Published on
:
3 min read
পুজোর বিচার মানেই এতদিন একটাই প্রশ্ন ছিল: কোন পুজো সেরা? এবছর সেই প্রশ্নটাই বদলে দিল গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ (GSOE)। ফরচুন নিবেদিত GSOE Awards 2026-এর চূড়ান্ত বিচারপর্বে বিচারকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল আরও কঠিন একটা প্রশ্ন। এই পুজো কি গোটা পৃথিবীর সামনে দাঁড়ানোর জন্য তৈরি?
গত বছর GSOE-র বিচারে স্পষ্ট হয়েছিল, কলকাতার পুজো হয়ে উঠেছে এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক গবেষণাগার। এবছর সেই ভাবনাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হল। থিম কতটা গভীর, শুধু সেটুকু দেখা নয়। দেখা হল সেই থিম কতটা নিরাপদে, কতটা দায়িত্ব নিয়ে, আর কতটা সহজ ভাষায় দর্শনার্থীর কাছে পৌঁছচ্ছে। এককথায়, কলকাতার পুজোর জন্য একটা আন্তর্জাতিক মাপকাঠি তৈরির চেষ্টা।
২৫০ থেকে ১২০, ১২০ থেকে ৪১, ৪১ থেকে ১২
এবছর নিবন্ধন ছাড়িয়েছিল ২৫০। বাজেট অনুযায়ী পুজোগুলিকে ভাগ করা হয় তিনটি বিভাগে: ১০ থেকে ২৫ লক্ষের ব্রোঞ্জ, ২৫ থেকে ৬০ লক্ষের রৌপ্য এবং ৬০ লক্ষের ঊর্ধ্বে স্বর্ণ। প্রথম দফায় বিচারকেরা শহর ও শহরতলির মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে বাছাই করেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় যথাক্রমে ১২০ ও ৪১টি পুজো থেকে শেষ দফায় বেছে নেওয়া হয় সেরা ১২।
পঞ্চমীর সকালে চূড়ান্ত পর্বের শুরুতে বিচারকদের সামনে GSOE-র লক্ষ্য ও ভাবনা তুলে ধরেন উদ্যোক্তারা। তারপর বেজে ওঠে ঢাক। GSOE-র রীতি মেনে সেই বোলেই শুরু হয় বিচারকদের যাত্রা।
তারকা ও আন্তর্জাতিক বিচারকমণ্ডলী
চূড়ান্ত পর্বের বিচারকমণ্ডলীতে ছিলেন অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকার, অভিনেতা রজতাভ দত্ত, অভিনেত্রী দর্শনা বণিক, অভিনেতা সৌরভ দাস এবং প্রাক্তন ফুটবলার হোসে র্যামিরেজ ব্যারেটো। আন্তর্জাতিক মুখ হিসেবে ছিলেন ম্যাঞ্চেস্টার থেকে আসা বিশেষ বিদেশি বিচারক ইয়ান টেলর এবং আলেকজান্দ্রা টেলর। অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কলকাতায় ফ্রান্সের কনসাল জেনারেল থিয়েরি মোরেল। দেশি চোখ আর বিদেশি চোখ একসঙ্গে মণ্ডপ দেখায় বিচারে যোগ হয়েছে এক নতুন মাত্রা।
এবারের ব্যতিক্রমী দিক
বাছাইপর্বের বিচারকদলে এবছর ছিলেন শিল্পীরাও। যাঁরা বছরের পর বছর প্রতিমা গড়েন, মণ্ডপ সাজান, আলো দিয়ে গল্প বলেন, তাঁদের চোখ দিয়েই এবার শিল্পের বিচার হল। মোট ৬ লক্ষ টাকার পুরস্কারমূল্যের ৬০ শতাংশ সরাসরি শিল্পী ও কারিগরদের হাতে তুলে দেওয়ার যে অঙ্গীকার GSOE শুরু থেকে করে আসছে, এবছরও তা বহাল।
ফলাফল
স্বর্ণ (৬০ লক্ষের ঊর্ধ্বে): প্রথম আলিপুর সর্বজনীন, দ্বিতীয় সল্টলেক এফডি ব্লক
রৌপ্য (২৫–৬০ লক্ষ): প্রথম ঠাকুরপুকুর এসবি পার্ক, দ্বিতীয় চেতলা অগ্রণী
ব্রোঞ্জ (১০–২৫ লক্ষ): প্রথম রাজডাঙা আমরা কজন, দ্বিতীয় সল্টলেক ইসি ব্লক
সেরার সেরা: বড়িশা ক্লাব
বছরের বিস্ময়: নেতাজি সড়ক আঞ্চলিক অধিবাসীবৃন্দ
কে কী বললেন
প্রতিষ্ঠাতা বোধিসত্ত্ব ব্যানার্জী জানান, ‘৪১ থেকে ১২ এবং তার থেকে ৮টি বেছে নেওয়া সহজ ছিল না। প্রায় প্রতিটি মণ্ডপে মনে হয়েছে, এই পুজো বিশ্বমঞ্চে দাঁড়ানোর যোগ্য। ফারাক গড়ে দিয়েছে খুঁটিনাটি: একটা পরিষ্কার বেরোনোর পথ, একজন বয়স্ক দর্শনার্থীর জন্য একটা র্যাম্প, বর্জ্য ফেলার জন্য আলাদা ব্যবস্থা।’
তাঁর কথায়, ‘৭০টির বেশি দেশে আজ দুর্গাপুজো হয়, কিন্তু সবার চোখ কলকাতার দিকে। সেই দায়িত্ব থেকেই আমরা মাপকাঠিটা তৈরি করতে চাইছি। সেরার তকমা এক বছরের, কিন্তু বিশ্বমানের অভ্যাস থেকে যায় চিরকাল।’
GSOE-র সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডাঃ অর্ণব বসু বলেন, ‘আমরা এবার জানতে চাইনি কোন পুজো সবচেয়ে বড় বা সবচেয়ে জাঁকজমকের। আমরা জানতে চেয়েছি, লন্ডন, প্যারিস বা টোকিও থেকে কেউ এসে এই মণ্ডপে দাঁড়ালে নিরাপদ বোধ করবেন কি না, আর ফিরে গিয়ে কলকাতার গল্প বলবেন কি না। সেরা আটটি পুজো সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুর্গাপুজোর আসল নায়ক সেই মানুষগুলো, যাঁদের নাম মণ্ডপের ফলকে লেখা থাকে না: মৃৎশিল্পী, আলোকশিল্পী, ঢাকি, কারিগর। তাই পুরস্কারের ৬০ শতাংশ তাঁদের হাতেই যায়। এবছর শিল্পীরা নিজেরাই বিচারের কাজে যুক্ত হয়েছেন। এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর কী হতে পারে?’
শেষ কথা
২০২১ সালে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে কলকাতার দুর্গাপুজো আর শুধু বাঙালির উৎসব নয়, গোটা মানবজাতির ঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্যকে বিশ্বের দরবারে মর্যাদার সঙ্গে তুলে ধরতে হলে শুধু সৌন্দর্য যথেষ্ট নয়, দরকার মানও। GSOE Awards 2026 সেই মানের খাতায় প্রথম আঁচড়টা কাটল। এবার পুজো দেখতে বেরোলে শুধু প্রতিমা নয়, খেয়াল রাখুন মণ্ডপের বাকি খুঁটিনাটিও। বিশ্ব কিন্তু ঠিক সেটাই দেখছে।
