অনেক বয়স্ক মানুষকে দেখা যায় তাঁদের জীবনের ৬০- ৭০ বছর আগের ঘটনা হুবহু বলে দিচ্ছেন, অথচ আজকের অনেক তরুণ গতকাল দুপুরে কী খেয়েছেন সেটা মনে রাখতে পারছেন না। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় বয়স ৮০ পেরোনোর পরও তরুণদের মতো স্মৃতিশক্তি ধরে রাখা মানুষদের বলা হয় ‘সুপারএজারস’ (Superagers)।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর গবেষকেরা বিভিন্ন দেশের ১৪২ জন সুপারএজারের ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন, এই প্রখর স্মৃতিশক্তির পেছনে শুধু বংশগত বা জেনেটিক কারণ দায়ী নয়। বরং বিজ্ঞান, ইসলাম এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন পর্যালোচনা করলে এর আসল কারণগুলো ফুটে ওঠে।
অতীতে মানুষ সরাসরি লিখে রাখার চেয়ে মুখস্থ রাখার ওপর বেশি নির্ভর করত। বিশেষ করে আরব সমাজে স্মৃতিশক্তিকে একটি অনন্য শিল্প মনে করা হতো। মানুষ শারীরিকভাবে অত্যন্ত কর্মক্ষম ছিল, খাঁটি ও প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত খাবার খেত এবং মানুষের মানসিক চাপ ছিল তুলনামূলক কম।
কিন্ত বর্তমান বাস্তবতা একেবারে ভিন্ন, তথ্যপ্রযুক্তির অতি ব্যবহারের কারণে আধুনিক মানুষ এখন মস্তিষ্ককে খাটাতে চায় না। প্রক্রিয়াজাত খাবার
(Processed Food), ভেজাল, শারীরিকভাবে অলস জীবনযাপন এবং অতিরিক্ত ডিভাইসের ব্যবহার ব্রেইনের কার্যক্ষমতাকে দ্রুত হ্রাস করছে।
শরীরচর্চা ও সামাজিক সম্পর্ক, শিকাগো ইউনিভার্সিটির গবেষণা অনুযায়ী,
প্রখর স্মৃতিশক্তির পেছনে মূল ভূমিকা রাখে।
৮৩ শতাংশ সুপারএজারই প্রতিদিন ঘরের বাইরে বের হন এবং হাঁটাচলা করেন। শারীরিক পরিশ্রম মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়, যা স্মৃতি অক্ষুণ্ণ রাখতে সরাসরি সাহায্য করে। যারা পরিবার, বন্ধু ও সমাজের মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখেন এবং জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন, তাঁদের ব্রেইন দীর্ঘকাল সুস্থ থাকে।
ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী আমল, খাবার ও মানসিক সুস্থতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাঁরা বৃদ্ধ বয়সেও হাজার হাজার হাদিস নির্ভুলভাবে মুখস্থ রাখতেন।
কোরআন ও হাদিসের আলোকে স্মৃতিশক্তি ভালো রাখার প্রধান উপায়গুলো হলো
পাপাচার থেকে দূরে থাকা
বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম শাফেয়ী (রহ.) তাঁর ওস্তাদ ইমাম ওয়াকী (রহ.)-কে স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার কথা জানালে তিনি গুনাহ বর্জনের পরামর্শ দেন। কারণ জ্ঞান হলো আল্লাহর নূর, যা পাপাচারীর অন্তরে থাকে না।
কোরআন চর্চা ও জিকির
কোরআন তেলাওয়াত ও হিফজ করা মস্তিষ্কের সবচেয়ে বড় ব্যায়াম। নিয়মিত জিকির মানসিক উদ্বেগ দূর করে ব্রেইনকে শান্ত রাখে।
পরিমিত ও পুষ্টিকর খাবার
অতিরিক্ত আহার মস্তিষ্কে স্থবিরতা আনে। রাসুলুল্লাহ (সা.) পরিমিত আহারের নির্দেশ দিয়েছেন। মধু, কিসমিস, জলপাই ইত্যাদি সুন্নাহসম্মত খাবার স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে দারুণ সহায়ক।
চিন্তামুক্ত জীবন ও অল্পে তুষ্টতা
পাওয়ার লোভ না রেখে তাকদীরের ওপর ভরসা রাখা মানুষকে মানসিক চাপমুক্ত রাখে, যা স্মৃতিশক্তি ধরে রাখার অন্যতম পূর্বশর্ত।
মেধা বা জিনের চেয়েও আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন, মানসিক সুস্থতা, কর্মক্ষমতা এবং খাদ্যাভ্যাস স্মৃতিশক্তিকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে।
অলসতা ও অতিরিক্ত মানসিক চাপ ত্যাগ করে সামাজিক সুসম্পর্ক বজায় রাখা, শারীরিকভাবে কর্মক্ষম থাকা এবং পাপাচারমুক্ত জীবনযাপন করাই হলো শেষ বয়স পর্যন্ত স্মৃতিশক্তি সতেজ রাখার আসল চাবিকাঠি।
