ঢাকা শহরকে পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য করে তুলতে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ‘সবার কথা বাদ দেন, নিজের সন্তানের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর পরিবেশ,
জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী
ঢাকা শহরকে পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য করে তুলতে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ‘সবার কথা বাদ দেন, নিজের সন্তানের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, একটি স্বাস্থ্যকর শহর গড়ে তুলি। আসুন, আমরা সবাই মিলে সেই চেষ্টা করি। গতকাল সোমবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান কার্যালয় নগর ভবন পরিদর্শনকালে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান। এর আগে প্রধানমন্ত্রী জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন করেন। একই সঙ্গে তিনি আধুনিকায়িত ওসমানী উদ্যানেরও উদ্বোধন করেন। সঙ্গে ছিলেন গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের বাবা মো. মকবুল হোসেন, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান, শাহারিয়ার খাঁন আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং ওয়াসিম আকরামের বাবা মোহাম্মদ শফিউল আলম।
উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারা রোপণ করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী আধুনিকায়িত ওসমানী উদ্যানের উদ্বোধন করেন। এ সময় তিনি উদ্যান প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখেন। উদ্যানের পাশে স্থাপিত গ্রন্থাগারও পরিদর্শন করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আবদুল মঈন খান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং রাজধানীর নাগরিক পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে নির্মাণ করা হয়েছে ৯০ ফুট উঁচু ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’। প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভটির গায়ে লেজার কাটিংয়ের মাধ্যমে খোদাই করা হয়েছে ৮৩৪ জন শহীদের নাম। সামনে স্থাপন করা হয়েছে ২০টি প্রতীকী সমাধিফলক। স্মৃতিস্তম্ভের বাইরের দিকে ১৬৩ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে ৪ ফুট উঁচু এবং ভেতরে ১৭১ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে ৭ ফুট উঁচু রিলিফ ভাস্কর্য রয়েছে।
রাজধানীর পুরান ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত ২৩ একর আয়তনের ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়ন করা হয়েছে। প্রকল্পটির আওতায় উদ্যানটিকে সবুজ, নিরাপদ ও আধুনিক নাগরিক বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে পুরোনো জলাশয় সংস্কারের পাশাপাশি পাঁচটি নতুন জলাশয় নির্মাণ করা হয়েছে। বিদ্যমান গাছপালা সংরক্ষণ করে নতুন বৃক্ষরোপণ ও সবুজ দ্বীপ তৈরি করা হয়েছে। উদ্যানটিতে প্রায় ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার হাঁটার পথ, ব্যায়ামাগার, প্যাগোডা, গণশৌচাগার, পার্কিং ও জলাশয়ের ঘাট নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার বৃষ্টির পানির সংরক্ষণ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দুই স্তরে সাজানো উদ্যানটির সড়ক থেকে দুই মিটার উঁচুতে দ্রুত চলাচলের পথ রয়েছে।
সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে নগরীকে পরিচ্ছন্ন রাখার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, কেউ নিশ্চয়ই চান না তার সন্তান নোংরা, জীবাণুযুক্ত ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বড় হোক। সন্তান শুধু নিজের বাসার আশপাশে থাকে না; স্কুল, কলেজ, খেলার মাঠসহ শহরের বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াত করে। তাই শুধু নিজের এলাকা নয়, পুরো শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। তিনি বলেন, ‘আপনার সন্তান তো শুধু আপনার এলাকায় থাকবে না। সে সারা ঢাকা শহরে বিচরণ করবে। কাজেই আসুন, আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করি। চেষ্টা করলে আমরা পারব।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা শহরের অন্যতম বড় সমস্যা আবর্জনা ও অপরিচ্ছন্নতা। এই সমস্যা এক দিনে বা সাত দিনে সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে সবাই আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে।
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই সমস্যার সমাধানের সঙ্গে জড়িত। হয়তো সময় লাগবে, কিন্তু চেষ্টা করে গেলে পরিবর্তন আসবেই। আপনাদের মধ্যে সেই আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে ইচ্ছা।’ কর্মকর্তাদেরও একইভাবে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সরকার প্রধান বলেন, ‘আমি যখন যেখানে যাই, দেখতে থাকি কোথায় কী সমস্যা আছে। তারপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ফোন করি। আপনারাও যদি এভাবে সমস্যাগুলো দেখেন এবং সমাধানে পদক্ষেপ নেন, তাহলে পরিবর্তন অবশ্যই সম্ভব।’
যুক্তরাজ্যের লন্ডন শহরের উদাহরণ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ষাট বা সত্তরের দশকে লন্ডনের অনেক জায়গায়ও ময়লা-আবর্জনা ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা ও নাগরিক সচেতনতার মাধ্যমে তারা পরিস্থিতির পরিবর্তন করেছে। তিনি বলেন, ‘আপনারা অনেকেই হয়তো বিদেশের সুন্দর, পরিচ্ছন্ন শহর দেখেছেন। দেশে ফিরে নিশ্চয়ই আফসোস হয়েছে, আমাদের শহরটা যদি এমন হতো! কিন্তু সেই আফসোস করে বসে থাকলে হবে না। নিজেদের দায়িত্বও পালন করতে হবে।’
