সারের সংকট ও কৃষকের চাহিদাকে পুঁজি করে নীলফামারীর সৈয়দপুরে জৈব সারের নামে ভেজাল সার ও কীটনাশক উৎপাদন ও বাজারজাতের অভিযোগ উঠেছে। শহর ও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা কারখানা ও গোডাউনে নিম্নমানের উপকরণ ও রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে এসব সার তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে আকর্ষণীয় মোড়কে এসব পণ্য শহর ও উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারের শতাধিক দোকানে পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করা হচ্ছে।
সরেজমিনে সৈয়দপুর শহর ও উপজেলার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন নামে বাজারজাত করা সার ও কীটনাশকের প্যাকেটে অনেক ক্ষেত্রেই উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, ব্যাচ নম্বর ও নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ নেই। কোথাও নিবন্ধন নম্বরের ঘর ফাঁকা, আবার কোনো কোনো পণ্যের মোড়কে প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ ঠিকানাও নেই। ফলে এসব পণ্যের বৈধতা ও মান যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দস্তা, ম্যাগনেসিয়াম, বোরাক্স, বোরন, জিপসাম, সালফারসহ বিভিন্ন ধরনের সার এবং কার্বোফুরান, ডায়াজিননসহ দানাদার কীটনাশক নাম-বেনামে বাজারজাত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব পণ্যের মোড়কে আকর্ষণীয় নাম ও নকশা ব্যবহার করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সুনির্দিষ্ট পরিচয়, নিবন্ধন নম্বর, ব্যাচ নম্বর ও ঠিকানা উল্লেখ নেই।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, নামি-দামি বিভিন্ন কোম্পানির পণ্যের আদলে হুবহু মোড়ক তৈরি করে এসব পণ্য বাজারজাত করা হচ্ছে। চটকদার মোড়ক দেখে সাধারণ কৃষকের পক্ষে আসল ও নকল পণ্য শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতি ফসলের মৌসুমে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব পণ্যের সরবরাহও বেড়ে যায়।
সৈয়দপুরের কৃষিবিদ আখতার হোসেন বার্তা২৪.কমকে বলেন, প্রকৃত জৈব সার তৈরিতে গোবর, হাড়ের গুঁড়া, ছাই, ডিমের খোসা, চা-পাতা, কচুরিপানা ও মুরগির লিটারসহ বিভিন্ন জৈব উপাদান ব্যবহার করা হয়। এসব উপাদান নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় রেখে পচন ও প্রক্রিয়াজাত করার পর জৈব সার হিসেবে বাজারজাত করা যায়।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, সৈয়দপুরে কিছু উৎপাদক জৈব সারের নামে রং মেশানো বালু, লাল মাটি, সামান্য ছাই ও বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান মিশিয়ে সার তৈরি করছেন। পরে এসব পণ্য জৈব সার হিসেবে কৃষকদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে কৃষক প্রতারিত হওয়ার পাশাপাশি জমির উর্বরতা ও ফসল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সৈয়দপুর উপজেলার বোতলাগাড়ি ইউনিয়নের কৃষক রফিকুল ইসলাম বার্তা২৪.কমকে বলেন, আকর্ষণীয় মোড়ক দেখে অনেক কৃষক এসব সার ও কীটনাশক কিনে থাকেন। কিন্তু ব্যবহারের পর অনেক ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। কোনো কোনো কৃষকের জমিতে ফসলের ক্ষতিও হয়েছে।
তিনি বলেন, কৃষকদের স্বার্থে ভেজাল সার ও কীটনাশক উৎপাদনকারী এবং বাজারজাতকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজারে বিক্রি হওয়া এসব পণ্যের নমুনা পরীক্ষা করে প্রকৃত মান যাচাই করার দাবি জানান তিনি।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং শাখা থেকে নকল সার, কীটনাশক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সৈয়দপুরে সেই নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়মিত অভিযান ও তদারকি হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয় কৃষকদের।
তাদের অভিযোগ, বাজারে প্রকাশ্যে সন্দেহজনক সার ও কীটনাশক বিক্রি হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় অসাধু ব্যবসায়ীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। এতে একদিকে প্রতারিত হচ্ছেন কৃষক, অন্যদিকে কৃষি উৎপাদনও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
এ বিষয়ে সৈয়দপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীমান ভূষণ রায় বার্তা২৪.কমকে বলেন, কৃষকদের সর্বস্বান্ত করতে যারা ভেজাল সার উৎপাদন করছেন, তাদের বিরুদ্ধে অল্প দিনের মধ্যেই অভিযান পরিচালনা করা হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা ভূমি সহকারী কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে এ অভিযান চালানো হবে।
তিনি বলেন, অভিযানে ভেজাল সার বা কীটনাশক উৎপাদন ও বাজারজাতের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কৃষকদের দাবি, শুধু বাজারে অভিযান চালিয়ে ভেজাল পণ্য জব্দ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এসব পণ্যের উৎপাদনস্থল, মজুতকেন্দ্র ও সরবরাহকারী চক্র শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি কৃষকদের আসল ও অনুমোদিত সার-কীটনাশক চেনাতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রমও জোরদার করা প্রয়োজন।
