ডাকসাইটে রাজনীতিবিদ মশিউর রহমান কঠিন রোগে ভুগছেন। চিকিৎসক জবাব দিয়ে দিয়েছেন, আর বড়জোর ছয় মাস। আগামী নির্বাচনে তাঁর দলের জয়লাভের সমূহ সম্ভাবনা এবং দল নির্বাচিত হলে তিনিই হবেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু এখন ভবিষ্যৎটা আঁধার দেখছেন ভদ্রলোক। মনে মনে মেনে নিয়েছেন, তাঁর আর এ জন্মে স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে না।
ঢাকা থেকে গাড়ি নিয়ে বেড়াতে যাচ্ছেন নেতা। ঘুরে আসবেন মাওয়া থেকে। নিত্যকার ঝুটঝামেলা থেকে আজকাল দূরে থাকতে চান তিনি। মৃত্যুচিন্তা করবেন না বলে ঠিক করলেন। তবু ঠিকই ঘাই মারল চিন্তাটা। আচ্ছা, তাঁর জন্য কি কেউ দুঃখ করবে? রাজনীতি করেন, শত্রু তো কম নেই। তারা বরং খুশিই হবে। কিন্তু তাঁর পরিবার? কত দিন নাতি-নাতনিদের দেখেন না। মুঠোফোনটা তুলে নিলেন। ফোন করলেন মেয়ে ফারজানাকে। বাবার ফোন পেয়ে কিছুটা চমকে গেছে সে। ‘কাল তোর বাচ্চাদের দিস,’ বললেন নেতা। ‘জাদুঘরে নিয়ে যাব।’
আরও বিস্মিত হলো ফারজানা, তবে খুশিও হলো। পরদিন নাতি-নাতনি মুক্তি ও নিপ্পনকে নিয়ে জাদুঘরে গেলেন মশিউর রহমান।
বাচ্চারা মহা উত্তেজিত। হাজারো প্রশ্ন তাদের। অল্প কিছুরই জবাব জানা আছে নানার। যেগুলোর নেই, সেগুলো বানিয়ে বলে দেন। ডাইনোসরের বিশাল কঙ্কালটার সামনে এ মুহূর্তে নাতি-নাতনিসহ দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। লাখ লাখ বছর আগে অতিকায় এই প্রাণী দাপিয়ে বেড়াত পৃথিবীর বুকে। দর্শকদের কারও মুখে কথা নেই। হঠাৎই নিজেকে অতি তুচ্ছ ও গুরুত্বহীন মনে হলো নেতার।
পরদিন মশিউর রহমান তাঁর অফিসে গেলেন। প্রচুর কাজ জমে আছে। বিরোধীদলীয় ঝানু নেতা তিনি, সংসদীয় কমিটিতে রয়েছেন। কাজে ডুবে গেলেন ভদ্রলোক।
মুঠোফোনটা তুলে নিলেন। ফোন করলেন মেয়ে ফারজানাকে। বাবার ফোন পেয়ে কিছুটা চমকে গেছে সে। ‘কাল তোর বাচ্চাদের দিস,’ বললেন নেতা। ‘জাদুঘরে নিয়ে যাব।’
কোনো ব্যথাবেদনা অনুভব করেন না নেতা। তবে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন চিকিৎসকের কথা। হার্টের অসুখ তাঁর, বাঁচার আশা নেই। প্রায় রোজই মেয়ে-জামাই আসে নাতি-নাতনিদের নিয়ে। সবাই মিলে কোথাও বেড়াতে যাবেন—এমন পরিকল্পনা করছেন মশিউর রহমান। কিন্তু হাতে যে পরিমাণ কাজ, পারবেন কি না সন্দেহ। অফিসে দর্শনার্থীর তো অভাব নেই। তদবিরকারীদের উৎপাতে পাগল হওয়ার জোগাড়। সবাই জেনে গেছে, আর বেশি দিন নেই তিনি। এ–ই তো সুযোগ। নেতার মনটা নরম থাকবে, যতটা পারো বের করে নাও।
একদিন বিশিষ্ট এক দর্শনার্থী এলেন। ড. রায়হান মারুফ। লম্বা-পাতলা ভদ্রলোক। তাঁকে অফিসে স্বাগত জানালেন নেতা। ‘কেমন আছেন, মারুফ সাহেব,’ বললেন তিনি। ‘হঠাৎ আপনি?’
