ইউরোপীয় ফুটবলে নিজেদের দাপটের প্রমাণ দিল প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)। বুধবার রাতে চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচে ম্যানচেস্টার সিটির মাঠে ৪-২ গোলের জয় তুলে নিয়েছে ফরাসি চ্যাম্পিয়নরা। প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক নিয়ম ব্যাপকভাবে লঙ্ঘনের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর নিজেদের মাঠে প্রথম ম্যাচেই হারল ম্যানচেস্টার সিটি।
ম্যাচের প্রথম ৩৫ মিনিটের মধ্যেই তিন গোল করে স্বাগতিকদের কোণঠাসা করে ফেলে পিএসজি। গোল করেন দেজিরে দুয়ে, উসমান দেম্বেলে ও ভিতিনিয়া। দ্বিতীয়ার্ধে আর্লিং হলান্ডের দুই গোলের মাঝে একবার ব্যবধান বাড়ান মাগনেস আকলিউশে। ফলে শেষ পর্যন্ত দুই গোলের ব্যবধানে হার নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় সিটিকে।
গত মাসে একটি স্বাধীন কমিশনের রায়ে আর্থিক অনিয়মের ১০০টিরও বেশি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয় ম্যানচেস্টার সিটি। রায়ের বিরুদ্ধে সফলভাবে আপিল করতে না পারলে ইংলিশ ক্লাবটিকে কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে।
ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেও রোববার লিভারপুলকে ৩-০ গোলে হারিয়ে প্রিমিয়ার লিগের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছিল সিটি। কিন্তু পিএসজির বিপক্ষে হার তাদের নতুন করে চাপে ফেলেছে। অন্যদিকে টানা তৃতীয় মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের লক্ষ্যে থাকা পিএসজি দেখিয়েছে, কেন তাদের এই প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান দাবিদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
গত মে মাসে ম্যানচেস্টার সিটির দায়িত্ব ছাড়ার পর প্রথমবার ইতিহাদ স্টেডিয়ামে ফিরেছিলেন সাবেক কোচ পেপ গার্দিওলা। ক্লাবের চেয়ারম্যান খালদুন আল মুবারক ও প্রধান নির্বাহী ফেরান সোরিয়ানোর পেছনে বসে ম্যাচ দেখেন তিনি। আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে চাপে থাকা ক্লাবটির প্রতি সংহতির বার্তাও ছিল এই উপস্থিতিতে।
ম্যাচ শুরুর আগে ২০০৮ সালে আবুধাবির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের হাতে ক্লাবটির মালিকানা যাওয়ার আগে ও পরের বিভিন্ন সাফল্যের মুহূর্ত তুলে ধরে দীর্ঘ একটি ভিডিও দেখানো হয়। আর্থিক অনিয়মের রায়ের প্রসঙ্গ সরাসরি উল্লেখ না করলেও ভিডিওটির মাধ্যমে ক্লাবের ইতিহাস ও অর্জন সামনে আনে সিটি।
গ্যালারির এক প্রান্তে বিশাল ব্যানার মেলে ধরেন সমর্থকেরা। তাতে লেখা ছিল, 'মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমি সিটির সমর্থক।'
তবে গ্যালারির সেই দৃঢ় প্রত্যয়ের প্রতিফলন মাঠে দেখা যায়নি। প্রথমার্ধে পিএসজির দুর্দান্ত আক্রমণের সামনে কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়ে স্বাগতিকেরা।
পিএসজি কোচ লুইস এনরিকের খভিচা কাভারাসখেলিয়াকে প্রথম একাদশের বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত কাজে লেগে যায়। তার পরিবর্তে বাঁ প্রান্তে খেলার সুযোগ পান দেজিরে দুয়ে।
অন্যদিকে পিএসজির গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি দোন্নারুমার জন্য ম্যাচটি ছিল নিজেকে প্রমাণের সুযোগ। ২০২৫ সালে ক্লাবটির প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পরও কোচের সিদ্ধান্তে দল ছাড়তে হয়েছিল ইতালিয়ান এই গোলরক্ষককে। তবে রাতটি তার জন্য সুখকর হয়নি।
দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণ থেকে বক্সের বাইরে বল পেয়ে শট নেন দুয়ে। দোন্নারুমার কাছের পোস্ট দিয়ে বল জালে জড়ালে এগিয়ে যায় পিএসজি।
এর মাত্র দুই মিনিট পর দ্বিতীয় গোলটি ছিল আরও দৃষ্টিনন্দন। দুয়ে ও দেম্বেলের চমৎকার বোঝাপড়ায় একের পর এক পাস বিনিময়ের পর বল পেয়ে যান দেম্বেলে। দূরের পোস্টে হেড করে বল জালে পাঠান তিনি।
এরপর আচরাফ হাকিমির শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। তবে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি পিএসজিকে। বক্সের প্রান্ত থেকে জোরালো শটে তৃতীয় গোলটি করেন ভিতিনিয়া।
প্রথমার্ধে তিন গোল হজম করে চাপে পড়ে যায় সিটি। বিরতির সময় একসঙ্গে তিন খেলোয়াড় পরিবর্তন করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন কোচ এনজো মারেস্কা।
দ্বিতীয়ার্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে সিটি। আঁতোয়ান সেমেনিও ও এনজো ফার্নান্দেজ সহজ সুযোগ নষ্ট করেন। এরপর ইলিমান দিয়ায়ের ক্রস থেকে হেড করে ব্যবধান কমান হলান্ড।
তবে সিটির ঘুরে দাঁড়ানোর আশা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। দোন্নারুমা মাগনেস আকলিউশের শট ঠেকানোর চেষ্টা করলেও বল উঁচুতে উঠে ঘুরে আবার জালে ঢুকে যায়। ফলে আবারও তিন গোলের ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে স্বাগতিকেরা।
এরপর ম্যাচে ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে সিটি। নিজেদের গোললাইন থেকে দুর্দান্তভাবে বল সরিয়ে দেন নুনো মেন্দেস। হলান্ডের আরেকটি শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। তবে শেষ পর্যন্ত নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন নরওয়েজীয় এই স্ট্রাইকার।
ম্যাচের শেষ দিকে ফেরান তোরেস পেনাল্টি থেকে গোল করার সুযোগ পেলেও তার শট ঠেকিয়ে দেন দোন্নারুমা। ফলে পঞ্চম গোলের দেখা পায়নি পিএসজি।
রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা দুই ক্লাবের লড়াইয়ে আপাতত এগিয়ে পিএসজি। কাতারের মালিকানাধীন ফরাসি ক্লাবটি ইউরোপীয় ফুটবলে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করছে। অন্যদিকে, গত ১৫ বছরে অসংখ্য শিরোপা জেতা ম্যানচেস্টার সিটির অর্জন এখন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ও শাস্তির আশঙ্কায় নতুন করে আলোচনায়।
মাঠে পিএসজির কাছে হার এবং মাঠের বাইরে আর্থিক অনিয়মের রায়—দুই দিক থেকেই কঠিন সময় পার করছে সিটি। ইউরোপীয় ফুটবলে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে হলে এখন মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি আইনি চ্যালেঞ্জও সামলাতে হবে ইংলিশ ক্লাবটিকে।
