বন্ধুর অবহেলা, কাছের মানুষের আমন্ত্রণ না পাওয়া কিংবা সাহায্য চেয়েও সাড়া না মেলা; ছোট ছোট এসব ঘটনাও মনে গভীর কষ্ট দিতে পারে। প্রত্যাখ্যানের প্রভাব পড়ে আমাদের আবেগ, আত্মবিশ্বাস ও সম্পর্কে। তবে, কিছু অভ্যাসে এই কষ্ট সামলে ওঠা সম্ভব।
ছোট প্রত্যাখ্যানেও এত কষ্ট কেন?
প্রত্যাখ্যানের কথা উঠলে অনেকের মনেই প্রথমে আসে প্রেমের সম্পর্কের কথা। কিন্তু, প্রতিদিনের ছোট ছোট ঘটনাও মনে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অনুভূতি তৈরি করতে পারে। বন্ধুর কাছে সাহায্য চেয়ে সাড়া না পাওয়া কিংবা আত্মীয়ের কোনো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ না পাওয়ার মতো ঘটনা এর উদাহরণ। এসবের পেছনে যুক্তি সংগত কারণ থাকলেও মন খারাপ হতে পারে। কারণ, প্রত্যাখ্যান অল্প হলেও কষ্টটা সত্যি।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার গ্যাব্রিয়েলা সিলভা ও তার সহকর্মীদের ২০২৬ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রত্যাখ্যান কষ্ট দেয়, কারণ এতে মনে হতে পারে অন্যদের কাছে আমাদের গুরুত্ব কমে গেছে কিংবা সম্পর্কটি হুমকির মুখে পড়েছে। কখনো কখনো এই অনুভূতি শারীরিক ব্যথার মতোও মনে হতে পারে।
প্রত্যাখ্যাত হলে শুধু মন খারাপ হয় না, রাগও হতে পারে। অনেকে একই ঘটনা নিয়ে বারবার ভাবতে থাকেন। আবার অন্যরা নিজেদের দুর্বলতা বা ত্রুটি ধরে ফেলেছে—এমন মনে হলে লজ্জা ও অস্বস্তিও তৈরি হতে পারে।
সময় গড়ানোর সঙ্গে এসব নেতিবাচক অনুভূতি ও চিন্তা একে অন্যকে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর কেউ কেউ তাদের গ্রহণ করেন, এমন মানুষের সঙ্গে সময় কাটিয়ে কষ্ট কমানোর চেষ্টা করেন। আবার অনেকে ভবিষ্যতে আরো প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেন।
গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, প্রত্যাখ্যানের পর তৈরি হওয়া আবেগ ভবিষ্যতের সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাদের ভাষায়, “প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করলে বা সামাজিক হুমকির বিষয়টি অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করলে মানুষ অনিচ্ছাকৃতভাবেই ভবিষ্যতে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।” এতে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে। অর্থাৎ, প্রত্যাখ্যানের কষ্ট থেকে তৈরি হওয়া প্রতিক্রিয়াই কখনো কখনো আরও প্রত্যাখ্যানের কারণ হতে পারে।
প্রত্যাখ্যানের প্রভাব নিয়ে কী বলছে গবেষণা?
প্রত্যাখ্যানের অভিজ্ঞতা ও এর ফলে তৈরি হওয়া আবেগ বুঝতে দুটি গবেষণা করা হয়। এতে ব্যবহার করা হয় ‘এক্সপেরিয়েন্স স্যাম্পলিং মেথড’ (ইএসএম)। এ পদ্ধতিতে অংশগ্রহণকারীরা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঘটনা এবং তখন তাদের কেমন লাগছিল, তা নথিবদ্ধ করেন।অতীতের কোনো ঘটনা মনে করে পরে অনুভূতির কথা বলার বদলে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অভিজ্ঞতা লিখে রাখায় আরো নির্ভুল তথ্য পাওয়া যায়।
ফলাফলে দেখা যায়, প্রত্যাখ্যাত হওয়ার দিনেই নেতিবাচক আবেগ ও একা থাকার ইচ্ছা বেড়ে যায়। তবে, পরদিনের অনুভূতিতে প্রত্যাখ্যানের প্রভাব দেখা যায়নি। গবেষণাটির লেখকদের ধারণা, ঘুম আবেগের এই চক্রে বিরতি এনে নতুন করে মানসিক ভারসাম্য ফিরিয়ে দিতে পারে। কর্মক্ষেত্রে খারাপ দিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে করা অন্য গবেষণাতেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে।
দ্বিতীয় গবেষণায় দিনের বিভিন্ন সময়ে আবেগের পরিবর্তন খতিয়ে দেখা হয়। এ গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ২৮ দিন ধরে প্রতিদিন দৈবভাবে বেছে নেওয়া সময়ে চারবার নিজেদের অনুভূতির তথ্য দেন। পাশাপাশি, বিভিন্ন মানসিক সমস্যার লক্ষণ শনাক্ত করতে তাদের অনলাইনে সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। এর ভিত্তিতে অংশগ্রহণকারীদের সামাজিক উদ্বেগজনিত ব্যাধি (সোশ্যাল অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার—এসএডি) আছে কি না, তা বিবেচনায় নিয়ে আলাদা করা হয়। প্রথম গবেষণায় এই বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
