জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে পশু জবাইয়ে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে উপাচার্য (ভিসি) ভবনের পাশেই গরু জবাই করেছেন শিক্ষার্থীরা। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সকাল ৮টার দিকে ভিসি ভবন ও গণিত বিভাগের মধ্যবর্তী সড়কে পূর্বঘোষিত ‘শুক্রবারের গরুভোজ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে গরুটি জবাই করা হয়। দুপুর ২টা থেকে শুরু হয় খাবার বিতরণ। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচির জন্য একটি গরু ও একটি ছাগল কেনা হয়। নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের মুঠোফোনে পাঠানো টোকেন নম্বরের ভিত্তিতে খাবার বিতরণ করা হয়। এ কর্মসূচিতে ১ হাজার ২০০ জনের বেশি শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছেন বলে জানা যায়।
এর আগে জবি প্রশাসনের প্রকাশিত বিতর্কিত নির্দেশনার বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন ও অসন্তোষ দেখা দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার শিক্ষার্থীদের গরুভোজ আয়োজনের উদ্দেশ্যে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা মূল্যে একটি গরু কেনা হয়।
গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) প্রক্টর দপ্তর থেকে পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যসুরক্ষা ও পরিবেশগত শৃঙ্খলা রক্ষার দোহাই দিয়ে ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে যেকোনো প্রকার পশু জবাইয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করে নোটিশ দেওয়া হয়। এমনকি নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়।
এই বিজ্ঞপ্তির পরপরই জকসুর সহকারী সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) মাসুদ রানা শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘গরু ভোজ’ আয়োজনের ঘোষণা দেন। প্রতিজনের জন্য ৭০ টাকা ফি নির্ধারণ করে বৃহস্পতিবার একটি গুগল ফর্মের মাধ্যমে নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়া হয়।
বিজ্ঞপ্তির প্রতিবাদে বুধবার রাত সাড়ে ৯টায় ভাস্কর্য চত্বরে জকসুর নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখান থেকে প্রক্টর দপ্তরের ওই নির্দেশনাসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহারসহ চার দফা দাবি তুলে ধরা হয়। শিক্ষার্থীদের অন্যান্য দাবির মধ্যে ছিল- বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহারের পাশাপাশি প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া, নৈশভোজের বিষয়টিতে সাম্প্রদায়িক রঙ চড়ানোর পেছনের কারণ তদন্ত, ক্যাম্পাসের ক্যাফেটেরিয়ার মেনুতে গরু ও খাসির মাংস যুক্ত করা এবং ক্যাম্পাসে সর্বজনীন ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখা।
তবে সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আজম খান জানিয়েছিলেন, সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ও প্রশাসনিক অনুমতি সাপেক্ষে সুশৃঙ্খলভাবে গরুভোজের আয়োজন করা হলে কর্তৃপক্ষের কোনো আপত্তি থাকবে না।
এর আগে, গত সোমবার (১২ অক্টোবর) রাত ৯টার দিকে স্নাতক (সম্মান) কোর্স সম্পন্ন হওয়া উদযাপন করতে ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চের সামনে গরুর মাংস দিয়ে খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের (১৭তম ব্যাচ) শিক্ষার্থীরা। এসময় তারা মন্দিরের ইট ব্যবহার করে রান্নার জন্য চুলা তৈরি করেন বলে অভিযোগ উঠে।
এসময় কয়েকজন হিন্দু শিক্ষার্থী এর প্রতিবাদ জানালে তারা সেখান থেকে সরে এসে অন্য জায়গায় রান্না সম্পন্ন করেন। রান্নার সময় হিন্দু শিক্ষার্থীরা মুক্তমঞ্চের পাশে মন্দিরের সামনে জড়ো হয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। এ ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিলে বিবৃতি জানিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন রান্নার আয়োজকরা।
বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, ইটগুলো যে মন্দিরের, তা তারা জানতেন না। প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ায় রান্নার পরিকল্পনা থাকলেও গ্যাসের চাপ কম থাকায় লাকড়ি দিয়ে রান্নার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রান্নার নির্ধারিত স্থানে এক শিক্ষার্থী আপত্তি জানালে তারা অন্য জায়গায় চলে যান। সেখানে আশপাশ পাওয়া ইট দিয়ে চুলা তৈরি করা হয়।
বিবৃতি আরও বলা হয়, ইটগুলো মন্দিরের জানতে পেরে তারা সেগুলো সরিয়ে নেন এবং ক্যাফেটেরিয়া থেকে আনা লোহার চুলায় রান্না শুরু করেন। এছাড়া ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের কাছে সরাসরি দুঃখপ্রকাশ করা হয়।
ঘটনাটি কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। একপর্যায়ে গরুর মাংস রান্না ও মন্দিরের পাশের ইট ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে।
