Published on
:
8 min read
সন্মাত্রানন্দ
মানুষ গাধাকে ‘গাধা’ই মনে করে। ‘গাধা’ মানে বোকা, বেকুব, নির্বোধ। গাধা জন্তুটিকে মানুষ এতটাই বুদ্ধিহীন ভাবে যে, তার নিজের জাতের কোনও সদস্যেরও বুদ্ধি যদি একটু মাঠো হয়, তা হলে সে ক্ষেত্রেও তাকে অমনি ‘বোকাগাধা’, ‘গাধা ছেলে’ বলতে দ্বিধা করে না। কিন্তু গাধাকে এতটা গাধা ভাবার কারণ কী?
কারণ যে কী, স্পষ্ট করে তা বোঝা যায় না। হয়তো গাধার কান দুটো লম্বা লম্বা বোকা বোকা, হয়তো ডাক দেওয়ার সময়ে চল্লিশটা দাঁত খুলে ‘ব্রেহেহেহে’ করে ডাক দেয়— দেখে মনে হয় গাধা বোকার মতো হাসছে, কিংবা হয়তো গাধা ধীরগতি জন্তু হওয়ায় মানুষের হুকুম তামিল করতে একটু বেশি সময় নেয়, অথবা হয়তো মানুষের বোঝা পিঠে নিয়ে গাধা মাইলের পর মাইল প্রতিবাদহীন ভাবে চলে যায়। এ রকম নানা এলোমেলো কারণে মানুষ গাধাকে বুদ্ধিহীন জানোয়ার বলে ভেবে আসছে।
শুধু গাধাই কেন, ভেড়া-ছাগল-কুকুর-গোরু সবার সম্পর্কেই মানুষের এমন অবজ্ঞাপূর্ণ মনোভাব। মানুষ প্রায়শই খুব অহঙ্কারী হয়। নিজেকে সে ‘সেরার সেরা’ ভাবতে ভালোবাসে। হাতের কাছে যাকেই পায়, তারই ঘাড়ে চড়ে ‘প্রভু’ বনার তার ভারী শখ চিরকাল। অন্যকে বিচার করার সময়ে মানুষ এ কথাটা বেমালুম ভুলেই যায় যে, সে সর্বক্ষণ তার নিজের চোখ দিয়ে, নিজের মন দিয়েই অন্যের বিচার করে চলেছে। গাধার নিজেকে কী মনে হয়, কিংবা মানুষকে দেখে গাধা ঠিক কী মনে করে, সে সব কথা মানুষ জানেও না আর ভাবেও না।
এই অহঙ্কৃত মনোভাবের কারণে মানুষ কোনও দিন জানতেও পারল না যে, গাধা এবং অন্য জানোয়ারের এমন কিছু ক্ষমতা আছে, মানুষের যা নেই। যেমন, ভূমিকম্প হওয়ার কিছুটা আগে থাকতেই গাধা টের পেয়ে যায়, ভূমিকম্প হতে চলেছে। বৃষ্টিবাদল আসার দিনকয়েক আগেই পিঁপড়েগুলো আশু বিপদ কী ভাবে যেন টের পেয়ে গিয়ে নিজেদের ডিম নাবাল জমি থেকে টেনে নিয়ে উঁচু জমিতে তুলে রাখে। শুধু এ সবই নয়, জন্তু-জানোয়ারের এমন একটা বিশেষ ক্ষমতা আছে, হুঁ হুঁ বাবা, মানুষ সে কথা স্বপ্নেও ভাবতে
পারে না!
