কালবেলা · রাজনীতি
প্রবাসীদের আবেগকে পুঁজি করে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি
১৩/১০/২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল প্রাণশক্তি ও রেমিট্যান্সের প্রধান কারিগর আমাদের প্রবাসী ভাইবোনরা। রোদ-বৃষ্টি-ঝড় উপেক্ষা করে বিদেশের মাটিতে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে তারা যে কষ্টার্জিত অর্থ দেশে পাঠান, তা দিয়েই সচল থাকে আমাদের জাতীয় অর্থনীতির চাকা। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, ইদানীং এই প্রবাসী ভাইবোনদের আবেগ, অনুভূতি এবং কষ্টকে পুঁজি করে একদল সুযোগ সন্ধানী ও প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক শক্তি দেশে নোংরা ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু করেছে। বিশেষ করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে অপপ্রচারের ঝড় তোলা হয়েছে, তা স্পষ্টতই দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করা এবং সদ্য গঠিত গণতান্ত্রিক সরকারকে অস্থিতিশীল করার এক গভীর চক্রান্ত বলেই মনে হচ্ছে।
সম্প্রতি বিমানবন্দরে প্রবাসীদের লাগেজ যথাসময়ে পাওয়া বা না পাওয়াকে কেন্দ্র করে সাময়িক কিছু বিভ্রান্তি ও বিলম্ব ঘটেছিল। একটি বহুজাতিক বিমানবন্দর পরিচালনায় যান্ত্রিক বা প্রশাসনিক কারণে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব নতুন কিছু নয়। এটা বহুদিনের পুরোনো জঞ্জাল। কিন্তু বহুদিনের পুরোনো এই প্রশাসনিক ত্রুটি বা বিলম্বকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের রাজনৈতিক শরিক দল এনসিপি (ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি) যেভাবে ময়দানে নেমে পড়েছে এবং যে ভাষা ব্যবহার করছে, তা কোনোভাবেই একটি দায়িত্বশীল ও সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক রাজনীতির বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
তাদের মূল উদ্দেশ্য অত্যন্ত স্পষ্ট- প্রবাসীদের মন বিষিয়ে তোলা, তাদের উসকানি দেওয়া এবং যাতে প্রবাসীরা দেশে রেমিট্যান্স পাঠানো কমিয়ে দেন বা বন্ধ করে দেন, সেই ব্যবস্থা করা। একটি নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র সাত মাসের মাথায় দেশকে অর্থনৈতিক সংকটে ফেলে সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে ব্যাহত করাই এই চক্রের মূল লক্ষ্য। জনগণের বিপুল জনরায় নিয়ে নির্বাচিত হওয়া বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারকে চরম বিপদে ফেলা এবং দেশের অর্জনগুলোকে নস্যাৎ করতেই এই ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হচ্ছে। এতে আমার ন্যূনতম সন্দেহ নেই।
এই দেশবিরোধী চক্রান্তে যোগ দিয়েছে তাদের কিছু অনুসারী, সুবিধাভোগী গোষ্ঠী এবং পতিত ও পলাতক ফ্যাসিবাদের দোসর কিছু কথিত সাংবাদিক ও ইউটিউবার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে এরা জামায়াত-এনসিপির সুরে সুর মিলিয়ে একই গলায় বিষোদ্গার করে চলেছে। তারা প্রবাসীদের আবেগকে উসকে দিয়ে দেশের অর্থনীতিতে আঘাত হানার পাঁয়তারা করছে।
এমন প্রেক্ষাপটে সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সকল প্রবাসীর উচিত একটি প্রশ্ন তোলা যে- বিমানবন্দরের এই অচলাবস্থা বা অব্যবস্থাপনা কি বর্তমান সরকারের আমলে শুরু হয়েছে? তাহলে অতীতে এই রাজনৈতিক শক্তি কেন মুখে তালা মেরে বসেছিল?
বাস্তবতা হলো, এটি নতুন সৃষ্ট কোনো জটিলতা নয়। বিগত সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার দুর্নীতি, লুটপাট এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফলে গড়ে ওঠা ৫৬ বছরের এক পুরোনো জঞ্জাল। একদিনে বা সাত মাসে এই পাহাড়সম জঞ্জাল রাতারাতি দূর করা অসম্ভব। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই এই জঞ্জাল পরিষ্কার করে পুরো বিমানবন্দর তথা বেসামরিক বিমান পরিবহন খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে বর্তমান সরকার ইতিবাচক ও অভূতপূর্ব বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরকে আধুনিকায়ন করতে আমেরিকা থেকে দুই দফায় ওয়াইফাই সুবিধা সম্বলিত ২৫টি অত্যাধুনিক বোয়িং বিমান সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। পাশাপাশি ইউরোপ থেকেও আরও ১০টি সর্বাধুনিক এয়ারবাস কেনার ঐতিহাসিক চুক্তি করেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে আকাশপথকে এতটা নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যময় এবং আন্তর্জাতিক মানের সমপর্যায়ে উন্নীত করার জন্য এমন সুদূরপ্রসারী ও সাহসী উদ্যোগ ইতিপূর্বে আর কখনো নেওয়া হয়নি। বিমানবন্দরগুলোতে যাত্রীদের ট্রলি সংকট নিরসন, ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা দ্রুতকরণ এবং প্রবাসীদের সেবায় নিবেদিত হেল্পডেস্ক চালুর যে কাজ চলছে, তা বিগত সরকারের আমলের জঞ্জাল সাফ করারই সুস্পষ্ট প্রমাণ।
এমন এক গঠনমূলক ও সংস্কারমুখী প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে, মাত্র সাত মাসের একটি সরকারের বিরুদ্ধে জামায়াত ও এনসিপি যেভাবে রাজনীতির নামে হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে, তা কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, জামায়াত ও এনসিপির বর্তমান রাজনীতির চরিত্র বহুলাংশে মিলে যাচ্ছে পতিত ও পলাতক স্বৈরাচারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অতীতের ধ্বংসাত্মক রাজনীতির সঙ্গে।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি যখন প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতায় আসে, তখন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা প্রকাশ্য হুংকার দিয়ে বলেছিলেন- ‘বিএনপি সরকারকে একদিনের জন্যও শান্তিতে থাকতে দেব না।’