ডক্টরকে ভালোমতোই মনে আছে নেতার। বেশ অনেক বছর আগে মশিউর রহমান যখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, তাঁর কাছে এসেছিলেন রায়হান মারুফ। বিশেষ ধরনের বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য অনুদান প্রার্থনা করেছিলেন। স্পেস মেডিসিনের ওপর রিসার্চ করতে চাইছিলেন ভদ্রলোক। সেদিনের কথা আজও স্পষ্ট মনে আছে মশিউর রহমানের। ডক্টরকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তিনি।
রায়হান মারুফের দিকে তাকিয়ে আছেন নেতা। এত বছর বাদে ভদ্রলোকের আগমনের হেতু কী? একটি বিজ্ঞান পত্রিকার আর্টিকেল দেখালেন তাঁকে রায়হান মারুফ। স্পেস মেডিসিনের ওপর একটি হিন্দি জার্নাল। ‘আমি তো হিন্দি পড়তে পারি না,’ বললেন মশিউর রহমান। ‘কী লিখেছে এতে?’
ডক্টরকে ভালোমতোই মনে আছে নেতার। বেশ অনেক বছর আগে মশিউর রহমান যখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, তাঁর কাছে এসেছিলেন রায়হান মারুফ।
‘ভারতীয় স্যাটেলাইট হাসপাতালের ওপর একটি লেখা,’ ব্যাখ্যা করলেন ড. রায়হান মারুফ। ‘ভারতীয় চিকিৎসকদের ধারণা, হার্টের কঠিন কঠিন চিকিৎসা তাঁরা করতে পারবেন। মহাশূন্যে কোনো কিছুরই কোনো ওজন নেই। সেখানে শরীরের মাংসপেশির কাজ খুবই সামান্য। হার্টও একটি মাসল বা পেশি। কাজেই কেউ যখনই মহাশূন্যে যাচ্ছে, তার হার্টের কাজও কমে যাচ্ছে। তাই মহাশূন্যে হার্টের চিকিৎসা সফলভাবে করা সম্ভব। সেখানে হার্টের রোগীরা অনেক বেশি দিন বাঁচবে।’
রায়হান মারুফের সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎটির কথা স্মরণ করলেন মশিউর রহমান। বিন্দুমাত্র সহযোগিতা করেননি তিনি সেদিন। দৃশ্যটা পরিষ্কার মনে পড়ে তাঁর। ডক্টরকে জেরা করেছিলেন নেতা: ‘এত টাকা দিয়ে কী করবেন, মারুফ সাহেব?

লোকে কিন্তু আপনাদের রিসার্চ ভালো চোখে দেখছে না। মনে করছে ফালতু খরচ। স্পেসে এত লোক পাঠিয়ে হবেটা কী? এমনিতেই মহাশূন্যে পাঠাতে গিয়ে অনেক লোক মারা পড়েছে, প্রচুর সমালোচনা সহ্য করতে হয়েছে আমাদের। আমরা চাই না, আর কারও জীবন যাক।’
ড. মারুফ তাঁর পরিকল্পনার কথা সেদিন খুলে বলতে চেয়েছিলেন। স্পেস মেডিসিন সম্পর্কে আরও গবেষণা করতে আগ্রহী ছিলেন তিনি। কিন্তু কথাগুলো গুছিয়ে বলতে পারেননি। মন্ত্রী মশিউর রহমান তাঁর মুখের ওপর হেসেই উড়িয়ে দেন। বলা বাহুল্য, সরকার প্রস্তাবটি তখন গ্রহণ করেনি। সেদিনের কথা মনে করতেই গ্লানিতে ছেয়ে গেল মশিউর রহমানের অন্তর।
ডক্টরকে জেরা করেছিলেন নেতা: ‘এত টাকা দিয়ে কী করবেন, মারুফ সাহেব? লোকে কিন্তু আপনাদের রিসার্চ ভালো চোখে দেখছে না। মনে করছে ফালতু খরচ। স্পেসে এত লোক পাঠিয়ে হবেটা কী?'