সেই ক্ষমতটা খুবই অদ্ভুত। পশুপাখি কিংবা অন্য জন্তু-জানোয়ারের সমাজে কী হচ্ছে, মানুষ তা টেরই পায় না। মানুষ তার হাজারটা কল্পনা পশুপাখিদের ঘাড়ে চাপিয়েছে। অথচ পশুরা নিজেদের সমাজের খবর তো রাখেই, তারই সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সমাজে কোথায় কী হচ্ছে, কোন মানুষের সঙ্গে কোন মানুষের কেমন সম্পর্ক চলছে, প্রেম চলছে না বিচ্ছেদ চলছে না বিবাদ চলছে— সব জানতে পারে। একেবারে বাস্তব সত্যি টাটকা খবর সব। কল্পনা নয়, কবিতা নয়। মানুষের সমাজ, মানুষের ইতিহাস, মানুষের রাজনীতি— সমস্তই জানতে পারে গৃহপালিত জন্তুরা অল্পবিস্তর। এমনকী গাধাও। শুয়াও।
হ্যাঁ, শুয়া একটি গাধা। আজকের গাধা সে নয়। আজ থেকে দু’হাজার বছর আগেকার রাসভ-নন্দন এই শুয়া। তার মায়ের নাম আতোন। দিদিমার নাম মাবেল। গাধাদের সমাজে, অন্য অনেক পশুদের সমাজেও পিতৃপরিচয় থাকে না মোটেই। মায়ের পরিচয়েই পশুরা, বিশেষত গাধারা পরিচিতি লাভ করে। শুয়ার ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই হয়েছিল। জেরুসালেম নগরীর সমীপবর্তী অলিভ পাহাড়ের কোলঘেঁষা একটি গ্রাম বেথফেজ। সেই বেথফেজ গ্রামেরই দরিদ্র কৃষক দাভিয়েল। আর ওই দাভিয়েলের বাড়িতেই থাকত শুয়া আর তার মা আতোন। না, আজকের কথা নয় সে সব। আজ থেকে দু’হাজার বছর আগের কথা।
দাভিয়েলের বাড়িতে থাকত মানে এমনি এমনি দাভিয়েল তাদের মা-ব্যাটাকে থাকতে দিত, এমনটা নয়। এমনি এমনি কেউ কিছুই দেয় না। আর এমনি এমনি খেতে বা থাকতে দিলেও গাধারা অন্তত তা গ্রহণ করে না। গাধার মতো আত্মসম্মানযুক্ত প্রাণী দুনিয়ায় খুব কমই আছে। কোনও কাজ না করে এমনি এমনি তারা কারও খায়ও না আর কারও আশ্রয়ে থাকেও না। খাবারই হোক কিংবা আশ্রয়ই হোক, পরিশ্রমের বিনিময়েই তারা তা উপার্জন করে। শুয়া ও তার মা আতোনও এই নিয়মের ব্যতিক্রম ছিল না।
দাভিয়েলের বাড়িতেও তারা তাই খেটেই খেত। চাষের জমিতে হাল টানত। গম বা যব উঠলে শস্যকণা ঝাড়াই-পেষাই করার কাজ করত। জমিতে জল সেচের জন্যে ব্যবহৃত চাক্কিযন্তর ঘোরাত। দাভিয়েল ও অন্য চাষিরা যখন মাঠে কর্মব্যস্ত থাকত, তখন শুয়া আর আতোন কৃষকদের খাবার কিংবা পানীয় ঘর থেকে মাঠে নিয়ে যেত রোজ। উৎপাদিত শস্যের বস্তা পিঠে করে গ্রাম থেকে জেরুসালেমের বাজারে বয়ে নিয়ে যেত শস্যকালে। ভেড়া, ছাগল ইত্যাদি গৃহপালিত পশুদের চোরছ্যাঁচ্চড়ের হাত থেকে পাহারাও দিত ওরা। আতোনের দুধ খেয়ে দাভিয়েলের ছেলেপিলে সব বড় হয়েছে। বাড়ির মেয়েদের রূপচর্চায় আতোনের দুধ ছিল অব্যর্থ উপাচার। তা ছাড়া ওদের বিষ্ঠা থেকে ঘুঁটে হতো, অগ্নিকুণ্ডের ইন্ধন হতো। এত রকম ভাবে মালিকের সেবা করে তবে ওরা খেতে পেত, থাকতে পেত। আর সেটাই সম্মানজনক বলে মনে করত শুয়ারা। ঠিকই মনে করত।
শুধু শুয়া বা আতোনই নয়। তখন বেথফেজের মতো গ্রামগুলিতে ঘরে ঘরে গাধা থাকতই। সকলেই খুব কর্তব্যনিষ্ঠ, ধীরস্থির, আত্মসম্মানবোধযুক্ত আর পরিশ্রমী। তবে এমনটাও নয় যে, সারা দিনে সব সময়েই গাধারা খাটাখাটনি করত। তা নয়, তা নয়। দিনের কিছুটা সময়, অন্তত সূর্য অস্তে চলে যাওয়ার আগে যখন সিকামোর কিংবা পিস্তাশিয়ো গাছের ঝোপের মধ্য দিয়ে পড়ন্ত রোদ ঘাসের জমিতে নেমে এসে কেমন এক উদাস, অর্থহীন বিষাদ আর মায়া ছড়িয়ে দিত পৃথিবীতে, যখন অলিভ পাহাড়ের গাছগুলোর দীর্ঘ দীর্ঘ ছায়া মাটির উপর পড়ে দূর দিগন্তলীন সন্ধ্যার অন্ধকারে চিহ্নহীন ভাবে হারিয়ে যেতে চাইত, তখন গ্রামের সব গাধাদেরই খানিকটা অবসর মিলত। সবুজ ঘাসে মুখ ডুবিয়ে উদরপূর্তি করে নিত তারা। কত কত হাজার হাজার বছর ধরে এমনি ভাবে ওরা ঘাস খেয়ে চলেছে পৃথিবীর বুকে মুখ ডুবিয়ে, সে কথা ভাবতে ভাবতে ওদের দু’চোখ জড়িয়ে আসত প্রাগৈতিহাসিক ঘুমে।
