একই জমি, একই পরিচর্যা, অথচ আয়ের পথ তিনটি। বগুড়ার কামাল হোসেনের পেঁপের বাগানে ঢুকলে প্রথমে চোখে পড়ে সারি সারি গাছে ঝুলে থাকা সবুজ ফল। একটু নিচে তাকালেই দেখা যায় হলুদের গাছ, কোথাও মৌসুমি সবজি। আবার এই বাগানেরই একাংশে তৈরি হচ্ছে পেঁপের চারা, যা বিক্রি হচ্ছে অন্য কৃষকের কাছে। অর্থাৎ একটি ফসলের জন্য জমি প্রস্তুত করে থেমে থাকেননি তিনি। জমির ওপরের অংশ, গাছের ফাঁকা জায়গা এবং চাষের অভিজ্ঞতা—সবকিছুকেই আয়ের উৎসে পরিণত করেছেন।
বগুড়া সদর উপজেলার খামারকান্দি গ্রামের এই কৃষকের পাঁচ বিঘা জমির বাগান এখন বহুমুখী কৃষি উদ্যোগের উদাহরণ। চলতি মৌসুমে সাড়ে চার বিঘা জমির পাকা পেঁপে বিক্রি করে ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকা পাওয়ার আশা করছেন তিনি। একই জমিতে হলুদ ও মৌসুমি সবজি চাষের পাশাপাশি চারা উৎপাদন থেকেও আয় হচ্ছে তার। এতে একটি ফসলের বাজারদর কমে গেলে বিকল্প আয়ের সুযোগ থাকছে। কামাল জানান, চলতি বছর পেঁপে চাষে তার খরচ হয়েছে প্রায় চার লাখ টাকা। প্রত্যাশিত বিক্রি থেকে এই খরচ বাদ দিলে ১১ থেকে ১২ লাখ টাকা লাভ থাকবে।
বিজ্ঞাপন
এক জমিতেই বাড়তি আয়ের সুযোগ
একসময় এই জমিতে ফুলকপি, বেগুন, আলুসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ করতেন কামাল। পরে কৃষি বিভাগের পরামর্শে পেঁপে চাষ শুরু করেন। প্রথমে এক বিঘা জমিতে চাষ করে ফলন ও বাজারে সাড়া পাওয়ার পর ধীরে ধীরে জমির পরিমাণ বাড়ান। এখন তার বাগানে আছে শাহী জাতের পেঁপে। প্রায় আট বছর ধরে এই জাতের পেঁপে চাষ করছেন তিনি।
তবে চাষপদ্ধতির বিশেষত্ব শুধু পেঁপে উৎপাদনে নয়। সাধারণভাবে ফলের বাগানে গাছের সারির মাঝের জায়গা ফাঁকা পড়ে থাকে। কামাল সেই জায়গায় হলুদ ও মৌসুমি সবজি চাষ করছেন। এতে পেঁপের মূল ফসলের পাশাপাশি একই জমি থেকে বাড়তি উৎপাদন পাওয়া যাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
কৃষিতে একই জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদনের এই পদ্ধতি আন্তঃফসল বা সাথি ফসল চাষ হিসেবে পরিচিত। উপযুক্ত ফসল নির্বাচন, গাছের দূরত্ব, আলো-বাতাস চলাচল এবং সার-পানির ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখা গেলে জমির ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। তবে সব ফসলের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি সমান কার্যকর নয়। প্রধান ফসলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা তৈরি হলে ফলন কমতেও পারে। কামালের বাগানে এই পদ্ধতির সুবিধা হলো, পেঁপের গাছের মধ্যবর্তী জায়গা পুরোপুরি অব্যবহৃত থাকছে না। হলুদ ও মৌসুমি সবজি থেকে পাওয়া অর্থ পেঁপের আয়ের বাইরে অতিরিক্ত প্রাপ্তি হিসেবে যুক্ত হচ্ছে।
দীর্ঘসময় ফলন
পেঁপে চাষে কামালের আরেকটি সুবিধা হলো, তুলনামূলক অল্প সময়ের মধ্যে ফলন পাওয়া এবং একই গাছ থেকে একাধিক মৌসুমে আয় করার সুযোগ। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পেঁপে দ্রুতবর্ধনশীল ফলদ ফসল। সাধারণত রোপণের পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যে গাছে ফুল আসে এবং আট থেকে নয় মাসের মধ্যে পাকা ফল সংগ্রহ শুরু করা যায়। জাত, পরিচর্যা ও আবহাওয়াভেদে সময়ের তারতম্য হতে পারে।

