কালবেলা · দেশ
ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে ৫.০৭ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা
২১/১০/২০২৬

দেশের বিভিন্ন জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয় ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মোট উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ০৭ মেগাওয়াটে। এসব ব্যবস্থা পুরোপুরি কাজে লাগানো এবং নেট মিটারিং কার্যকর করা গেলে বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়ের পাশাপাশি জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নেওয়ার প্রয়োজনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
সরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর এই উদ্যোগ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচি বাস্তবায়নের অগ্রগতিবিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত জেলা প্রশাসকের কার্যালয়গুলোতে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মোট সক্ষমতা চার হাজার ৬৬৩ কিলোওয়াট। আর পাঁচটি বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে এ সক্ষমতা ৪০৫ দশমিক ৫ কিলোওয়াট। কর্মসূচিটি বাস্তবায়নে সরকারিভাবে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫ কোটি ১৪ লাখ ৮৬ হাজার টাকা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারি কার্যালয়গুলোর ভবনের ছাদে ইতোমধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। তবে নেট মিটারিংয়ের অনুমোদনসহ কিছু প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে। এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সৌরবিদ্যুতের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়ের সুযোগ বাড়বে। দিনের বেলায় কার্যালয়গুলোর নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরশীলতাও কমবে।
বিভাগ ও জেলাভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা ও ব্যয়
ঢাকা বিভাগ: ঢাকা বিভাগের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়গুলোর মধ্যে কিশোরগঞ্জে সর্বোচ্চ ৩৬০ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া মানিকগঞ্জে ৭৭, গোপালগঞ্জে ৭৩, ফরিদপুরে ৫৯, ঢাকা ও রাজবাড়ীতে ৫০ করে, শরীয়তপুরে ২৪ এবং গাজীপুরে ১০ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা রয়েছে। এ বিভাগের জেলাগুলোতে প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৮৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা।
খুলনা বিভাগ: খুলনা বিভাগের জেলা কার্যালয়গুলোর মধ্যে খুলনায় ১৮০, মেহেরপুরে ৮০, ঝিনাইদহ ও নড়াইলে ৬০ করে এবং বাগেরহাটে ৫০ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে। এ বিভাগে মোট ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৭৪ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। এ ছাড়া বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ২০০ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা স্থাপনে ব্যয় হয়েছে ৭৮ লাখ ৯৭ হাজার টাকা।
রংপুর বিভাগ: এ বিভাগের জেলা কার্যালয়গুলোর মধ্যে দিনাজপুরে ১৫১, গাইবান্ধায় ১২২, ঠাকুরগাঁওয়ে ৫০, নীলফামারীতে ৪৮, কুড়িগ্রামে ৪৫, রংপুরে ২৯, পঞ্চগড়ে ২৫ এবং লালমনিরহাটে ২০ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এ বিভাগে মোট ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৮ লাখ ৫২ হাজার টাকা। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ৭৭ দশমিক ৫ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা স্থাপনে ব্যয় হয়েছে ৩৬ লাখ ৮৭ হাজার টাকা।
রাজশাহী বিভাগ: রাজশাহী বিভাগের জেলা কার্যালয়গুলোর মধ্যে সিরাজগঞ্জে ১৫০, নওগাঁয় ১০৫, বগুড়ায় ১০০, রাজশাহীতে ৫০, পাবনায় ৪৭ দশমিক ২৬, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩০ করে এবং জয়পুরহাটে ১৩ দশমিক ১২৫ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে। এ বিভাগে মোট ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৪৮ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। অন্যদিকে, বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ৩৮ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা স্থাপনে ব্যয় হয়েছে ১৮ লাখ ২১ হাজার টাকা।
সিলেট বিভাগ: সিলেট বিভাগের জেলা কার্যালয়গুলোর মধ্যে মৌলভীবাজারে ১৮০, সিলেটে ১০০, সুনামগঞ্জে ৯০ এবং হবিগঞ্জে ১০ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে। এ বিভাগে মোট ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৫৪ লাখ ৮ হাজার টাকা। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ৭০ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা স্থাপনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৭ লাখ ৩৩ হাজার টাকা।
চট্টগ্রাম বিভাগ: এ বিভাগের জেলা কার্যালয়গুলোর মধ্যে নোয়াখালীতে ২২৫, কক্সবাজারে ৮৫, চাঁদপুরে ৫০, ফেনীতে ৪৫, বান্দরবানে ৪১ এবং চট্টগ্রাম জেলায় ৩৯ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে। এ বিভাগে মোট ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ২৮ লাখ ৯৪ হাজার টাকা।
