বাজারে ঢুকেই একের পর এক সবজির দাম জিজ্ঞেস করছেন ক্রেতা। দাম শুনে কেউ প্রয়োজনের তুলনায় কম কিনছেন, কেউ আবার তালিকা থেকে বাদ দিচ্ছেন একাধিক পণ্য। সবজি, মাছ, মুরগি, ডিম প্রায় সবকিছু কিনতেই খরচ করতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সীমিত আয়ের মানুষ।
ক্রেতারা বলছেন, আয় বাড়েনি, অথচ প্রতিদিনের বাজার খরচ বেড়েই চলেছে। এ অবস্থায় পরিবারের খাবারের তালিকায় কাটছাঁট করতে হচ্ছে। সিলেট নগরের বাজারগুলো ঘুরে সাধারণ মানুষের এমন ভোগান্তির চিত্র দেখা যাচ্ছে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর)) নগরীরর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, বেগুন ৮০ থেকে ১২০ টাকা, গাজর ১০০ থেকে ১২০ টাকা এবং টমেটো ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পটল, ঢ্যাঁড়শ ও চিচিঙ্গার দাম কেজিতে ৬০ থেকে ৮০ টাকা। বরবটি ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং কচুর লতি ৮০ টাকা কেজি। নতুন শিমের দাম ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। অন্যদিকে আলু ৩০ টাকা ও পেঁপে ১৫ থেকে ২০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছে। তবে বাজার ও মানভেদে দামে পার্থক্য রয়েছে।
শুধু সবজির বাজার নয়, মাছ-মাংস ও ডিম কিনতেও বাড়তি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৮০ টাকা, সোনালি মুরগি ২৯০ থেকে ৩২০ টাকা এবং লাল লেয়ার মুরগি ৩৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফার্মের লাল ডিমের ডজন ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা। গরুর মাংস কেজিতে ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ৩০০ টাকা।
মাছের বাজারেও দামের চাপ রয়েছে। আকারভেদে প্রতি কেজি রুই ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, কাতলা ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা এবং মৃগেল ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা। চাষের পাঙাশ ১৮০ থেকে ২২০ টাকা ও তেলাপিয়া ২২০ থেকে ২৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ফলে মাছের বাজার করতে গিয়েও হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
বন্দরবাজারে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী আলী রায়হান বলেন, ‘প্রতিদিন বাজারে এসে নতুন দামের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যে সবজি আগে এক কেজি কিনতাম, এখন দাম বেশি হওয়ায় আধা কেজি কিনতে হচ্ছে। চাল, মাছ, মুরগি সবকিছু মিলিয়ে সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। আয় তো আর বাজারদরের সঙ্গে বাড়ছে না।’
তিনি বলেন, ‘একটি পরিবারের প্রতিদিনই কিছু না কিছু কেনার প্রয়োজন হয়। সব পণ্যের দাম একসঙ্গে বেশি থাকলে খরচ কমানোর সুযোগও সীমিত হয়ে যায়। মাছ কিনলে সবজি কম কিনতে হয়, আবার অন্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে গেলে খাবারের খরচে টান দিতে হয়।’
আম্বরখানা বাজারে বাজার করতে আসা গৃহিণী নুরুন্নাহার আক্তার বলেন, ‘বাজারে এসে সবকিছুর দাম জিজ্ঞেস করতে হয়। যে সবজির দাম তুলনামূলক কম, সেটাই কিনতে হচ্ছে। মাছ কিনতে গেলে দাম বেশি, মাংস তো নিয়মিত কেনা সম্ভব হয় না। এভাবে চললে পরিবারের খাবারের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে যাবে।’
