আসন্ন ২৭শে অক্টোবর ইসরাইলে নির্বাচন। এই নির্বাচনে রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে আরব নেতৃত্বাধীন এবং কট্টরপন্থি (আল্ট্রা-অর্থোডক্স) দলগুলো। বিভিন্ন মহলের ক্রমাগত আক্রমণের শিকার হলেও নির্বাচনের পর ক্ষমতার ভারসাম্য তাদের হাতেই থাকতে পারে। এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টি কিংবা বিরোধীদের জোট কোন দলেরই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। এতে সরকার গঠনে কিংমেকারের ভূমিকা পালন করবে ছোট ছোট দলগুলোই। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।
ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিক। তাদের প্রতিনিধিত্বকারী দুটি দল ‘রাআম’ এবং ‘জয়েন্ট লিস্ট’ আসন্ন নির্বাচনে ১৩টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারণায় বিরোধীদের আক্রমণের অন্যতম লক্ষ্যবস্তু ছিল এই দল দুটি। তবে শেষ পর্যন্ত যেকোনো রাজনৈতিক দলের জোট সরকার গঠনে এই আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সমর্থন নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে।
এর আগে ২০২১ সালে প্রথমবারের মতো কোনো আরব দল হিসেবে ইসরাইল সরকারে যোগ দিয়ে ইতিহাস গড়েছিল রাআম। সেবার মনসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন দলটি নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের জোটে যোগ দিয়ে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। এবার নেতানিয়াহু শিবির এবং স্বঘোষিত জায়নবাদী বিরোধীদলীয় জোট—উভয় পক্ষই আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও নেতানিয়াহু তার বিরোধীদের আরব দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, কট্টরপন্থি দলগুলোর ওপর নির্ভরশীলতার কারণে নেতানিয়াহুকে আক্রমণ করছে বিরোধীরা।
জনমত জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এবং তার নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থি জোটের সঙ্গে জায়নবাদী বিরোধী জোটের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে। ১২০ আসনের নেসেটে (পার্লামেন্ট) কোনো পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না বলে আভাস পাওয়া গেছে। চাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক ইয়োসি মেকেলবার্গ বলেন, ক্ষমতায় থাকার জন্য প্রয়োজন হলে নেতানিয়াহু বিনা দ্বিধায় রাআম-এর সঙ্গে কাজ করবেন। বিরোধী জোটও ভবিষ্যতে সরকার গঠনে যাদের সমর্থন নেয়া প্রয়োজন হতে পারে, তাদেরই কোণঠাসা করে নিজেদের ক্ষতি ডেকে আনছে বলে তিনি মনে করেন।
জয়েন্ট লিস্ট জোটে হাদাশ, বালাদ এবং তাআল—এই তিনটি দল রয়েছে। তারা জানায়, সরকারে যোগ না দিলেও ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের পথ তৈরি এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনের মতো শর্তে তারা নেতানিয়াহু-বিরোধী জোটকে বাইরে থেকে সমর্থন দিতে পারে। অন্যদিকে, রাআম তাদের প্রচারণায় ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ে সহিংস অপরাধ দমন এবং বৈষম্যমূলক আবাসন নীতি সংশোধনের ওপর জোর দিয়েছে। দলটি প্রথমবারের মতো স্বাধীনভাবে তাদের প্রার্থী তালিকা তৈরি করেছে এবং সেখানে ইহুদি জায়নবাদী ইয়োভ সেগালোভিটজকে দ্বিতীয় স্থানে রেখেছে। ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবরের পর এটি ইসরাইলের প্রথম নির্বাচন। গাজা যুদ্ধের প্রভাবে ইসরাইলের রাজনীতি আরও ডানদিকে ঝুঁকে পড়েছে এবং আরব দলগুলোকে ওই হামলার সহযোগী হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা চলছে। গত সেপ্টেম্বরে নেতানিয়াহুর লিকুদ এবং ইতামার বেন-গভিরের দল রাআম ও জয়েন্ট লিস্টকে নির্বাচনে নিষিদ্ধ করার আবেদন জানায়। নির্বাচন কমিশন তাদের নিষিদ্ধ করলেও, ২রা অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেয়। হাদাশ দলের ইহুদি রাজনীতিক ওফার কাসিফ একে আইনি প্রক্রিয়ার বদলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অন্যদিকে বালাদ প্রার্থী অরলি নয় বলেছেন, তারা সরকারে না থাকলেও সমর্থনের বিনিময়ে যেকোনো জোটের কাছ থেকে নিজেদের দাবি আদায় করে নিতে পারবেন।
৭ই অক্টোবরের প্রভাব কেবল আরব দল নয়, কট্টরপন্থি ইহুদি দলগুলোর ওপরও পড়েছে। শাস এবং ইউনাইটেড তোরাহ জুদাইজম (ইউটিজে)—এই দুটি দল কট্টরপন্থিদের প্রতিনিধিত্ব করে এবং তারা প্রত্যেকে ৭-৮টি আসন পেতে পারে। সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ এড়ানো, অনুদান রক্ষা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সরকারি অর্থায়ন নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার আইন নিয়ে ব্যর্থতার কারণে গত বছর লিকুদ পার্টির সঙ্গে তাদের সম্পর্কে ফাটল ধরে। বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ অভিযোগ করেছেন, সরকার সামরিক সেবা ফাঁকি দেয়া দুর্নীতিগ্রস্তদের পেছনে কোটি কোটি টাকা ঢালছে। অন্যদিকে ডানপন্থি নেতা আভিগডোর লিবারম্যান নারী প্রতিনিধিত্ব না থাকায় শাস এবং ইউটিজে-কে তালেবানের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