আজকের জামায়াত ও এনসিপির কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে, তারা যেন সেই পতিত, পলাতক ও গণধিকৃত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার দেখানো পথ ও পদাঙ্ক অনুসরণ করেই চলেছে। যদিও তারা মুখে শেখ হাসিনার মতো সরাসরি সেভাবে হুমকি দিচ্ছে না, কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে তারা যা করছে, তা শেখ হাসিনার সেই বিধ্বংসী ও অতিনিষেধমূলক রাজনীতিরই প্রতিচ্ছবি।
এখানে আমি অত্যন্ত দ্বিধাহীনচিত্তে বলতে পারি,যে ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি তারা শুরু করেছে, সেখান থেকে যদি তারা অবিলম্বে বেরিয়ে না আসে, তাদের যদি শুভবুদ্ধির উদয় না হয়, তবে এর পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। তাদের এই অশুভ চক্রান্তের ফলে দেশের রাজনীতিতে পতিত পলাতক স্বৈরাচারের পুনরুত্থান ঘটা ত্বরান্বিত হতে পারে। আর কোনো কারণে যদি সেই পতিত অপশক্তির রাজনৈতিক উত্থান ঘটে, তবে তার প্রথম শিকার হবে এই জামায়াত ও এনসিপি নিজেই; যা তাদের নিজস্ব রাজনীতির স্থায়ী কবর রচনা করবে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, ক্ষমতার মসনদ লাভের উদগ্র বাসনা ও অন্ধ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় তারা এতটাই হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছে যে, এই নির্মম বাস্তবতা উপলব্ধি করার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা তারা হারিয়ে ফেলেছে।
অথচ আজকের এই সংকটাপন্ন বাংলাদেশকে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও জঞ্জাল থেকে মুক্ত করে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও স্বাবলম্বী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিন-রাত পরিশ্রম করে চলেছেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি যে দূরদর্শিতা, আন্তরিকতা ও অক্লান্ত চেষ্টার পরিচয় দিচ্ছেন, তা সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খুব ভালো করেই উপলব্ধি করেন যে, প্রবাসীরা কেবল রেমিট্যান্স প্রেরক নন, তারা আমাদের ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ ও জাতীয় বীর। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি প্রবাসীদের কল্যাণে একাধিক অভূতপূর্ব ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন:
১. প্রবাসীরা যাতে বিমানবন্দরে নেমে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, সে জন্য বিশেষ প্রটোকল ও দ্রুত ইমিগ্রেশন সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে।
২. প্রবাসে যাওয়ার সময় বা দেশে ফিরে আত্মকর্মসংস্থানের জন্য জামানতবিহীন ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
৩. বিদেশের মাটিতে কোনো প্রবাসী আইনি জটিলতায় পড়লে কিংবা দেশে তাদের সম্পত্তি দখলের মতো ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে বিশেষ সেল ও ডিজিটাল পোর্টাল চালু করা হয়েছে।
৪. বিদেশে কোনো প্রবাসী ভাই বা বোন মারা গেলে সরকারি খরচে ও সম্মানের সঙ্গে তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং পরিবারকে তাৎক্ষণিক আর্থিক অনুদান দেওয়ার ব্যবস্থা সুসংহত করা হয়েছে।
৫. প্রবাসীরা যাতে জাতীয় রাজনীতি ও রাষ্ট্র গঠনে সরাসরি মতামত দিতে পারেন, সে জন্য তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) প্রদান ও ভোটাধিকার বাস্তবায়নে কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই দূরদর্শী পদক্ষেপগুলোই প্রমাণ করে যে, সরকার প্রবাসীদের প্রতিটি ফোঁটা ঘামের সঠিক মূল্যায়ন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ৫৬ বছরের পুরনো জঞ্জালকে এক লহমায় মুছে ফেলা সম্ভব নয়, তবে সরকারের সদিচ্ছা, কঠোর পরিশ্রম এবং সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশ দ্রুত এক নতুন ভোরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
সুতরাং আজকের প্রেক্ষাপটে দেশপ্রেমিক প্রবাসীদের প্রতি আমার আকুল আবেদন থাকবে- আপনারা কোনো স্বার্থান্বেষী মহল, ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী বা ছদ্মবেশী ফ্যাসিবাদের দোসরদের অপপ্রচারে কান দেবেন না। আপনাদের পাঠানো প্রতিটি টাকা আজ দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। প্রবাসীদের আবেগকে অস্ত্র বানিয়ে যারা দেশের উন্নয়ন স্তব্ধ করতে চায়, তাদের রাজনীতি কখনও জনগণের কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। আসুন, ষড়যন্ত্রের বিষবৃক্ষকে উপড়ে ফেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি নতুন, উন্নত, স্বাবলম্বী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে সবাই ঐক্যবদ্ধ হই। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সহিহ বুঝ নসিব করুন।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com
মূল প্রতিবেদনে যান ↗