কৃষক কামাল জানান, একটি গাছ থেকে প্রায় দুই বছর পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব। প্রথম বছর পাকা পেঁপে বিক্রি করি। পরের বছর পুরোনো গাছ থেকে কাঁচা পেঁপেও বিক্রি করি। আমার বাগানে কোনো কোনো পেঁপের ওজন ছয় থেকে সাত কেজি পর্যন্ত হয়। তবে সব ফলের ওজন সমান নয়। গড়ে দুই থেকে তিন কেজি ওজনের পেঁপে বেশি পাওয়া যায়। একটি গাছ থেকে একটি মৌসুমে দুই থেকে চার মণ পর্যন্ত পেঁপে পাওয়া সম্ভব। তবে ফলনের পরিমাণ নির্ভর করে গাছের বয়স, জাত, পরিচর্যা, রোগবালাই এবং ফল সংগ্রহের সময়ের ওপর।
বিজ্ঞাপন
পেঁপের বাজারেও আছে দুই ধরনের ক্রেতা। পাকা ফলের পাশাপাশি কাঁচা পেঁপের চাহিদা থাকায় বাজারদর ও ফলের অবস্থা বুঝে বিক্রির সুযোগ পান তিনি। তবে এই সুবিধা কাজে লাগাতে ফলের গুণগত মান বজায় রাখা এবং সময়মতো বাজারে পৌঁছানো জরুরি বলে মন্তব্য করেন কামাল।
চার লাখে বিক্রি ১৬ লাখ
চলতি মৌসুমে পাঁচ বিঘা জমিতে পেঁপে চাষে কামালের ব্যয় হয়েছে প্রায় চার লাখ টাকা। এর মধ্যে বাঁশ, সার ও জৈব সার বাবদ উল্লেখযোগ্য খরচ হয়েছে। সাড়ে চার বিঘা জমির পেঁপে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করছেন তিনি। বাজারদর অনুকূলে থাকলে বিক্রি থেকে ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকা পাওয়ার আশা করছেন।
বিজ্ঞাপন
তবে কামাল জানান, তার এই হিসাবের সঙ্গে বাজারের ঝুঁকিও জড়িত। পেঁপের দাম মৌসুম, সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় ও স্থানীয় চাহিদার ওপর নির্ভর করে ওঠানামা করে। উৎপাদন ভালো হলেও বাজারদর কমে গেলে প্রত্যাশিত আয় না-ও আসতে পারে। আবার ফল দ্রুত পচনশীল হওয়ায় সংগ্রহের পর পরিবহন ও বিক্রিতে দেরি হলে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।
কামালের বাগানের পাশ দিয়েই গেছে বগুড়া দ্বিতীয় বাইপাস সড়ক। ফলে বাগান থেকে দ্রুত বগুড়া শহরের চেলোপাড়া পাইকারি বাজারে পেঁপে নিয়ে যেতে পারেন তিনি। সহজ যোগাযোগব্যবস্থা তার জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করেছে। বিশেষ করে দ্রুত পচনশীল ফলের ক্ষেত্রে উৎপাদনস্থল থেকে বাজারে পৌঁছানোর সময় কম হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু বিক্রির সম্ভাব্য অঙ্ক দিয়ে চাষের সাফল্য বিচার করতে চান না তিনি। জমির মূল্য, পরিবারের সদস্যদের শ্রম, পরিবহন এবং অন্যান্য আনুষাঙ্গিক ব্যয় হিসাব করলে প্রকৃত মুনাফার চিত্র তার সামনে আসে। এ জন্য প্রতিটি ফসলের খরচ ও বিক্রির আলাদা হিসাব তিনি রাখেন।
চারা বিক্রিতেও বাড়তি আয়
কামালের উদ্যোগের তৃতীয় দিকটি হলো চারা উৎপাদন। নিজের বাগানের প্রয়োজন মেটাতে তিনি পেঁপের বীজ সংগ্রহ করে চারা তৈরি করেন। পরে উদ্বৃত্ত চারা বিক্রি করেন অন্য কৃষকের কাছে। এতে বাইরে থেকে চারা কেনার খরচ কমার পাশাপাশি আলাদা আয়ের পথ তৈরি হয়।
বিজ্ঞাপন
চলতি বছর তিনি প্রায় দুই হাজার শাহী জাতের পেঁপের চারা অন্য কৃষককে দিয়েছেন। এসব চারা বিক্রি করে বাড়তি আয় হয়েছে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। বাগানের ফলন ও গাছের আকার দেখে আশপাশের কৃষকেরাও পেঁপে চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।

