আজকের পত্রিকা ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে যখন হুয়াওয়ে বিচারের মুখোমুখি, তখন ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকা কোম্পানিটির প্রযুক্তি কেনা অব্যাহত রেখেছে। এর ফলে বেইজিং এমন এক প্রভাব বিস্তার করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আদালতের রায় সহজে বাতিল করতে পারবে না। হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আনা অভিযোগুলোর মধ্যে আছে—কর্পোরেট গোয়েন্দাগিরি, প্রকাশ্য চুরি, অনৈতিক সুবিধা দেওয়া ও নেওয়া, বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গ আঁতাত ইত্যাদি। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ বর্তমানে নিউ ইয়র্কের আদালতে হুয়াওয়ের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা করছে।
মামলার সূচনা বক্তব্যে মার্কিন বিচার বিভাগের এক আইনজীবী দাবি করেন, দীর্ঘ ২০ বছর ধরে হুয়াওয়ে ‘আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং আমেরিকার আর্থিক ব্যবস্থার অপব্যবহার করেছে, যাতে তারা বিশ্বজুড়ে টেলিকমিউনিকেশন খাতে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে।’ কথাগুলো বেশ কড়া হলেও যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের বিশ্ব এগুলোকে হয়তো গুরুত্ব দিচ্ছে না বা নানা যুক্তিতে এড়িয়ে যাচ্ছে। আইনজীবী যেমনটা বলেছেন, বিশ্বব্যাপী টেলিকম খাতে আধিপত্য বিস্তারে চীন সত্যিই অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
হুয়াওয়ে যেভাবে চীনা সরকারেরই সম্প্রসারিত অংশ হয়ে উঠেছে
চীনে বেসরকারি ও সরকারি খাতের মধ্যে স্পষ্ট কোনো বিভাজন নেই। হুয়াওয়ের মতো বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল সরকারি ভর্তুকি ও অনুকূল সরকারি চুক্তি পায়। সেই সঙ্গে তাদের কাজের ওপর থাকে এক ধরনের অস্পষ্টতার আস্তরণ। চীনের জাতীয় গোয়েন্দা আইন অনুযায়ী, হুয়াওয়ে চীনা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আদেশ মানতে এবং সরকার চাইলে তথ্য বা ডেটা দিতে বাধ্য।
হুয়াওয়ের দাবি, তারা মূলত প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, যা কিছুটা সত্য। কিন্তু একই সঙ্গে তারা চীনা রাষ্ট্র ও তাদের জাতীয় স্বার্থের একটি সম্প্রসারিত অংশও, যার মূল লক্ষ্য অত্যাধুনিক শিল্পে আধিপত্য তৈরি করা। ৫জি ও ৬ জির মতো প্রযুক্তিতে বিশ্বনেতা হওয়ার কারণে হুয়াওয়ে বেইজিংয়ের সফট পাওয়ার বা কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এর ফলেই যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে তারা নিরবচ্ছিন্ন সমর্থন ও অনুগত বাজার পেয়ে যাচ্ছে।
ইউরোপ ও লাতিন কেন এখনো হুয়াওয়ের প্রযুক্তি কিনছে
যুক্তরাষ্ট্র যখন হুয়াওয়ে তথা চীনকে আদালতে দাঁড় করাচ্ছে, আটলান্টিকের ওপারে ইউরোপে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। সাত বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে হুয়াওয়েকে নিষিদ্ধ করেছিল, ইউরোপীয় ইউনিয়ন নির্বাহী বিভাগও এখন তা করবে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক করছে। কিন্তু স্থানীয় টেলিকম কোম্পানিগুলোর তীব্র বাঁধার মুখে পড়ছে তারা। কানেক্ট ইউরোপ নামের একটি লবিং গ্রুপ চিঠি দিয়ে সতর্ক করেছে যে, হুয়াওয়েকে নিষিদ্ধ করলে ‘ফাইবার,৫জি এবং ৬জি বিস্তারের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন ঘাটতি তৈরি হতে পারে।’
যুক্তরাষ্ট্রের চাপ সত্ত্বেও হুয়াওয়েকে বাদ দেওয়া নিয়ে ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরে দ্বিধাবিভক্ত। কারণ হুয়াওয়ে ইতোমধ্যে ইউরোপের ডিজিটাল অবকাঠামো ও দৈনন্দিন জীবনে গভীরভাবে গেঁথে গেছে। ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকে ইউরোপের নতুন ৫জি সাইটগুলোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশই চীনা কোম্পানিগুলো সরবরাহ করেছে। প্রভাবশালী দেশ জার্মানির ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি প্রযোজ্য, যেখানে প্রায় ৬০ শতাংশ ৫জি রেডিও অ্যাক্সেস নেটওয়ার্ক (আরএএন) অবকাঠামোই হুয়াওয়ের তৈরি।
এই সব অবকাঠামো হঠাৎ বদলে ফেলতে গেলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের খরচ হতে পারে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ইউরো (প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার)। এমন এক সময়ে এই খরচের ধাক্কা আসবে যখন সাধারণ পরিবার ও সরকার—উভয়ের বাজেটই টানাটানির মধ্যে রয়েছে। শুধু ইউরোপেই নয়, লাতিন আমেরিকাতেও হুয়াওয়ে ব্যাপকভাবে ব্যবসা বাড়াচ্ছে। নির্মাণ ও অবকাঠামোর তুলনামূলক কম খরচের সুযোগ দেখিয়ে তারা স্থানীয় কর্মকর্তাদের আকৃষ্ট করছে, যারা প্রায়ই ওয়াশিংটনের বারণ বা হুশিয়ারি উপেক্ষা করতে প্রস্তুত।