গ্রামের বাইরের ওই ঘাসজমিতেই যে শুধু ওদের সকলের দেখা হতো, তা নয়। আর একটা গুরুত্বপূর্ণ অবসর মিলত উৎসবের সময়ে। সুখোৎ কিংবা পূরণ কিংবা পাসওভার পরবে জেরুসালেমের চারপাশের গাঁ-ঘর থেকে ঝেঁটিয়ে লোকজন সপরিবারে চলে যেত জিহোবার মন্দিরে। অতগুলো লোক, অত দিন বাইরে থাকবে, জিনিসপত্র বাক্সবাগিচা নিয়েই রওনা হতো সকলে জেরুসালেমের দিকে। অতএব মালপত্র বহনের জন্যে গাধারাও যেত মানুষের সঙ্গে। জেরুসালেমে বাক্সপুঁটলি পৌঁছে দেওয়ার পরে তো গাধাদের ছুটি। অতএব মন্দিরের মেষদ্বারের ও-দিকে যে প্রশস্ত সবুজ ঘাসের মাঠ আছে, সেই মাঠই ছিল উৎসবের ক’দিন ওদের অবাধ বিচরণক্ষেত্র। আর ওখানেই ঘুরতে ঘুরতে, ঘাস চিবোতে চিবোতে অর্ধেক দুনিয়ার যত গাধা— সকলেরই সঙ্গে দেখা হতো, কথাবার্তা, তক্কোতকরার, ভাব বিনিময়, সবই হতো।
এ রকমই কোনও এক পরবের দিনে শুয়া ও তার মা আতোন জেরুসালেমের মাঠে ঘাস খেতে খেতে চারিদিকের হালচাল দেখছিল, মুরুব্বি গাধাদের ভিতর কী সব ভারী ভারী কথাবার্তা চলছে, সে সবও শুনছিল কান খাড়া করে। সে দিনের সেই পশুচারণযোগ্য সবুজ ঘাসে ভরা মাঠ। এক দিকে ভেড়া আর ছাগল চরছে, আর এক দিকে কয়েকটা উট জমির উপর থেপসি গেড়ে বসে হলুদ ঘাসখড়, কাঁটাগাছ নির্বিবাদে চিবোচ্ছে তো চিবোচ্ছেই। পশ্চিম দিকে তৃণাচ্ছাদিত বিস্তৃত ভূখণ্ডে সাদাটে, কালচে, পাঁশুটে নানা রঙের গাধা চরে বেড়াচ্ছিল। উত্তর দিকের একটা উঁচু বেড়া দিয়ে ঘেরা জায়গায় কতকগুলো শক্তিশালী, ঝাঁ-চকচকে ঘোড়া ঘাস খাচ্ছিল আর মাঝে মাঝে গাধাদের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে নিজেদের মধ্যে কী সব বলতে বলতে উপহাসের অস্থিরতায় সামনের দুটো পা তুলে ‘চিঁহিহি’ করে ডেকে উঠছিল। কিন্তু সেই পরিহাসে পাত্তা না দিয়ে গাধারা নিজেদের মধ্যে গম্ভীর ভাবে কথাবার্তা বলে চলছিল।
সেখান থেকে জেরুসালেমের পবিত্র মন্দিরের গম্বুজ অস্পষ্ট ভাবে চোখে পড়ছিল। উৎসব উপলক্ষে মন্দিরে সমবেত জনতার সম্মিলিত কলরোলের দূরাগত অস্ফুট শব্দ কানে আসছিল। আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া খয়েরি মেঘখণ্ড যেন গণনাতীত ভেড়ার মতো উদাসীন ভাবে ভেসে যাচ্ছিল দিগন্তের দিকে। দূরের গ্রাম থেকে হঠাৎ কোনও একটা প্লুতস্বরিত ডাক কিংবা শস্য মাড়াইয়ের একটানা ক্লান্তিকর ধ্বনি বয়ে আনছিল মাঠের বাতাস। দূরের আকাশ বেয়ে কতকগুলো ঘুঘু পাখি অস্তায়মান সূর্যের অন্তিম আভা মেখে... অবসন্নপ্রায় মধ্যাহ্নের ক্লান্তি গলায় জড়িয়ে... বিষাদমধুর সুর তুলে দু’হাজার বছর আগেকার আকাশের শূন্যতাকে ভরে দিতে দিতে... সেই সব ভুলে যাওয়া গ্রাম, মাঠ, নদী, ঘাট থেকে আলোচিত আলোকিত নগরীর দিকে... মানুষের উপাসনায় আকীর্ণ জেরুসালেমের পবিত্র মন্দিরের নির্জন আলিশার দিকে... হলুদ পার্চমেন্টের উপর সঞ্চরমাণ খয়েরি কালির বিন্দুর মতো সময়ের প্রবাহ বেয়ে অবিরত উড়ে যাচ্ছিল...
