সময় অপরাধপ্রবণতা কমবেশি হয়ে থাকে। এ জন্য বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।’
ড. তৌহিদুল হক আরও বলেন, ‘বেশির ভাগ ডাকাতের দৃশ্যমান বিভিন্ন পেশা থাকে। অনেকের ক্ষেত্রে দিনে তারা ক্ষুদ্র ব্যবসা, দিনমজুর বা বিভিন্ন যানবাহন চালাচ্ছে, কিন্তু রাত গভীর হলেই ডাকাতের রূপ ধারণ করছে। অর্থাৎ একই ব্যক্তি দিনে বৈধ কোনো পেশাজীবী, আর রাতে ডাকাত-ছিনতাইকারী! অপরাধপ্রবণতা বাড়ার নেপথ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে–এমন গুরুতর অপরাধে জড়িত অনেকে গ্রেপ্তার হলেও অল্প দিনের মধ্যেই জামিনে মুক্তি পাচ্ছে। অনেক সময় কঠোর কোনো শাস্তি হচ্ছে না বা মামলার বিচারপ্রক্রিয়াতেও দীর্ঘদিন কেটে যাচ্ছে। ফলে জামিনে মুক্ত হয়েই একই ধরনের অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার, জামিন ও বিচারপ্রক্রিয়ায় সুসমন্বয় খুব জরুরি। কেননা কঠোর শাস্তি নিশ্চিত না হলে যেকোনো ধরনের অপরাধপ্রবণতা বাড়তে থাকে।’
খবর পেলেই আমরা পদক্ষেপ নিচ্ছি
এ প্রসঙ্গে হাইওয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (প্রশাসন ও মিডিয়া) মুনতাসিরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘সব ডাকাতির ঘটনায় মহাসড়কে নয়। আমাদের কাছে যে রেকর্ড বা ঘটনা সম্পর্কে অফিশিয়াল তথ্য রয়েছে, তাতে মহাসড়কে ডাকাতির ঘটনা বাড়েনি। গত মাসে বা তার আগের মাসেও মহাসড়কে তিন থেকে চারটি করে ডাকাতির ঘটনার তথ্য রয়েছে, অর্থাৎ বর্তমান পরিস্থিতিও আতঙ্কিত হওয়ার মতো পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তার পরও যখনই কোথাও ডাকাতি বা অতৎপরতার খবর পাওয়া যাচ্ছে, তখনই দ্রুততার সঙ্গে আমরা পদক্ষেপ নিচ্ছি।’
