চার সপ্তাহ আগে লন্ডনে রাজকীয় আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় ‘ডিগার’-এর ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার। প্রিন্স উইলিয়াম ও প্রিন্সেস ক্যাথরিন মঞ্চে আসার সময় আইরিশ গার্ডের ব্যান্ড বাজিয়ে তাদের স্বাগত জানায়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন হলিউডের অন্যতম বড় তারকা টম ক্রুজ, পরিচালক আলেহান্দ্রো গঞ্জালেস ইনারিতু এবং সহশিল্পী সান্দ্রা হুলার, রিজ আহমেদ, জন গুডম্যান, জেসি প্লেমন্স ও মাইকেল স্টালবার্গ। সামনের সারিতে ছিলেন সালমা হায়েক, হান্না ওয়াডিংহাম এবং বেকহাম পরিবারের তিন সদস্য—ডেভিড, ক্রুজ ও রোমিও।
ক্রুজের লালগালিচায় সেলফি তোলা ও অটোগ্রাফ দেয়ার অভ্যাসের কারণে সিনেমাটির প্রদর্শনী শুরু হতে দুই ঘণ্টা দেরি হয়। তবু দর্শকদের তেমন আপত্তি ছিল না। কারণ, করোনার পর ‘টপ গান: ম্যাভেরিক’ দিয়ে দর্শকদের আবার প্রেক্ষাগৃহে ফিরিয়ে এনে হলিউডকে বাঁচানোর কৃতিত্ব ক্রুজের। কিন্তু রাত ১১টায় প্রদর্শনী শেষে আলো জ্বলার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। হাততালি থাকলেও দর্শকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা যায়। অনেকেই দ্রুত বেরিয়ে যেতে শুরু করেন। যে সিনেমা ঘিরে এত প্রত্যাশা ছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের বিপর্যয়ে পরিণত হয়।
ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারই ছিল ‘ডিগার’-এর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির সবচেয়ে উজ্জ্বল মুহূর্ত। এক সপ্তাহ পর বিশ্বজুড়ে মুক্তির পর সমালোচকদের প্রায় সর্বসম্মত নেতিবাচক পর্যালোচনায় সিনেমাটি আরো চাপে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম সপ্তাহান্তে আয় হয় মাত্র ৮০ লাখ ডলার। দ্বিতীয় সপ্তাহান্তে আয় কমে যায় ৬০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বাজারে ৭৪টি দেশে মুক্তির পর আয় হয় ১ কোটি ২০ লাখ ডলার, অর্থাৎ দেশপ্রতি গড়ে মাত্র ১ লাখ ৬২ হাজার ডলার। এখন পর্যন্ত সিনেমাটির আয় ৩ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। ধারণা করা হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত আয় দাঁড়াতে পারে ৫ কোটি ডলারে।
সম্ভাব্য ২৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার লোকসান নিয়ে সর্বকালের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সিনেমা-বিপর্যয়গুলোর তালিকায় জায়গা করে নিতে যাচ্ছে ‘ডিগার’। ১৯৯৫ সালের ‘কাটথ্রোট আইল্যান্ড’-এর মূল্যস্ফীতি সমন্বিত লোকসান ছিল ২২ কোটি ২০ লাখ ডলার। ২০১৮ সালের ‘মর্টাল ইঞ্জিনস’-এর লোকসান ২২ কোটি ৪০ লাখ ডলার এবং ‘ক্যাপ্টেন আমেরিকা’ সিরিজের স্পিন-অফ ‘দ্য মার্ভেলস’-এর লোকসান আনুমানিক ২০ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২৫ কোটি ডলার। তবে এসব সিনেমার কোনোটির কাছ থেকেই খুব বেশি প্রত্যাশা ছিল না। তবু সেগুলোর প্রত্যাশিত আয় ‘ডিগার’-এর সম্ভাব্য আয়ের অন্তত দ্বিগুণ। ভুল সিদ্ধান্ত, খারাপ সময় ও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের এমন সমন্বয় হলিউডে বিরল।