। ২।
সময়ের প্রবাহ বেয়ে শুয়াও এর পর খানিকটা বড় হয়ে যাবে। যদিও দাভিয়েল তখন তখনই শুয়ার পিঠে উঠে বসবে না, কিংবা অন্য কোনও মানুষকে বহন করে নিয়ে যাওয়ার কাজে শুয়াকে নিযুক্ত করবে না। আরও কিছু দিন শুয়া ওই ভাবে ছোট ছোট কাজ সেরে আলো, হাওয়া, ঘাস ও আকাশের অমৃতত্বের ভিতর হৃষ্ট হয়ে থাকবে, তৃপ্ত হয়ে থাকবে।
তার পর একদিন একটা অদ্ভুত সকাল আসবে শুয়ার জীবনে। অথচ সেই সকালটিকে মহার্ঘ বলে চিনতে পারবে না শুয়া। মা আতোনের পাশে খড় চিবোতে চিবোতে সেই ঊষসীকুসুম সকালে শুয়া দেখবে, দুটো লোক, জামাকাপড় দেখে মনে হয় যথেষ্ট গরিব, দাভিয়েলদের উঠোনে ঢুকে পড়েছে। ওদের উদ্দেশ্য কী, বুঝতে পারবে না শুয়া। লম্বা গোছের লোকটা অপেক্ষাকৃত বেঁটে লোকটাকে বলবে, ‘ম্যাথিউ! এই গাধাটার কথাই কি বলেননি, র্যাবাই? দেখো, মনে হচ্ছে, এখনও কেউ চাপেনি এটার পিঠে!’
বেঁটে লোকটা জবাব দেবে, ‘নিশ্চয়ই, এটাই সেই বাচ্চা গাধা। থ্যাডিউস, দেখো, এই তো এর পাশেই তো এর মা...’।
কিছু বোঝার আগেই থ্যাডিউস নামের লম্বা লোকটা শুয়ার বাঁধন খুলতে আরম্ভ করবে। দড়ি খুলে শুয়াকে নিয়ে চলে যাচ্ছে ভেবে ডেকে উঠবে আতোন, ‘ব্রে-হে-হে!’
আতোনের ডাক শুনে ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবে দাভিয়েল। তার চোখে জিজ্ঞাসা। এই দু’জন কারা? সাতসকালে সুযোগ বুঝে তার গাধা চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে, না কি? কিন্তু আগন্তুকদ্বয়ের মুখে-চোখে তো কোনও চোর-চোর ভাবই নেই!
দাভিয়েল জিজ্ঞাসা করবে, ‘কে তোমরা, ভাই? গাধার বাঁধন খুলছ কেন?’
ম্যাথিউ নামের লোকটা বলবে, ‘র্যাবাই তাঁর কাজের জন্যে তোমার গাধাটা নিয়ে যেতে বলেছেন। কাজ শেষ হলেই ফেরত দিয়ে দেবেন।’
চোখ কপালে তুলে বলবে দাভিয়েল, ‘র্যাবাই? মানে, গ্যালিলির সেই র্যাবাই? যিনি অন্ধের চোখে দৃষ্টি ফিরিয়ে দেন, খোঁড়া লোককে হাঁটিয়ে দেন? মৃত ল্যাজারাসকে যিনি বাঁচিয়ে তুলেছেন কিছু দিন আগে? জোশুয়া ন্যাজারিন যাঁর নাম?’
