জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি ও আবাসনসংকটের প্রতিবাদে ইউরোপের চার দেশ- ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে রাজপথে নেমেছেন লাখো মানুষ। শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে চাপের মুখে পড়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একাধিক দেশের সরকার। এর মধ্যে ফ্রান্সে বিক্ষোভ ঘিরে সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বিক্ষোভে অংশ নেন সাড়ে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর বিক্ষোভ আরও বিস্তৃত হয়। একপর্যায়ে সহিংস গোষ্ঠীগুলো সরকারি ভবন, অভিজাত বিপণিবিতান ও সুপারমার্কেটে হামলা চালায়। পুলিশি গাড়ি ও কর্মকর্তাদের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া গেছে।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু জানান, বিক্ষোভের ঘটনায় ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন ১৫০ পুলিশ সদস্য। প্যারিসের কেন্দ্রীয় এলাকায় দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি না হওয়াটা অলৌকিক ব্যাপার।’
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্যারিস, মার্সেই, নিস, নঁত, বোর্দো, লিমোজ, লিল, তুলুজ ও স্ত্রাসবুর্গসহ বিভিন্ন শহরে বহু দোকানে লুটপাট চালানো হয়েছে। প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোয়ার বলেন, রাজধানীর ‘পুরো পুরো সড়ক বিধ্বস্ত হয়ে গেছে’।
লিমোজ শহরে মুখোশ পরা বিক্ষোভকারীদের দেওয়া আগুনে ১৪০ বছরের বেশি পুরোনো সিটি হলের বেশির ভাগ অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। মার্সেই ও লিল শহরের সিটি হলে ঢুকে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। লিওঁ শহরে পর্যটন কার্যালয়েও আগুন দেওয়া হয়।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, এসব ঘটনার জন্য দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং শাস্তি দেওয়া হবে।
বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসেও বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করেছে পুলিশ। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিবন্ধন ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে শহরটিতে কয়েক সপ্তাহ ধরেই শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলছে।
পুলিশের অভিযোগ, বিক্ষোভকারীরা তাদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু ছুড়েছেন এবং আগুন দিয়েছেন। ব্রাসেলসের পূর্বে অবস্থিত শহর লিয়েজেও বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ব্যবহার করা হয়। তবে এসব বিক্ষোভে কতজন অংশ নিয়েছেন, তা জানায়নি পুলিশ।

পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি এবং বড় শহরগুলোতে আবাসনসংকটের প্রতিবাদে কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার মানুষ মিছিল করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দেশটিতে ২০১৭ সালের পর থেকে বাড়ির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। নতুন চুক্তিতে বাড়িভাড়াও প্রায় একই হারে বেড়েছে।
শুক্রবার পর্তুগালের সংসদবিষয়ক মন্ত্রী কার্লোস আব্রেউ আমোরিম বলেন, ‘রাজপথের স্লোগানের কাছে সরকার নতি স্বীকার করবে না।’ তবে বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, তাদের নেতারা সাধারণ মানুষের সমস্যাগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।
ইতালির মিলান ও বোলোনিয়া শহরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভে কিছু আন্দোলনকারী পুলিশের দিকে পাথর ছুড়েছেন এবং সংঘর্ষে জড়িয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ইতালির সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে কয়েকজন আহত ও গ্রেফতারের খবর প্রকাশ করা হয়েছে।
ফ্রান্সের তুলনায় অন্য দেশগুলোতে বিক্ষোভের মাত্রা কম হলেও ইউরোপজুড়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে করেন প্যারিসের এইচইসি বিজনেস স্কুলের ইউরোপীয় ইউনিয়ন আইন ও নীতিবিষয়ক অধ্যাপক আলবার্তো আলেমান্নো।
আলজাজিরাকে তিনি বলেন, ‘ফ্রান্স এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। তবে এখন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, আন্দোলনটি ফ্রান্সের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে।’
তার মতে, শনিবারের বিক্ষোভই শেষ নয়; বিভিন্ন দেশে আরও আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে। গ্রিস, জার্মানি ও অস্ট্রিয়াতেও এ ধরনের আন্দোলনের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আগামী সপ্তাহে এসব দেশে আন্দোলন আরও সংগঠিত হতে পারে।
আলেমান্নো বলেন, এগুলো একই সংগঠনের অধীনে পরিচালিত কোনো একক আন্দোলন নয়। বরং একই সময়ে বিভিন্ন দেশে চলা একাধিক বিক্ষোভ। তবে এসব আন্দোলনের পেছনে কিছু অভিন্ন কারণ রয়েছে- শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে পড়াশোনা শেষে কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা।
আলেমান্নোর মতে, ইউরোপের জন্য এই অস্থিরতা গুরুত্বপূর্ণ এক সময়ে দেখা দিয়েছে। আগামী ১২ মাসে স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি ও পোল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তাঁর ভাষায়, ইউরোপে নজিরবিহীনভাবে একের পর এক জাতীয় নির্বাচন সামনে আসছে। তিনি বলেন, ‘অনিবার্যভাবেই এসব বিক্ষোভ ও আন্দোলন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসবে।’
সূত্র: আলজাজিরা
