কেউ হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেলে তার মুখে পানি ছিটিয়ে জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করেন অনেকে। তবে চিকিৎসকদের মতে, এটি অজ্ঞান হওয়ার প্রকৃত কারণ দূর করে না; বরং জরুরি চিকিৎসা দিতে দেরি হতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে বিপদ বাড়তে পারে।
সম্প্রতি ইনস্টাগ্রামে এক পোস্টে এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন ভারতের অর্থোপেডিক সার্জন ডা. মীর জাওয়াদ জার খান। তার বক্তব্য, কেউ অজ্ঞান হলে মুখে পানি ছিটিয়ে জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করা চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ভুল পদক্ষেপ।
বিজ্ঞাপন
ভারতের থানে কেআইএমএস হাসপাতালের জরুরি বিভাগের প্রধান ডা. অলোক গাঙ্গুর্দে ব্যাখ্যা করেছেন, কেউ অজ্ঞান হয়ে গেলে কী করা উচিত, কখন জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন এবং কোন ভুলগুলো এড়িয়ে চলা দরকার।
অজ্ঞান ব্যক্তির মুখে পানি ছিটানো বিপজ্জনক কেন?
বিজ্ঞাপন
হঠাৎ রক্তচাপ কমে যাওয়া, রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যাওয়া, হৃদ্যন্ত্রের স্পন্দনে সমস্যা, খিঁচুনি কিংবা স্ট্রোকের কারণে কেউ অজ্ঞান হতে পারেন। মুখে পানি ছিটিয়ে এসব সমস্যার কোনো চিকিৎসা হয় না।
ডা. গাঙ্গুর্দের মতে, পানি ছিটিয়ে কাউকে জাগানোর চেষ্টা করতে গিয়ে আশপাশের মানুষ গুরুতর চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থা বুঝতে দেরি করতে পারেন। বিশেষ করে হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে।
এ সময় কেউ হাঁসফাঁস করতে পারেন, নাক ডাকার মতো শব্দ করতে পারেন কিংবা অনিয়মিতভাবে শ্বাস নিতে পারেন। এগুলোকে স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস মনে করা ঠিক নয়।
বিজ্ঞাপন
চিকিৎসক জানান, অজ্ঞান ব্যক্তি নিজের শ্বাসনালি ঠিকভাবে সুরক্ষিত রাখতে পারেন না। এ অবস্থায় মুখে বা নাকে পানি ঢুকলে শ্বাসরোধ হতে পারে কিংবা পানি ফুসফুসে প্রবেশ করতে পারে।
তাই মুখে পানি ছিটানোর পরিবর্তে ব্যক্তি সাড়া দিচ্ছেন কি না এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিচ্ছেন কি না, তা পরীক্ষা করা উচিত। পাশাপাশি দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নিতে হবে।
বিজ্ঞাপন
কেউ অজ্ঞান হলে কী করবেন?
কী পদক্ষেপ নিতে হবে, তা নির্ভর করবে ব্যক্তি পুরোপুরি অজ্ঞান হয়েছেন কি না এবং তার শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক আছে কি না, তার ওপর।
১. অজ্ঞান লাগছে, তবে ব্যক্তি সচেতন থাকলে
বিজ্ঞাপন
তাকে নিরাপদ স্থানে চিৎ করে শুইয়ে দিন এবং কোনো আঘাতের আশঙ্কা না থাকলে পা কিছুটা উঁচু করে রাখুন। অজ্ঞান হওয়ার আগাম লক্ষণ বুঝতে পারলে নিরাপদে শোয়ার আগ পর্যন্ত পা আড়াআড়ি করে রাখা, উরুর পেশিতে চাপ দেওয়া বা মুঠি শক্ত করে ধরার মতো কাজ রক্তচাপ ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।
২. ব্যক্তি সাড়া না দিলে
তিনি সাড়া দিচ্ছেন কি না পরীক্ষা করুন এবং সর্বোচ্চ ১০ সেকেন্ডের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক কি না দেখুন। শুধু হাঁসফাঁস করা বা মাঝেমধ্যে নাক ডাকার মতো শব্দ করাকে স্বাভাবিক শ্বাস নেওয়া মনে করবেন না।
বিজ্ঞাপন
৩. অজ্ঞান, তবে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিলে
গুরুতর মেরুদণ্ডের আঘাতের আশঙ্কা না থাকলে তাকে কাত করে রিকভারি পজিশনে রাখুন। নিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাস পর্যবেক্ষণ করুন। শ্বাস-প্রশ্বাস অস্বাভাবিক হয়ে গেলে তাকে চিৎ করে শুইয়ে সিপিআর শুরু করুন।
বিজ্ঞাপন
কখন জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন?
ডা. গাঙ্গুর্দের মতে, কয়েকটি পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া বিশেষভাবে জরুরি। যেমন—
- ব্যায়াম করার সময় বা শুয়ে থাকা অবস্থায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
- অজ্ঞান হওয়ার ঠিক আগে বুক ধড়ফড় করা।
- আগে থেকে হৃদ্রোগ থাকা।
- পরিবারে অল্প বয়সে আকস্মিক মৃত্যুর ইতিহাস থাকা।
- গর্ভাবস্থায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
- বয়স্ক ব্যক্তির অজ্ঞান হয়ে পড়া।
অজ্ঞান হওয়ার সময় কখনো কখনো অল্প সময়ের জন্য শরীর কেঁপে উঠতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ব্যক্তির মৃগীরোগ হয়েছে। অজ্ঞান হওয়ার প্রকৃত কারণ আশপাশের মানুষের পক্ষে নিশ্চিতভাবে বোঝা কঠিন। তাই চিকিৎসকের মূল্যায়ন জরুরি।
চিকিৎসা আসার অপেক্ষায় যেসব কাজ করবেন না
সাহায্য আসা পর্যন্ত ব্যক্তির পাশে থাকুন, শ্বাস-প্রশ্বাস পর্যবেক্ষণ করুন এবং জরুরি সেবাকর্মীর নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
এ সময় কয়েকটি কাজ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসক—
- অজ্ঞান ব্যক্তিকে চড় মারা বা ঝাঁকানো।
- মুখে পানি ছিটিয়ে জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করা।
- অজ্ঞান অবস্থায় খাবার, পানি বা ওষুধ খাওয়ানো।
কারও রক্তে শর্করার মাত্রা কমে গেছে বলে সন্দেহ হলে, বিশেষ করে তার ডায়াবেটিস থাকলে, তিনি সম্পূর্ণ সচেতন এবং নিরাপদে গিলতে সক্ষম হলেই মুখে চিনি দেওয়া যেতে পারে। অজ্ঞান ব্যক্তির মুখে কখনো খাবার, পানীয় বা চিনি দেবেন না। এতে শ্বাসনালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কেউ অজ্ঞান হলে মুখে পানি ছিটিয়ে সময় নষ্ট না করে তার সাড়া ও শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
এমএসএম
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