‘হ্যাঁ, তিনিই।’ উত্তর দেবে থ্যাডিউস।
‘তোমরা তাঁরই টালমিদ?’
‘হ্যাঁ!’
‘আচ্ছা ভাই, র্যাবাই চেয়েছেন, দিচ্ছি। কিন্তু এই গাধা র্যাবাইয়ের কী কাজে লাগবে?’ জিজ্ঞেস করবে দাভিয়েল।
ম্যাথিউ বলবে, ‘ঠিক জানি না। তবে এরই পিঠে চেপে উনি জেরুসালেমে ঢুকবেন বলে মনে হয়।’
এ বার বিস্ময়ে আর আনন্দে ফেটে পড়বে যেন দাভিয়েল, ‘তা হলে কি আইজ়াইয়া, জ়্যাকারাইয়া— সব প্রফেটদের কথা সত্যি হতে চলেছে এবার? সেই মাহেন্দ্রক্ষণ সমাগত? মেসায়া অবতীর্ণ হতে যাচ্ছেন?’
বলতে বলতেই বিড়বিড়াবে দাভিয়েল, ‘জিয়নের মেয়ে জেরুসালেম! দেখো গৃহদ্বারে এসেছে তোমার রাজা!/ কেমন স্নিগ্ধ, বিনয়াবনত প্রভু!/ সামান্য এক গাধার পিঠেতে চড়ে/ এসেছেন আজ, উড়ুক আকাশে জয়ধ্বনিত ধ্বজা!’ ছড়াটা বলেই সহর্ষে চেঁচিয়ে উঠবে দাভিয়েল, ‘তবে কি আমার এই গাধা, আমারই এই শুয়া, এটাই সেই গাধা, যার পিঠে চেপে মেসায়া ঢুকবেন জেরুসালেমে, প্রফেট জ়্যাকারাইয়ার ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি করতে? ওহ্, কী সৌভাগ্য আমার, কী সৌভাগ্য!’
দাভিয়েল যত উচ্ছ্বসিত, শুয়া কিন্তু মোটেই ও-রকম উচ্ছ্বাস অনুভব করবে না। কথা নেই, বার্তা নেই, দড়ি খুলে তাকে এ রকম অপরিচিত লোক এসে নিয়ে যাবেই বা কেন? তার কি কোনও মর্যাদা নেই?
যা-ই হোক, ওই দুটো লোকের দ্বারা চালিত হয়ে অলিভ পাহাড়ের নীচে এসে পৌঁছবে শুয়া। অবাক চোখ তুলে দেখবে সে, ‘র্যাবাই’, ‘র্যাবাই’ বলে যাকে ওরা ডাকছে, সেই লোকটিকে বাইরে থেকে দেখলে তো মনে হয়, অতি সাধারণ এক ইহুদি যুবক। লম্বা, রোগা মানুষ। পরনে একটা হাঁটু-পেরোনো ধূসর রঙের জীর্ণ কেথোনেথ, পায়ে কাঠের জুতো, মাথার গাঢ় বাদামি চুলগুলোর উপর মাফোরেথটা আলগা ভাবে পড়ে আছে, দাড়ি-গোঁফ অনেক দিন কামানো হয়নি, দৃষ্টিতে একই সঙ্গে উদাসীনতা ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞার ভাব পরিস্ফুট। শুয়াকে দেখেই র্যাবাইয়ের দলবলের নারীপুরুষ সব হইহই করে উঠবে আনন্দে।
শুয়ার পিঠে কতকগুলো কাপড় চাপা দিয়ে ওর উপরে উঠে বসবে লোকটি। এর আগে শুয়া কখনও মানুষ বহন করেনি। ভেবেছিল, খুব ব্যথা লাগবে। কিন্তু কী আশ্চর্য! পিঠে যে বসে আছে, সে কি হুপো পাখির পালকের মতো হালকা? এতটুকু ভার অনুভব হবে না তো শুয়া-র!
জেরুসালেম নগরীর সোনালি দ্বারপথের দিকে লক্ষ করে ধুলোভরা পথ দিয়ে ধীরে ধীরে এগোবে শুয়া। শুয়ার পিঠে জোশুয়া। সঙ্গে সঙ্গে চলবে জোশুয়ার টালমিদ-টালমিদারা।
কিছু দূর এগোনোর পরে একটা অদ্ভুত ব্যাপার আরম্ভ হবে। নগরীর দ্বারপথের কাছাকাছি পাস-ওভার উৎসবে সমবেত তীর্থযাত্রীরা শুয়ার পিঠে জোশুয়াকে দেখতে পেয়ে দুইপাশে ভিড় জমাবে। ওদের গুঞ্জনের শব্দ কান খাড়া করে শুনতে চাইবে শুয়া। লোকগুলো গুঞ্জন করছে, ‘এই তো তিনি এসেছেন। মেসায়া। আমাদের রাজা। রোমানদের অপশাসন থেকে রক্ষা
করতে প্রভু আমাদের মধ্যে এসে গেছেন। হোসানা! হোসানা!’