বরিশাল বিভাগ: বরিশাল বিভাগের জেলা কার্যালয়গুলোর মধ্যে বরগুনায় ৬০ এবং পিরোজপুর, পটুয়াখালী ও ঝালকাঠিতে ৫০ কিলোওয়াট করে সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে। এ বিভাগে মোট ৪১ লাখ ২১ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ২০ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা স্থাপনে ব্যয় হয়েছে ৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
ময়মনসিংহ বিভাগ: এ বিভাগের জেলা কার্যালয়গুলোর মধ্যে জামালপুর ও নেত্রকোনায় ১০০ কিলোওয়াট করে, শেরপুরে ৬০ এবং ময়মনসিংহ জেলায় ৫০ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এ বিভাগের প্রকল্প ব্যয়ের কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সক্ষমতা ও ব্যয়ের তথ্য পাওয়া যায়নি। ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় ভাড়া ভবনে পরিচালিত হওয়ায় সেখানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া ঢাকা বিভাগের টাঙ্গাইল, মাদারীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জে দরপত্র আহ্বান করা হলেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা যায়নি। খুলনা বিভাগের চুয়াডাঙ্গায় বরাদ্দের তুলনায় দরপত্রের প্রস্তাবিত মূল্য বেশি হওয়ায় কাজ এগোয়নি। বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠিতে বরাদ্দ থাকলেও অর্থ ব্যয় করা হয়নি।
অন্যদিকে, বরিশাল বিভাগের বরিশাল ও ভোলা এবং চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, খাগড়াছড়ি, লক্ষ্মীপুর ও রাঙামাটিতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সক্ষমতার তথ্য পাওয়া যায়নি।
ক্যাপেক্স মডেলে স্থাপন, নেট মিটারিংয়ে বিল সাশ্রয়ের সম্ভাবনা
সরকার নিজস্ব অর্থায়নে অর্থাৎ ‘ক্যাপেক্স মডেল’-এ এসব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করেছে। এর মাধ্যমে কার্যালয়গুলো দিনের বেলায় নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ করছে। এতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় হচ্ছে। নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের সুযোগও রয়েছে। তবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়গুলোর নেট মিটারিংয়ের আবেদন এখনো প্রক্রিয়াধীন।
ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) শরীয়তপুর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ২৪ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। তবে নেট মিটারিংয়ের আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকায় উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুতের বিপরীতে বিল সমন্বয় এখনো শুরু হয়নি।
ওজোপাডিকো আরও জানায়, শরীয়তপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রতি মাসে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৫ হাজার ইউনিট। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালুর পর থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৮০০ ইউনিট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নেওয়ার প্রয়োজন কমছে এবং কার্যালয়টির বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়ে ভূমিকা রাখছে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বলেন, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের ছাদে স্থাপিত ৫ মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা জাতীয় পর্যায়ে খুব বড় অবদান না রাখলেও এগুলোকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেলে অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি ভবনে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে দৃষ্টান্ত তৈরি হবে।
তিনি বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রসারে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ পর্যায়ে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে নেট মিটারিং সংযোগ দিতে দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন ও নেট মিটারিং সংযোগের কার্যক্রম সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায় বলেন, সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগের আওতায় মেহেরপুরে ইতোমধ্যে ৮০ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর বিদ্যুতের চাহিদাজনিত চাপ কমাতে সহায়তা করবে। বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মোকাবিলা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগিয়ে যাওয়ার বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে সরকারি ভবনের ছাদ কাজে লাগিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দিয়ে ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-২০৩০’ গ্রহণ করেছে। এ কৌশলপত্রে ২০৩০ সালের মধ্যে সাড়ে ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট আসবে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের মোট সক্ষমতা ১ হাজার ৯৩৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুতের অবদান ১ হাজার ৬৪২ মেগাওয়াট, যা নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের মোট সক্ষমতার বড় অংশ।
সূত্র: বাসস
মূল প্রতিবেদনে যান ↗