‘ডিগার’-এর ধারণা পরিচালক ইনারিতুর মাথায় আসে ২০১৫ সালে। সিনেমাটির কেন্দ্রীয় চরিত্র এক উদ্ধত ধনকুবের জ্বালানি তেল ব্যবসায়ী, যার আর্কটিক অঞ্চলে খননকাজ পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনে। তখন ইনারিতু কাজ করছিলেন ‘দ্য রেভেন্যান্ট’ নিয়ে। ১৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারের ওই সিনেমায় লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর অভিনয় তাঁকে অস্কার এনে দেয়। একই অনুষ্ঠানে টানা দ্বিতীয়বার সেরা পরিচালকের পুরস্কার জেতেন ইনারিতু। এর আগে ২০১৪ সালে ‘বার্ডম্যান’ সিনেমার জন্যও পুরস্কারটি পেয়েছিলেন তিনি।
পরে নেটফ্লিক্সের সঙ্গে ডিক্যাপ্রিওকে নিয়ে ‘ডিগার’ তৈরির পরিকল্পনা করেন ইনারিতু। তখন এর নাম ছিল ‘ব্লা, ব্লা, ব্লা’। কিন্তু নেটফ্লিক্সের হাতে ডিক্যাপ্রিও অভিনীত আরেকটি পরিবেশবিষয়ক ব্যঙ্গাত্মক সিনেমা ‘ডোন্ট লুক আপ’ থাকায় প্রকল্পটি বাদ পড়ে। এরপর ইনারিতু নির্মাণ করেন প্রায় তিন ঘণ্টার সাদা-কালো সিনেমা ‘বার্দো’। এটি ছিল অনেকটা আত্মজীবনীমূলক, অস্তিত্ববাদী ভাবনার ওপর নির্মিত উচ্চাভিলাষী কাজ। সিনেমাটি খুব কম দর্শক দেখেছেন, আর দর্শকের অনেকেই পছন্দ করেননি।
এদিকে ‘টপ গান’ ও ‘মিশন: ইমপসিবল’-এর মতো অ্যাকশন ফ্র্যাঞ্চাইজির বাইরে কাজ করতে চাইছিলেন ক্রুজ। ‘ট্রপিক থান্ডার’ সিনেমায় কৃত্রিম চেহারায় এক বিরক্তিকর স্টুডিওপ্রধানের চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা পেয়েছিলেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই হয়তো ইনারিতুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ২০২২ সালে শুরু হয় তাদের কাজ। ২০২৪ সালের শেষ দিকে ৩৫ মিলিমিটার ফিল্মে ভিস্তা ভিশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে শুটিং শুরু হয়, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
গত বছর ক্রুজকে সম্মানসূচক অস্কার দেয়া হয়। পুরস্কার গ্রহণের সময় তিনি বলেন, ‘সিনেমা বানানো শুধু আমার কাজ নয়, এটাই আমার পরিচয়।’ আর তার হাতে পুরস্কারটি তুলে দেন ইনারিতু। ধারণা ছিল, এই পরিচালকের হাত ধরেই ক্রুজ প্রথম প্রতিযোগিতামূলক অস্কার জিততে পারেন। কিন্তু ‘ডিগার’-এর ব্যর্থতা সেই প্রত্যাশায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।
সিনেমাটির নির্মাণপর্বে কেউ কি বুঝতে পেরেছিলেন যে এটি ব্যর্থ হতে পারে? নাকি দুই তারকা নির্মাতার আত্মবিশ্বাসের সামনে কেউ আপত্তি তোলার সাহস পাননি? ‘ভ্যারাইটি’র সাবেক নির্বাহী সম্পাদক স্টিভেন গেডোসের মতে, গত এক দশকে হলিউডে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তার ভাষায়, ‘ডিগার’ হলো হলিউডের সর্বশেষ ব্যয়বহুল শিল্পধর্মী সিনেমা, যা ডুবে গেল।