রিকাবিবাজার এলাকায় বাজার করতে আসা সরকারি চাকরিজীবী আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘আগে কিছু মাছ কিনে সঙ্গে সবজি নিলে সপ্তাহের বাজার মোটামুটি হয়ে যেত। এখন মাছের দাম বেশি হওয়ায় পরিমাণ কমাতে হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে বাজারের খরচ হিসাব মেলাতে হিমশিম হচ্ছে। দাম নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত তদারকি দরকার।’
সবজির বাজারে দাম নিয়ে ক্রেতাদের অসন্তোষ বেশি। বেগুন, গাজর, টমেটো, বরবটি, পটল, চিচিঙ্গা, শিমসহ বিভিন্ন সবজির দাম বাজার ও মানভেদে ওঠানামা করছে। কিছু সবজি তুলনামূলক কম দামে পাওয়া গেলেও অনেক পণ্যের দাম সাধারণ ক্রেতাদের কাছে বেশি মনে হচ্ছে। বিশেষ করে টমেটো ও নতুন শিমের মতো সবজি কিনতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
বন্দরবাজারের সবজি বিক্রেতা শাহজাহান আলী বলেন, ‘পাইকারি বাজার থেকে বেশি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে। পরিবহন খরচ ও কেনার দামের সঙ্গে দোকানের খরচও যোগ হয়। তাই কম দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে সব সবজির দাম এক রকম নয়। সরবরাহ ও মানের ওপর নির্ভর করে দাম কমবেশি হচ্ছে।’
বিক্রেতারা জানান, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে এবং পাইকারি বাজারে দাম কমলে খুচরা বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে। তবে শুধু খুচরা বিক্রেতাদের ওপর নজরদারি করে বাজারের পুরো পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব নয়। উৎপাদন এলাকা থেকে পণ্য সংগ্রহ, পরিবহন এবং পাইকারি বিক্রির বিভিন্ন পর্যায়ের দামও যাচাই করা প্রয়োজন।
সবজির পাশাপাশি মাছ ও মাংসের বাজারও ক্রেতাদের চাপে ফেলছে। রুই, কাতলা, পাঙাশ, তেলাপিয়া, মৃগেলসহ বিভিন্ন মাছের দাম প্রজাতি, আকার ও মানভেদে আলাদা। তুলনামূলক কম দামের মাছ কিনতেও আগের চেয়ে বেশি খরচ করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ ক্রেতাদের।
মাছের দাম বেশি থাকায় অনেক পরিবার প্রয়োজনের তুলনায় কম মাছ কিনছে। কেউ কেউ দাম কম এমন মাছ বেছে নিচ্ছেন। আবার যাদের প্রতিদিনের বাজারের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা বরাদ্দ থাকে, তাদের অন্য পণ্যের খরচ কমিয়ে মাছ কিনতে হচ্ছে।
আম্বরখানা এলাকার মাছ বিক্রেতা রুকন বলেন, ‘আড়ত থেকে মাছ কিনতে আগের চেয়ে বেশি টাকা লাগছে। মাছের ধরন, আকার ও সরবরাহের ওপর দাম নির্ভর করে। বেশি দামে কিনলে কম দামে বিক্রি করা কঠিন। আবার দাম বেশি হলে ক্রেতারাও আগের মতো মাছ কিনছেন না।’
মুরগি ও ডিমের বাজারেও একই ধরনের চাপ রয়েছে। ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির দামের পার্থক্য থাকলেও দুই ধরনের মুরগি কিনতেই ক্রেতাদের খরচ করতে হচ্ছে। ডিমের দাম বাড়লে স্বল্প আয়ের পরিবারের জন্য এটিও বাড়তি চাপ। কারণ, অনেক পরিবারে মাছ-মাংসের বিকল্প হিসেবে ডিম রাখা হয়।
আম্বরখানা বাজারের মুরগি বিক্রেতা শামছুল ইসলাম বলেন, ‘দাম বাড়লে ক্রেতারা পরিমাণ কমিয়ে দেন। আগে কেউ দুই কেজি মুরগি কিনলে এখন এক কেজি কিনছেন, কেউ আবার দাম শুনে না কিনেই চলে যাচ্ছেন। পাইকারি দামের ওঠানামার কারণে প্রতিদিন একই দামে বিক্রি করাও সম্ভব হয় না।’
গুগলে আমাদের খবর পেতে
