সন্ধিপুজোয় ১০৮ প্রদীপছবি: iStock
Published on
:
2 min read
আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে পালিত হয় দুর্গাপুজোর মহাষ্টমী। আজ ১৯ অক্টোবর ২০২৬ সোমবার পালিত হচ্ছে মহাষ্টমী। অষ্টমী ও নবমী তিথির বিশেষ সন্ধিক্ষণে দেবী দুর্গার সন্ধিপুজো হয়।
১০৮ লাল পদ্ম এই পুজোয় দেবীর পায়ে উত্সর্গ করার রীতি আছে। তার সঙ্গে জ্বালানো হয় ১০৮টি প্রদীপ। অষ্টমী আর নবমী তিথির শুভ সন্ধিক্ষণে করা হয় সন্ধিপুজো। সংস্কৃত মন্ত্রের উচ্চারণে মুখরিত হয়ে ওঠে আকাশ বাতাস। শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, ঢাকের বাদ্যি, ঘন্টা, পটকা, দামামা সব মিলিয়ে শব্দের স্রোত যেন ভাসিয়ে নিয়ে যায় চারপাশ। মন্ত্রোচ্চারণ আর ১০৮ প্রদীপের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে দেবী দুর্গার ঘামতেল মাখা মুখমন্ডল। অষ্টমীর বিদায় আর নবমীর আগমনে এই সন্ধিপুজো করা হয়।
কেন জ্বালানো হয় ১০৮ প্রদীপ?
দুর্গাপুজোর মহাষ্টমী ও মহানবমীর সন্ধিক্ষণে ৪৮ মিনিটের সন্ধিপুজোয় ১০৮টি প্রদীপ জ্বালানো হয় মূলত অশুভ শক্তি, অজ্ঞতা ও অন্ধকার দূর করে শুভ ও জ্ঞানের আলো প্রতিষ্ঠা করার প্রতীক হিসেবে। আগেকার দিনে বৈদ্যুতিন আলোর প্রচলনের আগে পুজো মণ্ডপে অতিরিক্ত আলোর ব্যবহার ছিল না। সেই সময় সন্ধিপুজোয় ১০৮ প্রদীপের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠত চারপাশ, যা মানুষের ভেতরের সমস্ত নেতিবাচকতা ও অজ্ঞানতার অন্ধকারকে দূর করার প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। হিন্দুধর্মে ও আধ্যাত্মিক সাধনায় ১০৮ সংখ্যাটিকে বিশেষ পবিত্র ও ঈশ্বরীয় চেতনার প্রতীক বলে মনে করা হয়। সেই কারণেই ১০৮টি প্রদীপ জ্বালানোর বিধি আছে।
১০৮ পদ্ম নিবেদনের কারণ
পুরাণ অনুসারে দেবী দুর্গা এই দুই তিথির মিলনক্ষণেই আবির্ভূতা হন দেবী চামুন্ডারূপে। পুরাণমতে চন্ড এবং মুন্ড নামক দুই ভয়ানক অসুরকে তিনি এই সন্ধিক্ষণেই বধ করেছিলেন। অন্যদিকে কৃত্তিবাসের রামায়ণে রামচন্দ্রের আশ্বিন মাসে অকালবোধনের যে উল্লেখ পাওয়া যায়, সেখানে দশানন রাবণকে বধ করার জন্য রাম দেবী দুর্গার আবাহন করেছিলেন। পুজোর সমাপন কালে দেবীর চরণে ১০৮ পদ্ম নিবেদন করার জন্য হনুমানকে দেবীদহ থেকে ১০৮টি পদ্মফুল তুলে আনতে বলেন। কিন্তু হনুমান সেখানে ১০৭টি পদ্ম পান। দেবীদহে আর পদ্ম ছিল না।
কেন একটি পদ্ম কম ছিল?
পুরাণে আছে, দীর্ঘদিন ধরে অসুর নিধন যজ্ঞে রত মা দুর্গার সারা শরীরে ১০৮টি ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল। দেবীর ক্ষতবিক্ষত দেহের অসহ্য জ্বালা দেখে মহাদেব কাতর হন। মহাদেব তাঁকে বলেন দেবীদহে স্নান করলে এই জ্বালা জুড়োবে। দেবীদহে মায়ের অবতরণের ফলে ১০৭টি ক্ষত থেকে সৃষ্টি হয় ১০৭টি পদ্ম ফুলের। দুর্গার এই জ্বালায় কাতর মহাদেবের চোখ থেকে এক ফোঁটা অশ্রু নিক্ষিপ্ত হয় মায়ের ১০৮তম ক্ষতের ওপর। দেবীদহে স্নানকালে সেই অশ্রুসিক্ত ক্ষতটি থেকে যে পদ্মের জন্ম হয়েছিল সেটি মা নিজে হরণ করেন। কারণ স্বামীর অশ্রুসিক্ত পদ্মফুলটি কেমন করে তিনি চরণে নেবেন।
পদ্মের বদলে রামচন্দ্রের চোখ
দেবীদহে আরও একটি পদ্ম না থাকায় হনুমান ১০৭টি পদ্মফুল পেয়েছিলেন। একটি পদ্ম কম থাকায় রাম নিজের নীল পদ্মের মতো চোখ উত্পাটন করে দেবীর পায়ে নিবেদন করতে উদ্যত হন। কৃত্তিবাসের রামায়নে পাওয়া যায়, রাবণ নিধন যজ্ঞের প্রাক্কালে রামচন্দ্র বলছেন ‘যুগল নয়ন মোর ফুল্ল নীলোৎপল সংকল্প করিব পূর্ণ বুঝিয়ে সকল। একচক্ষু দিব আমি দেবীর চরণে।’ রাম ধনুর্বাণ নিয়ে যখন নিজের নীল পদ্মের মতো একটি চোখ উপড়ে ফেলতে যান, তখন দেবী স্বয়ং আবির্ভূতা হয়ে তাঁকে নিবৃত্ত করে বলেন ‘অকালবোধনে পূজা কৈলে তুমি, দশভুজা বিধিমতে করিলা বিন্যাস। লোকে জানাবার জন্য আমারে করিতে ধন্য অবনীতে করিলে প্রকাশ ।। রাবণে ছাড়িনু আমি, বিনাশ করহ তুমি এত বলি হৈলা অন্তর্ধান।’