‘আমাকে এসব বলছেন কেন, ভাই?’ বললেন তিনি। ‘আমি শান্তিতে মরতে চাই।’
‘বাঁচার আশা যখন আছে,’ বললেন রায়হান মারুফ, ‘হাল ছাড়বেন কেন? ভারতীয় চিকিৎসকেরা আপনাকে সারিয়ে তুলতে চান। আপনি বিখ্যাত মানুষ, আপনাকে দেশের প্রয়োজন আছে।’
অবশেষে নেতা ভারতে যেতে রাজি হলেন এবং গেলেনও। ভারতীয় স্যাটেলাইট হাসপাতালে আরও কয়েকজন চিকিৎসাপ্রার্থীকে ওয়েটিং রুমে বসে থাকতে দেখলেন তিনি। তাদের মধ্যে এক জোড়া তরতাজা যুবক-যুবতীও রয়েছে। দেখেই বোঝা যায়, পরস্পরের প্রতি গভীর ভালোবাসা তাদের। একে অন্যের সঙ্গে কথা বলছে তারা, চোখে টলমল করছে জল। তাদের মধ্যে মারা যাবে কোনজন? নিজেকে প্রশ্ন করলেন বাঙালি নেতা। তাদের জন্য গভীর দুঃখ বোধ করলেন তিনি। একদম ছোট মানুষ যে ওরা! এমন সময় সসম্মান তাঁকে চিকিৎসকের কেবিনে নিয়ে গেলেন এক নার্স।
কদিন পর ঢাকায় ফিরলেন নেতা। বিমানবন্দরে সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফারদের ভিড়। সবাই প্রশ্ন করছে একসঙ্গে। ‘এখন কেমন বোধ করছেন, মশি ভাই?’ ‘কাজে ফিরছেন কবে?’ ‘ওখানে কি ঠিকমতো সেরে উঠবেন আপনি?’ মুহূর্তখানেক ভেবে নিলেন নেতা। তারপর ধীর ও সতর্ক কণ্ঠে বললেন, ‘ভারতীয় চিকিৎসকদের বিশ্বাস, আমাকে তাঁরা সারিয়ে তুলতে পারবেন। কিন্তু ব্যাপারটা শতভাগ নিশ্চিত নয়।’
‘চিকিৎসা কত দিন চলবে?’
‘হয়তো ছয় মাস বা আরও বেশি।’
‘তার মানে আগামীবার আপনি প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন না? কিন্তু পাঁচ বছর পর ইলেকশনের জন্য তো তৈরি থাকছেন?’
মুহূর্তখানেক ভেবে নিলেন নেতা। তারপর ধীর ও সতর্ক কণ্ঠে বললেন, ‘ভারতীয় চিকিৎসকদের বিশ্বাস, আমাকে তাঁরা সারিয়ে তুলতে পারবেন। কিন্তু ব্যাপারটা শতভাগ নিশ্চিত নয়।’ ‘চিকিৎসা কত দিন চলবে?’