এর মাধ্যমে বিভিন্ন উপায়ে চীনের সফট পাওয়ার তৈরি হচ্ছে। একদিকে চীন বিপুল রাজস্ব পাচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অঞ্চলের কাছাকাছি বেইজিংয়ের শক্ত অবস্থান তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে রয়েছে কিছু উদ্বেগের বিষয়। যেমন—গুয়াতেমালায় হুয়াওয়ে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক তৈরি করছে এবং স্থানীয়দের কারিগরি প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। গুয়াতেমালা মধ্য আমেরিকার মাত্র দুটি দেশের একটি, যারা এখনো তাইওয়ানকে স্বীকৃতি দেয়। চলতি বছরের এপ্রিলে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চীনা হ্যাকারদের আক্রমণের শিকার হয়েছিল বলে খবর পাওয়া যায়।
চীনের এই কৌশলগত অবস্থানের পেছনে আদর্শগত চিন্তাভাবনা রয়েছে। বর্তমানে প্রযুক্তি খাত এবং বিশেষ করে ইন্টারনেট ব্যবস্থা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের উন্মুক্ততা, বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের নীতিতে পরিচালিত হয়। যদিও বাস্তবে এই দাবি অনেকটাই খেলো। চীন যদি আমেরিকান প্রযুক্তি সরিয়ে নিজেদের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তবে তারা গ্রেট ফায়ারওয়ালের নীতি এনে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন এই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধগুলোকেও বদলে দিতে পারে। এরপর তারা সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে ঘরের মতো বিশ্বমঞ্চেও তাইওয়ান-সংক্রান্ত আলোচনার ওপর নজরদারি ও সেন্সরশিপ চালাতে পারে।
এগুলো শুধু মুখের কথা বা নিছক আশঙ্কা নয়। দুই বছর আগে বৈশ্বিক দক্ষিণ বা গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোতে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে গবেষকদের করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, হুয়াওয়ের মতো কোম্পানিগুলো তাদের উন্নত প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (এআই) ভিডিও নজরদারি ব্যবস্থা এবং নজরদারিমূলক সফটওয়্যারের সঙ্গে সমন্বিত করছে। বিভিন্ন দেশের সরকার এসব প্রযুক্তি কিনে ভিন্নমত দমন ও নাগরিকদের ওপর নজরদারিতে ব্যবহার করছে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘এই বিষয়গুলো একত্র করলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, চীন ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদ মডেল রপ্তানি করছে, যা মানুষের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ফেলছে।’
যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করছে
আমেরিকার প্রতিক্রিয়া মূলত তাদের নিজস্ব তথাকথিত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে তৈরি—হুয়াওয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ, আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানের মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বী গড়ে তোলা। এই কৌশলটি তথাকথিত আইনের শাসন ও অর্থনৈতিক উদারবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা কি না আবার যুক্তরাষ্ট্রের নিজেরই তৈরি করা। আর এই সব কৌশলের সাথে নিউ ইয়র্ক সিটির এই বিচার প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি মিলে যায়।
হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা বেশ দীর্ঘ ও পরিচিত। তারা আমেরিকান কোম্পানিগুলোর বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরি এবং কর্পোরেট গোয়েন্দাগিরির অভিযোগে অভিযুক্ত। পশ্চিমারা দাবি করে এটি চীনের সেই সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রচেষ্টারই অংশ ছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন উদ্ভাবনগুলোকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের প্রযুক্তি খাতকে রাতারাতি অনেক দূর এগিয়ে নেওয়া। এখন বড় প্রশ্ন হলো—বিশ্বজুড়ে হুয়াওয়ের যে দ্রুত বিস্তার ঘটছে, তার সামনে যুক্তরাষ্ট্রের এই আইনি ও কৌশলগত পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলো সময় থাকতে বিষয়টি বুঝতে পারবে কি না।