গেডোসের মতে, করোনার আগে স্ট্রিমিং প্লাটফর্মগুলো এমন পরিচালকদের হাতে বিপুল অর্থ তুলে দিতে আগ্রহী ছিল, যারা তাদের মর্যাদা বাড়াতে পারবেন। নির্মাতারা স্বাধীনতা পেলেও যথাযথ তদারকির অভাবে অনেক সিনেমা দর্শকদের বদলে নির্মাতাদের নিজেদেরই বেশি সন্তুষ্ট করেছে।
কখনো অবশ্য এ কৌশলে কিছু সাফল্যও এসেছে। আলফোনসো কুয়ারনের ‘রোমা’, নোয়া বাউম্বাখের ‘ম্যারেজ স্টোরি’, জেন ক্যাম্পিয়নের ‘দ্য পাওয়ার অব দ্য ডগ’ এবং ডেভিড ফিঞ্চারের ‘ম্যানক’ নেটফ্লিক্সকে সেরা সিনেমার অস্কার এনে দিতে না পারলেও পুরস্কারটির কাছাকাছি পৌঁছেছিল। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই বিপুল বিনিয়োগের ফল হয়েছে হতাশাজনক। মার্টিন স্করসেসির ‘দ্য আইরিশম্যান’-এ নেটফ্লিক্স ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার এবং ‘কিলার্স অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন’-এ অ্যাপল ২০ কোটি ডলার ব্যয় করে। দুটি সিনেমাই অস্কারে একাধিক মনোনয়ন পেলেও কোনো পুরস্কার জিততে পারেনি।
প্রচলিত স্টুডিওগুলোও পরে একই পথে হাঁটে। ‘হুইপল্যাশ’ ও ‘লা লা ল্যান্ড’-এর সাফল্যের পর ড্যামিয়েন শ্যাজেলের ‘ব্যাবিলন’ প্যারামাউন্টের জন্য বড় ব্যর্থতা হয়ে আসে। গেডোসের হিসাবে, সিনেমাটির লোকসান ছিল ১৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার। ‘প্যারাসাইট’ দিয়ে অস্কার জয়ের পর বং জুন-হোর ‘মাইকি ১৭’ ওয়ার্নার ব্রাদার্সের জন্য প্রায় ২০ কোটি ডলারের আরেকটি ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্প হয়ে দাঁড়ায়।
তবে একই স্টুডিও পল থমাস অ্যান্ডারসনের ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ থেকে সেরা সিনেমাসহ একাধিক অস্কার জিতেছিল। ‘সিনার্স’, ‘দ্য মাইনক্রাফট মুভি’ ও ‘এফ১’-এর মতো ব্যবসাসফল সিনেমার আয় থাকায় তখন বড় লোকসান সামাল দেয়ার সুযোগও ছিল। কিন্তু ‘ডিগার’-এর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আলাদা। সিনেমাটি ওয়ার্নার ব্রাদার্সের প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্সের সঙ্গে একীভূত হওয়ার আগে মুক্তি পাওয়া শেষ ছবি। এর ব্যর্থতার পর নতুন মালিক ডেভিড এলিসনের প্রথম পদক্ষেপগুলোর একটি ছিল স্টুডিওপ্রধান মাইকেল ডি লুকা ও পাম অ্যাবডিকে সরিয়ে দেয়া। গেডোসের আশঙ্কা, এ ধরনের বিপর্যয় নতুন মালিকদের মৌলিক ও নতুন ধারণার সিনেমায় বিনিয়োগের আগ্রহ আরো কমিয়ে দিতে পারে।
এই বিপর্যয়ে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছেন ক্রুজ। ২০১৭ সালের ‘দ্য মমি’ সিনেমায় ৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার লোকসান হলেও সেটির আয় ছিল ৪০ কোটি ডলারের বেশি। কিন্তু ‘ডিগার’ দেখিয়েছে, দর্শকরা ক্রুজের কাছ থেকে মূলত একজন অ্যাকশন তারকাকেই দেখতে চান, অভিনয়শিল্পী হিসেবে তার ঝুঁকি নেওয়ার পরীক্ষা নয়। সিনেমাটিতে কৃত্রিম শরীর ও মুখাবয়বের আড়ালে ক্রুজকে প্রায় চেনাই যায় না। দর্শকরা তাকে সাধারণত ভালো মানুষের চরিত্রে দেখতে অভ্যস্ত। ‘টপ গান’ ও ‘মিশন: ইমপসিবল’-এ তিনি বিশ্বকে বাঁচান; ‘ডিগার’-এ তাঁর চরিত্র বরং বিশ্ব ধ্বংসের কারণ।