একমুহূর্ত বিরতি নিয়ে জবাব দিলেন মশিউর রহমান। ‘এর উত্তর দিতে হলে আরও সময় নিয়ে ভাবতে হবে,’ বললেন তিনি। ‘আপনাদের আমি এখন কিছুই বলতে পারছি না।’ ঘুরে দাঁড়াতেই দেখলেন, মেয়ে-জামাই-নাতি-নাতনি অপেক্ষা করছে। মুক্তি ও নিপ্পন—তাঁর আদরের নাতি-নাতনি ছুটে এসে নানাকে জড়িয়ে ধরল। অন্তরে জবাবটা ইতিমধ্যেই জানা হয়ে গেছে মশিউর রহমানের।
কদিন বাদে তাঁর সঙ্গে ড. রায়হান মারুফ ও ভারতীয় স্যাটেলাইট হাসপাতালের ডিরেক্টরের কথা হলো। অফিসের স্ক্রিনে দুজনকেই দেখতে পাচ্ছেন তিনি। স্ক্রিনের ডান প্রান্ত থেকে প্রথমে কথা বলে উঠলেন ড. রায়হান মারুফ। ‘সব রেডি আছে, রহমান সাহেব। স্যাটেলাইট হাসপাতালে আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন তাঁরা।’ মাথা নেড়ে স্ক্রিনের বাঁ প্রান্তে মুখ ফেরালেন নেতা। কথা বললেন ভারতীয় প্রফেসরের সঙ্গে। ‘প্রফেসর, একটি প্রশ্ন করতে পারি? আপনার হাসপাতালে তো অনেকেই চিকিৎসা করাতে চায়। তাদের মধ্য থেকে আপনারা রোগী বাছাই করেন কীভাবে? মোট কয়জনকে চিকিৎসাসেবা দিতে পারেন আপনারা?’ ‘এই ধরুন,’ আস্তে করে বললেন ভারতীয় প্রফেসর, ‘দশজন।’
স্ক্রিনের ডান প্রান্ত থেকে প্রথমে কথা বলে উঠলেন ড. রায়হান মারুফ। ‘সব রেডি আছে, রহমান সাহেব। স্যাটেলাইট হাসপাতালে আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন তাঁরা।’
মশিউর রহমান ড. রায়হান মারুফ ও ভারতীয় চিকিৎসকের মনোভাব উপলব্ধি করলেন। মারুফ সাহেব বাংলাদেশের মানুষকে দেখাতে চান যে স্পেস মেডিসিন কতখানি আধুনিক ও জরুরি। তাঁর উদ্দেশ্য, বাংলাদেশ সরকার যাতে তাঁকে গবেষণার জন্য বিপুল পরিমাণ অনুদান দেয়। অন্যদিকে ভারতীয় চিকিৎসক সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী, বিখ্যাত বাঙালি নেতাটির অসুখ সারিয়ে তুলতে চান, যাতে গোটা বিশ্ব ভারতের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়। ভারতীয় বিজ্ঞানসংক্রান্ত গবেষণার কৃতিত্ব প্রকাশ করতে চাইছেন তিনি বিশ্বজনতার সামনে। কিন্তু বাঙালি জনদরদি নেতার মনে অন্য ভাবনা খেলা করছে। ওয়েটিং রুমে বসে থাকা ওই তরুণ যুগলের কথা ভাবছেন তিনি। তাদের মধ্য থেকে একজন মারা পড়বে, তিনি যদি স্যাটেলাইট হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান।
‘আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ,’ বললেন তিনি। ‘স্যাটেলাইট হাসপাতালে যাচ্ছি না আমি। আমি আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।’ স্ক্রিনের সুইচ অফ করে দিলেন তিনি। আহ্! পরম প্রশান্তি অনুভব করছেন।

কয়েক মাস পর। মেয়ে ও নাতি-নাতনিকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে বেড়াতে গেলেন মশিউর রহমান। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে এসেছেন। মেহমানদের প্রতিটি কামরা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাতে নিয়ে গেলেন তিনি। মশিউর রহমান খানিক পরে ক্লান্ত বোধ করায় একটি কামরায় একাকী বসে রইলেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার শখ আর নেই তাঁর। শান্তির সন্ধান পেয়েছেন তিনি। স্রষ্টার প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।
চুপ করে বসে আছেন মশিউর রহমান, বিন্দুমাত্র যন্ত্রণা কিংবা ভীতি বোধ করছেন না। আর তখনই নীরবে এসে তাঁকে বরণ করে নিল মৃত্যু।
