রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। একদিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়ছে, অন্যদিকে ইউক্রেনের জ¦ালানি অবকাঠামোয় ধারাবাহিক হামলায় শীতের আগে বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে উত্তর মেরু অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব ঠেকাতে নতুন কৌশল নিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। রাশিয়ার সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করতে ১ লাখ নয়, বরং ১০ লাখ স্থলমাইন কেনার পরিকল্পনা করছে ফিনল্যান্ড।
পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা : ইউক্রেনের দখল করা চারটি অঞ্চলকে রাশিয়ার অংশ ঘোষণা করার পর যুদ্ধের ঝুঁকি আরও বেড়েছে। দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝিয়া ইউক্রেনের ভূখ-ের প্রায় ১৫ শতাংশ। এসব অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার ঘোষণা দিয়েছেন পুতিন। জাপোরিঝিয়ায় ইউরোপের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকায় অঞ্চলটির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও মস্কোকে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হয়নি। চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে রাশিয়ার যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনে পুতিনের সঙ্গে চীন ও ভারতের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক এবং ইরান ও তুরস্কের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কও মস্কোর কূটনৈতিক অবস্থান তুলে ধরেছে।
এদিকে, চেচনিয়ার নেতা রমজান কাদিরভ ইউক্রেনে সীমিত ক্ষমতার কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ অবশ্য তার বক্তব্যকে সমর্থন করেননি। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়া পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রস্তুতি নেওয়ার ইঙ্গিত দিলেও তা পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর চাপ তৈরির কৌশল হতে পারে।
জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ গবেষক পাভেল পোডভিগের মতে, রাশিয়ার কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র সংরক্ষিত বাংকার থেকে বের করে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে যুক্ত করতে হয়। ফলে এ ধরনের হামলার প্রস্তুতি সময়সাপেক্ষ। তবে অস্ত্র সরানো বা সামরিক মহড়ার মতো দৃশ্যমান পদক্ষেপও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আতঙ্ক বাড়াতে পারে।
রাশিয়ায় ইউক্রেনের ড্রোন হামলা : রাশিয়াজুড়ে এক রাতে হাজারের বেশি ড্রোন ছোড়ার খবর পাওয়া গেছে। সেন্ট পিটার্সবার্গে রাতভর হামলায় অন্তত একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছে। হামলার পর অন্তত দুটি তেল কারখানায় আগুন লাগার খবরও এসেছে। একই দিনে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী রাশিয়ার ছোড়া দেড় শতাধিক ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে।
অন্যদিকে, রুশ বাহিনী ইউক্রেনের পরিবহন অবকাঠামো, সামরিক সরঞ্জামের মজুত, অস্ত্রভান্ডার ও বিভিন্ন কারখানায় হামলা চালিয়েছে। যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় রাশিয়াকে যুক্ত রাখতে ইউক্রেনের জ¦ালানি অবকাঠামোয় পাল্টা হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ট্রাম্প আরও বলেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির পরিবর্তে অন্য কারও করা উচিত। তার এ বক্তব্যে দুই নেতার মতপার্থক্য আরও প্রকাশ্যে এসেছে। তবে ট্রাম্পের দাবি, ইউক্রেন এখনো যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য পাচ্ছে এবং যুদ্ধ চলাকালে দেশটির নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকার বিশেষ সুবিধাও বহাল থাকবে।
শীতের আগে ইউক্রেনের জ¦ালানি সংকট : রাশিয়ার ধারাবাহিক হামলায় ইউক্রেনের বিদ্যুৎ, তেল ও গ্যাস অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শীত ঘনিয়ে আসায় জ¦ালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে জরুরি ভিত্তিতে মেরামতকাজ চালাচ্ছে দেশটি। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির দাবি, তথাকথিত জ¦ালানি যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর এক সপ্তাহে রাশিয়া দেশটির জ¦ালানি স্থাপনায় ৭৬ বার হামলা চালিয়েছে। সাম্প্রতিক এক রাতের হামলায় ১০টির বেশি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার পরিবারের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
রাজধানী কিয়েভের বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে। শহরের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো জানিয়েছেন, গত শীতের পর মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শহরের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রের পাশাপাশি উচ্চ ভোল্টেজের সঞ্চালন লাইনেও হামলা চালানো হচ্ছে। এতে বিকল্প উৎস থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইউক্রেনের জ¦ালানি খাত পুনরুদ্ধারে বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দীর্ঘ মেয়াদে প্রায় ৯১ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। চলতি বছর জরুরি মেরামতের জন্যই দরকার প্রায় ৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। তবে হামলা অব্যাহত থাকলে ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে স্থানীয় পর্যায়ে ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্র, ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ এবং ক্ষুদ্র বিদ্যুৎ গ্রিড গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে ইউক্রেন। বর্তমানে সচল তিনটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশটির মোট বিদ্যুতের ৫৫ শতাংশের বেশি সরবরাহ করছে। তবে এসব বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সময় খুবই সীমিত।
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়ছে পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশনেও। কিয়েভের পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, বিদ্যুৎ না থাকলে পানি পাম্প করার সক্ষমতা কমে যাবে। এতে বহুতল আবাসিক ভবনে পানি সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা অচল হলে জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
উত্তর মেরুতে রাশিয়া-চীনকে ঠেকাতে ইউরোপের পরিকল্পনা : উত্তর মেরু অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব সীমিত করতে নতুন কৌশল গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। সংস্থাটির পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস জানিয়েছেন, এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ উত্তর সমুদ্রপথ যেন কোনো একটি দেশের একক নিয়ন্ত্রণে না থাকে, সে জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সঙ্গে কাজ করবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
১০ লাখ স্থলমাইন কিনতে চায় ফিনল্যান্ড : রাশিয়ার সঙ্গে প্রায় ১ হাজার ৩৪০ কিলোমিটার সীমান্ত থাকায় নিরাপত্তা জোরদারে নতুন পদক্ষেপ নিচ্ছে ফিনল্যান্ড।
ফিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এলিনা ভালতোনেন ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ চলাকালে রুশ নাগরিকদের পর্যটন ভিসা দেওয়া বন্ধ করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
আলোচনার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে : রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখন আর শুধু দুই দেশের ভূখ-গত সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাবে জ¦ালানি ও খাদ্য সরবরাহ, মূল্যস্ফীতি এবং ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি চাপে পড়েছে।
সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার না হলে সংঘাতের প্রভাব আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় রাশিয়া, ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় নেতাদের আলোচনায় বসানোর উদ্যোগ তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যুদ্ধের অবসান এবং বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ কমাতে কার্যকর সমঝোতাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