কিছুক্ষণের মধ্যেই গুঞ্জন গর্জনে পরিবর্তিত হবে। পাম গাছের ডাল ভেঙে নিয়ে পথের দু’পাশে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠবে লোকজন, ‘হোসানা! হোসানা!’
ব্যাপারস্যাপার দেখে ঘাবড়ে যেতে থাকবে শুয়া। লোকগুলো এমন করছে কেন? শুয়া চমকে উঠছে দেখে কোমল করপল্লব বুলোবে পিঠের উপর বসে থাকা লোকটি। সকলের অভিবাদন কেমন হাসি-হাসি মুখে গ্রহণ করতে করতে এগিয়ে চলবে সে।
খানিক পরেই কালো আলখাল্লা পরা জনাকয়েক ফ্যারিসি গোলমালের শব্দ শুনে বেরিয়ে আসবে দ্বারপথের দিক থেকে উদ্ভ্রান্তের মতো। ওরা চেঁচিয়ে বলবে, ‘এ ভাবে গাধার পিঠে চেপে
আপনি জেরুসালেমে প্রবেশ করতে পারেন না, ইয়েশুয়া!’
শুয়ার পিঠের উপর বসে থাকা লোকটি নির্বিকার ভঙ্গিতে জিজ্ঞাসা করবে, ‘কেন বলুন তো?’
‘আপনি ফিরে যান, ইয়েশুয়া। এখনই দাঙ্গা-হাঙ্গামা বেধে যাবে। জ়্যাকারাইয়া, আইজ়াইয়ার বচন আছে। মেসায়া আসবেন গাধার পিঠে চড়ে অভিবাদন নিতে নিতে। আপনি ঠিক সেটাই করছেন। মানুষের আবেগ নিয়ে এই ভয়ঙ্কর খেলা খেলতে নামবেন না আপনি!’
কিন্তু চারিপাশের জনতা চেঁচিয়ে উঠবে, ‘আপনারা কে মশাই ওঁকে থামানোর?
উনি আমাদের মেসায়া। এই নগরী ওঁর নিজের নগরী। নিজের সাম্রাজ্য। আপনারা সরে যান!’
বলতে বলতেই শুয়া-সমেত জোশুয়াকে নিয়ে বন্যার জলের মতো বিপুল জনতা প্রবেশ করবে নগরীর পূর্বদ্বারপথ দিয়ে।
তার পর পিঠ থেকে নেমে শুয়াকে মুক্ত করে দেবে লোকটি। শুয়ার পিঠে হাত দিয়ে বলবে জোশুয়া, ‘তুমি আমার জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে সফল করে দিয়েছ, সোনা। ধন্যবাদ! এ বার তুমি ফিরে যাও তোমার মালিকের কাছে।’
কিন্তু শুয়া ফিরে গেল না দাভিয়েলের বাড়িতে আর। ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সে প্রবেশ করল খ্রিস্টজীবনীর ভিতর। প্রবেশ করল খ্রিস্টশিষ্যদের রচনার পৃষ্ঠায়। সেখান থেকে গসপেলের আলোকিত পৃষ্ঠায়। মার্ক, ম্যাথিউ, লুক, জন। পার্চমেন্ট স্ক্রোল থেকে একদিন মুদ্রিত কাগজে ছাপা বাইবেলে। সেখান থেকে মানুষের ইতিহাসে।
সেই সব মানুষ, যারা গাধাকে নিজেদের থেকে অবনত মনে করে। সেই সব মানুষ, যারা আপন স্বার্থে একজন সাহসী, সৎ, সমাজবিপ্লবীকে ‘প্রফেট’, ‘মেসায়া’ বা ‘অবতারপুরুষ’ বলে দেগে দেয়। এবং সেই সব মানুষ, সঙ্কীর্ণ স্বার্থে ঘা লাগলে যারা নিজেদের সেই বানানো ‘মেসায়া’কেই নির্লজ্জ নির্মম ভাবে হত্যা করে চিরকাল।