অথচ পরিবেশ বিপর্যয় ও মানুষের সম্মিলিত দায় নিয়ে নির্মিত উচ্চাভিলাষী রাজনৈতিক ব্যঙ্গ হিসেবে ‘ডিগার’ অন্য ধরনের দর্শকের আগ্রহও পেতে পারত। কিন্তু প্রচারণায় সিনেমার প্রকৃত বিষয়বস্তুর বদলে ক্রুজের চেহারার পরিবর্তন, বিশাল পেট ও তার উদ্ধত আচরণকে সামনে আনা হয়। নির্মাতারা ধরে নিয়েছিলেন, তারকার জনপ্রিয়তাই যথেষ্ট। ফলে সিনেমাটি কী নিয়ে, তা দর্শকদের কাছে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়নি।
নেতিবাচক পর্যালোচনা প্রকাশের পর প্রচারণায় আরো বিভ্রান্তি তৈরি হয়। প্রথমে সমালোচকদের ভালো-মন্দ মন্তব্য পাশাপাশি তুলে ধরে দর্শকদের নিজেদের বিচার করতে বলা হয়। পরে আবার বলা হয়, ফরাসি সমালোচকরা সিনেমাটি পছন্দ করেছেন। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া পরিমাপকারী সিনেমাস্কোরে ‘ডিগার’ পেয়েছে সি প্লাস। নতুন ‘পা প্যাট্রল’ সিনেমার এ গ্রেড এবং মার্ক জাকারবার্গকে নিয়ে নির্মিত ‘দ্য সোশ্যাল রিকনিং’-এর বি প্লাসের তুলনায় এটি অনেক কম। এতেই বোঝা যায়, বড়লোকদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড পর্দায় দেখলেই দর্শকেরা প্রেক্ষাগৃহে ছুটে যান না।
তবু ‘ডিগার’ একেবারে হারিয়ে যাবে, এমনটা মনে করছেন না অনেকে। ক্রুজের অস্কার মনোনয়নের সম্ভাবনা ক্ষীণ হলেও তার পক্ষ থেকে প্রচারণা চালানো হতে পারে। এ বছর অ্যান্ড্রু স্কটের ‘এলসিনোর’ ও জন মালকোভিচের ‘ওয়াইল্ড হর্স নাইন’-এর মতো অভিনয় আলোচনায় থাকায় পুরস্কার জেতা কঠিন। তবে সহকর্মীদের কাছ থেকে স্বীকৃতি পেলে তা এই ব্যর্থতার ধাক্কা কিছুটা কমাতে পারে।
এদিকে সিনেমাটিকে ঘিরে কাল্ট ক্লাসিক হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে। অ্যান হ্যাথাওয়ে সিনেমাটিকে লেটারবক্সডে ১০-এর মধ্যে ১০ দিয়েছেন। গ্লেন পাওয়েল একে বলেছেন ‘বিশুদ্ধ সিনেমা দেখার আনন্দ’। ক্রুজের অভিনয়কে জেন ফন্ডা ‘খুব ভালো ও সাহসী’ বলে প্রশংসা করেছেন। গিয়ের্মো দেল তোরো সিনেমাটিকে বলেছেন ‘দুঃসাহসী, সাহসী ও সিনেমার ভাষায় জটিল’। নিল ইয়ংয়ের ভাষায়, এটি তাঁর দেখা ‘সেরা সিনেমা’।
বিশ্ব প্রিমিয়ারের স্মারক অনুষ্ঠানপুস্তিকাও এরই মধ্যে ইবেতে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। যে সিনেমাকে একসময় বড় ব্যর্থতা বলে মনে হচ্ছিল, সেটিই হয়তো ভবিষ্যতে কাল্ট ক্লাসিক হয়ে উঠবে। ‘ডিগার’ আপাতত বক্স অফিসে ডুবেছে, কিন্তু সিনেমাটির গল্প এখানেই শেষ হয়ে যাচ্ছে না।
দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত ক্যাথরিন শোর্ডের লেখা, কিছুটা সংক্ষেপিত