দ্বিতীয় গবেষণাতেও দেখা যায়, প্রত্যাখ্যান দিনের বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের নেতিবাচক আবেগ তৈরি করতে পারে। আবার এসব আবেগও প্রত্যাখ্যানের অভিজ্ঞতাকে আরো নেতিবাচক করে তুলতে পারে। সামাজিক উদ্বেগ এই চক্রকে আরো জটিল করে। যাদের সামাজিক উদ্বেগজনিত ব্যাধি রয়েছে, তাদের মধ্যে লজ্জা ও বিব্রতবোধের প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। এর ফলে একা থাকার ইচ্ছাও বেড়েছে।
দুটি গবেষণাতেই দেখা যায়, প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অভিজ্ঞতা বেশ সাধারণ। প্রথম গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ৬৭ শতাংশ এবং দ্বিতীয় গবেষণায় ৯৩ শতাংশ এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
তবে, প্রত্যাখ্যানের প্রতিক্রিয়া সবার ক্ষেত্রে এক রকম নয়। একই ব্যক্তিও সব ঘটনায় একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান না। অপরিচিত কারো খারাপ আচরণ সহজে উপেক্ষা করা গেলেও কাছের মানুষের কাছ থেকে এমন আচরণ পেলে বেশি কষ্ট হতে পারে। যেমন, পরিবারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ না পাওয়া।
প্রত্যাখ্যানের কষ্ট সামলাবেন কীভাবে?
সিলভা ও তার সহকর্মীদের গবেষণা বলছে, প্রত্যাখ্যান দৈনন্দিন জীবনেরই একটি অংশ। অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অনুভূতিকে সামান্য বা মাঝারি মাত্রার বলে জানিয়েছেন। তবে, ১০ শতাংশের বেশি অংশগ্রহণকারী তাদের অভিজ্ঞতাকে ‘অনেকটা’ বা ‘গুরুতর’ বলে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, দৈনন্দিন জীবনে কখনো না কখনো প্রত্যাখ্যাত বোধ করার অভিজ্ঞতা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, এমন পরিস্থিতিতে আমরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাই।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রত্যাখ্যাত হওয়ার সব অনুভূতির পেছনে বাস্তব কোনো ঘটনা থাকে না। কিছু অংশগ্রহণকারী তখন সরাসরি প্রত্যাখ্যাত হননি; বরং অতীতের কোনো ঘটনা নিয়ে ভাবছিলেন কিংবা ভবিষ্যতে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আশঙ্কা করছিলেন। তাই নিজের মনে এমন আশঙ্কা বা ভাবনা তৈরি হচ্ছে কি না, তা খেয়াল করলে নেতিবাচক চিন্তা ও আবেগের চক্র ভাঙা সহজ হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে নিজেকে একটু সময় দেওয়াও কাজে আসতে পারে। কষ্টের মুহূর্তে তাড়াহুড়া করে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে ঘুমিয়ে নেওয়া বা পরদিন ঠান্ডা মাথায় বিষয়টি ভাবা সহায়ক হতে পারে।
প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর একা থাকতে ইচ্ছা করাও স্বাভাবিক; সেটি বাস্তব ঘটনা থেকে তৈরি হোক কিংবা মনের আশঙ্কা থেকে। তবে, পুরোপুরি নিজেকে গুটিয়ে না রেখে বন্ধু, পরিবার বা যাদের সঙ্গে স্বস্তি বোধ করেন, তাদের সঙ্গে সময় কাটানোর চেষ্টা করুন। এতে কষ্ট ও অস্বস্তি কমতে পারে, পাশাপাশি রাগও ধীরে ধীরে প্রশমিত হতে পারে।
প্রত্যাখ্যান আত্মসম্মানেও আঘাত করতে পারে, বিশেষ করে সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে বারবার ভাবতে থাকলে। তাই নেতিবাচক চিন্তার চক্র থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। এতে নিজের ওপর আস্থা ফিরে পেতে সাহায্য হতে পারে এবং ভবিষ্যতে প্রত্যাখ্যানের ঝুঁকিও কমতে পারে।
প্রত্যাখ্যান জীবনের সাধারণ, তবে অস্বস্তিকর একটি অভিজ্ঞতা। এর ফলে তৈরি হওয়া আবেগ বুঝতে ও সামলাতে শিখলে নিজের ওপর আস্থা ধরে রাখা এবং অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক আরো সুন্দর করে তোলা সম্ভব।
* সাইকোলজি টুডে অবলম্বনে