ঢাকার পরিচ্ছন্নতা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারের সঙ্গে তাঁর সাম্প্রতিক কথোপকথনের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করা দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের একজন শীর্ষ ব্যক্তি সম্প্রতি তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় ঢাকার পরিবর্তন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, শহরের পরিচ্ছন্নতা আগের তুলনায় কিছুটা ভালো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তিনি কিন্তু বলেননি অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বলেছেন, কিছুটা ভালো হয়েছে। তার মানে পরিবর্তন সম্ভব। আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করলে আরও ভালো করা যাবে।’
এ সময় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন, স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব শহীদুল হাসান উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী আজ রাজশাহী আসছেন
রাজশাহী ব্যুরো
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি’র চেয়ারপার্সন তারেক রহমান আজ মঙ্গলবার রাজশাহী সফর করবেন। তাঁর সফরের মূল কার্যক্রম দুটি— বিকেলে জনসভায় ভাষণ প্রদান ও দুপুরে দুর্গোৎসব উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময়।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে রাজশাহীর দীর্ঘদিনের উন্নয়ন-দাবি ও প্রত্যাশা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরার প্রস্তুতি নিয়েছেন স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। সোমবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর সফরের সর্বশেষ প্রস্তুতি নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু এমপি। তিনি বলেন, অল্প সময়ের মধ্যে সফরের প্রস্তুতি নিতে হলেও রাজশাহীর মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আবেগ কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের এটিই প্রথম রাজশাহী সফর। তাঁকে ঘিরে দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ভূমিমন্ত্রী জানান, উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও কৃষকদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে এ সফরে আখচাষিদের জন্য প্রধানমন্ত্রী বিশেষ বার্তা দেবেন। তাঁর মতে, রাজশাহীর মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রত্যাশা তুলে ধরার ক্ষেত্রে এ সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ উল্লেখ করে মিজানুর রহমান মিনু বলেন, এ সফরে রাজশাহীর উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে বীজ সংরক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা, রাজশাহী বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নীত করা, কৃষিভিত্তিক রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) স্থাপন, রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ দ্রুত সম্পন্ন করা এবং একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা। পাশাপাশি রাজশাহী নগরীকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘শিক্ষা নগরী’ ঘোষণার দাবিও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর জনসভা উপলক্ষে গতকাল সোমবার রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠ পরিদর্শন করেন রাজশাহীর জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাগণ।
আজ সন্ধায় চট্টগ্রামে আসছেন
চট্টগ্রাম ব্যুরো
দুর্গাপূজায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং দলীয় সাংগঠনিক সভায় যোগ দিতে আজ মঙ্গলবার চট্টগ্রাম আসছেন প্রধানমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে নগর ও জেলাজুড়ে চার স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তায় পুলিশ, এসআরবি, আনসার ও বিজিবির ২০ হাজারের বেশি সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, গুজব ও নাশকতা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মঙ্গলবার বিকেল ৫টায় রাজশাহী থেকে সামরিক বিমানে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন। সেখান থেকে তিনি নগরের আন্দরকিল্লায় জেএম সেন হলের দুর্গাপূজামণ্ডপে যাবেন। সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে তাঁর সেখানে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সন্ধ্যা পৌনে ৭টা পর্যন্ত প্রায় ৪৫ মিনিট তিনি পূজামণ্ডপে অবস্থান করবেন।
এ সময় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি তাঁদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া ও প্রত্যাশার কথা শুনবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এ সফর ঘিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বাড়তি উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে।
পূজামণ্ডপের কর্মসূচি শেষে সন্ধ্যা ৭টায় নগরের কাজীর দেউড়িতে বিএনপির সাংগঠনিক সভায় যোগ দেবেন তারেক রহমান। এতে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা, দক্ষিণ জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতারা অংশ নেবেন।
