‘আইয়েন ভাই, আইয়েন! চোরা বাজারে দেইখ্যা-শুইন্যা নিয়া যান! এই দেখেন, এক্কেবারে তাজা বরফ দেওয়া ইলিশ! দাম বেশি না ভাই, একদাম ১ হাজার টেহা কেজি! পদ্মা-মেঘনার তাজা রুপালি ইলিশ, কেউ জিগাইলে কইয়েন না যে আমার কাছ থেকে নিছেন! তাড়াতাড়ি কন, কয় কেজি মাপুম?’ প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এবং মা ইলিশ সংরক্ষণের সরকারি নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে ভোলার চরফ্যাশনের প্রধান মাছের বাজারে প্রকাশ্যে ইলিশ বিক্রি চলছে।
ককশিটের বাক্সে তাজা ও বরফজাত ইলিশ মজুত রেখে প্রকাশ্যেই ক্রেতাদের হাঁকডাক দিয়ে প্রতি কেজি ১ হাজার টাকা দরে বিক্রি করছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। প্রজনন মৌসুমে প্রশাসনের চোখের সামনে এ ধরনের খোলামেলা কেনাবেচা চলায় স্থানীয় সচেতন মহলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
গতকাল শনিবার উপজেলা শহরের মাছের বাজারে গেলে প্রকাশ্যে ইলিশ বিক্রির এমন চিত্র চোখে পড়ে। দেখা যায়, সাধারণ মাছের পাশাপাশি ককশিটের বাক্সে রেখে গোপন ও প্রকাশ্যে দুভাবেই বিক্রি করা হচ্ছে মা ইলিশ। অথচ ইলিশের বংশবৃদ্ধি ও নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে সরকার গত ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছে। আইন অনুযায়ী এই সময়ে সারা দেশে সব ধরনের ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ এবং বেচাকেনা নিষিদ্ধ ও দ-নীয় অপরাধ।
এদিকে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও উপজেলায় অসাধু ব্যবসায়ীদের এমন তৎপরতায় সরকারের সংরক্ষণ উদ্যোগের সফলতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তদারকির অভাবে বাজারে অনায়াসে ইলিশ বিক্রি হওয়ায় নদীতে মাছ ধরা বন্ধ রাখার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মেহেদী হাসান বলেন, ‘সরকার তো আইন করছে মা ইলিশ বাঁচানোর জন্য, যাতে দেশের নদীতে মাছের উৎপাদন বাড়ে। অথচ অসাধু ব্যবসায়ীরা দিব্যি বাক্সে ইলিশ লুকাইয়া বাজারে ওপেন বিক্রি করতেছে! প্রশাসন কি চোখে দেখে না? এভাবে যদি মা ইলিশ বিক্রি চলতে থাকে, তাহলে তো ইলিশের বংশই ধ্বংস হয়ে যাইব। পেটের দায়ে আইন ভাঙার অজুহাত দিলে তো দেশ চলব না। এদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের আরও কড়া নজরদারি দরকার, নাইলে তো নিষেধাজ্ঞা দিয়া কোনো লাভই হইব না!’
ফারুক হোসেন নামের আরেকজন বলেন, ‘একদিকে প্রশাসন মাইকিং করে বলে নদীতে নামা নিষেধ, বাজারে বিক্রি করা নিষেধ; অন্যদিকে বাজারের মাঝখানে দিব্যি ইলিশ বিক্রি চলতেছে! পুলিশ-মৎস্য অফিস কি এগুলো দেখে না? আইন কি শুধু গরিব মানুষের জন্য? এভাবে যদি প্রকাশ্যে আইন ভাঙা চলে, তাহলে তো এই নিষেধাজ্ঞা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাইক্যা যাইব।’
স্থানীয় সচেতন মহল ও ক্রেতাদের দাবি, প্রশাসন কেবল আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে চরফ্যাশন মাছ বাজারে দ্রুত আভিযানিক দল পাঠাক এবং নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ কেনাবেচার এই চক্রকে আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করুক।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘বাংলাদেশ ফ্রেশার জেনারেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা তৌকিদ সাব্বির বলেন, প্রজনন মৌসুমে কেবল নদীতে ট্রলার বা নৌকা পাহারা দিলেই মা ইলিশ রক্ষা পাবে না; নদীর পাশাপাশি খুচরা ও পাইকারি বাজারগুলোতে অবৈধভাবে ইলিশ মজুত এবং বেচাকেনা বন্ধে নিয়মিত প্রশাসনিক নজরদারি থাকা জরুরি।
এ বিষয়ে উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, ‘সরকার ঘোষিত ২২ দিনের মা ইলিশ সংরক্ষণ নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে আমরা কাজ করছি। এই সময়ে ইলিশ ধরা, কেনাবেচা বা মজুত রাখা আইনি অপরাধ। চরফ্যাশন মাছ বাজারে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ বিক্রির বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। অনতিবিলম্বে সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
ইউএনও রুমানা আফরোজ জানান, মা ইলিশ রক্ষায় সরকারি নির্দেশ বাস্তবায়নে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে জেল ও জরিমানার আইনি বিধান রয়েছে। জড়িত অসাধু ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে দ্রুত শাস্তির আওতায় আনতে সংশ্লিষ্টদের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