স্থানীয় কৃষক লাবলু সরকার কামালের বাগান দেখে প্রায় ৫০ শতক জমিতে পেঁপে চাষ শুরু করেছেন। তার ফলন ভালো হলেও চলতি মৌসুমে বাজারদর কিছুটা কম থাকায় প্রত্যাশিত লাভ হচ্ছে না বলে জানান তিনি। তবু বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা করছেন না।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, ‘কামালের বাগানে বড় আকারের পেঁপে দেখতে আশপাশের মানুষ ও কৃষিপ্রেমীরা আসেন। এই বাগান দেখে অনেকেই চাষপদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চান।’
বিজ্ঞাপন
বগুড়ায় বাড়ছে পেঁপে চাষ
কামালের ব্যক্তিগত উদ্যোগের বাইরে বগুড়া জেলাজুড়েও পেঁপে চাষের বিস্তারের তথ্য মিলেছে। বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মাহফুজ আলম জানান, বর্তমানে জেলায় প্রায় ৬৫০ হেক্টর জমিতে পেঁপে চাষ হচ্ছে। পাশাপাশি ১০ হাজার ২০২ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন সবজি এবং ১ হাজার ২৩৭ হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজি চাষ করা হচ্ছে।
জেলার কৃষি বিভাগ বলছে, কৃষকদের নতুন ফসল চাষে আগ্রহী করা এবং উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ। পেঁপের সঙ্গে হলুদের মতো সাথি ফসল চাষ করলে জমির ব্যবহার বাড়তে পারে। তবে কোন জমিতে কোন ফসল উপযোগী, তা নির্ধারণে মাটি, পানি, আলো এবং ফসলের পারস্পরিক প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা কে এম মনসুর রহমান জানান, তিন বছর আগে কামাল হোসেনের সঙ্গে পরিচয়ের পর তাকে শাহী জাতের পেঁপে চাষে উৎসাহিত করা হয়। পেঁপের সঙ্গে হলুদের মতো সাথি ফসল চাষ করায় তার আয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। গত বছরও কামাল ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকার পেঁপে বিক্রি করেছিলেন বলে জানান তিনি। চলতি বছরও একই রকম বিক্রির প্রত্যাশা আছে।
তিনি বলেন, ‘প্রচলিত একফসলি চাষের বাইরে গিয়ে জমির বিভিন্ন অংশকে কাজে লাগানো কামালের উদ্যোগের প্রধান বৈশিষ্ট্য। পেঁপে থেকে মূল আয়, গাছের ফাঁকে সাথি ফসল এবং উদ্বৃত্ত চারা বিক্রি—এই তিনটি পথ তার কৃষিকাজকে বহুমুখী করেছে। একটি ফসলের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে আয়ের বিকল্প তৈরি করাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষক কামাল হোসেন বলেন, ‘পেঁপে চাষে নিয়মিত সার প্রয়োগ, গাছের মধ্যে সঠিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং পরিচর্যায় অবহেলা না করা জরুরি। প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি নতুন ফসল চাষের সুযোগ খুঁজলে কৃষকের আয়ের পথ বাড়তে পারে।’

তিনি নতুন কৃষকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘একটি জমি থেকে বেশি উৎপাদন মানেই সব সময় বেশি মুনাফা নয়। জমির অব্যবহৃত অংশকে কাজে লাগানো, ফলনের পাশাপাশি চারা উৎপাদন এবং বাজারের চাহিদা বুঝে বিক্রির পরিকল্পনা—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে কার্যকর হলে আয়ের সম্ভাবনা বাড়বে।’
এলবি/এসইউ
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
