প্রমত্তা যমুনার ওপর নির্মিত সেতু পেরিয়ে উত্তরাঞ্চলের পথে যাত্রা শুরু করতেই যানজট ও ধীরগতির চিরচেনা ভোগান্তিতে পড়তে হয় যাত্রীদের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে আটকে থাকতে হয় দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনকে। বিশেষ করে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় ঘরমুখো মানুষের ঢল নামলে এই দুর্ভোগ চরমে ওঠে। ঢাকা থেকে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলগামী ২২ জেলার মানুষের যাতায়াতে এর প্রভাব পড়ে। যমুনা সেতুর দুই প্রান্তের যানজট ছড়িয়ে পড়ে সিরাজগঞ্জের সয়দাবাদ, কড্ডার মোড় ও হাটিকুমরুল মোড় পর্যন্ত। এতে যাত্রার সময় বাড়ার পাশাপাশি কৃষিপণ্য ও শিল্পসামগ্রী পরিবহনে সময় ও ব্যয় বেড়ে যায়।
দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি কমাতে এবার আশার আলো দেখাচ্ছে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল মোড়ে নির্মাণাধীন ক্লোভারলিফ ইন্টারচেঞ্জ। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ইন্টারচেঞ্জটির মূল কাঠামো যান চলাচলের উপযোগী করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। প্রায় ৭৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর মহাসড়কের চার লেন সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামো। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে দিন-রাত দুই শিফটে চলছে নির্মাণকাজ। এটি চালু হলে মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে যানবাহনের চলাচল আরও নির্বিঘ্ন হবে এবং রাজধানীর সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগে গতি আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে ইন্টারচেঞ্জ চালু হলেই যে উত্তরাঞ্চলের পথে যানজটের স্থায়ী সমাধান হবে, তা নিশ্চিত নয়। যমুনা সেতুর উপরিভাগ সম্প্রসারণের কাজ শেষ না হলে নতুন অবকাঠামোর সুফল পুরোপুরি পাওয়া কঠিন হতে পারে। সেতুর ওপর রেলট্র্যাক অপসারণের পর সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাজ শেষ করতে আরও সময় লাগবে। ফলে হাটিকুমরুল ইন্টারচেঞ্জ চালুর পাশাপাশি যমুনা সেতুর সম্প্রসারণকাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, দুটি কাজ সমন্বিতভাবে সম্পন্ন হলে উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের যাতায়াতের দুর্ভোগ কমবে, সহজ হবে পণ্য পরিবহন এবং রাজধানীর সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের বাণিজ্যিক যোগাযোগ পাবে নতুন গতি।
সাসেক-২ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক ও সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সরফরাজ হোসাইন বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে ইন্টারচেঞ্জ ফ্লাইওভারের মূল কাঠামোর নির্মাণকাজ শেষ করে যান চলাচলের উপযোগী করাই তাদের লক্ষ্য। এজন্য শ্রমিক ও প্রকৌশলীরা দুই শিফটে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছেন।
সাসেক-২-এর প্রকল্প পরিচালক ড. মো. ওয়ালিউর রহমান
জানান, জরিপের নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে জিপিএস প্রযুক্তি এবং নির্মাণকাজের নিবিড় তদারকিতে বিল্ডিং ইনফরমেশন মডেলিং (বিআইএম) সফটওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছে।
তবে পুরো প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হওয়া নিয়ে কিছুটা শঙ্কা রয়েছে। সাসেক-২ প্রকল্পের আওতায় মহাসড়ক সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালে। পরে ২০২২ সালে হাটিকুমরুল মোড়ে ক্লোভারলিফ ইন্টারচেঞ্জ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পটির প্রাথমিক মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। ভূমি অধিগ্রহণসহ নানা জটিলতায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। বর্ধিত মেয়াদও শেষের পথে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ইন্টারচেঞ্জের প্রধান কাঠামো চালুর উপযোগী করা প্রকল্প বাস্তবায়নকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক ড. মো. ওয়ালিউর রহমান জানান, যমুনা সেতুর ওপরের পুরনো রেললাইন ইতোমধ্যে অপসারণ করা হয়েছে। সেখানে দুই লেন সম্প্রসারণের কাজ শেষ করা জরুরি। এ বিষয়ে যমুনা সেতু ও রেল কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি মহাসড়কের নিরাপত্তাব্যবস্থাও আধুনিক করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
যমুনা সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, সেতুর ওপরের রেলট্র্যাক অপসারণের পর সম্প্রসারণকাজের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ২৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে সেতুর উপরিভাগ সম্প্রসারণে গত মে মাসে চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। তবে ১৮ মাসের চুক্তির মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালামাল সংগ্রহ ও প্রয়োজনীয় স্থাপনা তৈরিতে ইতোমধ্যে পাঁচ মাস পার হয়েছে। আগামী রোজার ঈদের আগে সম্প্রসারিত অংশ যান চলাচলের উপযোগী করে দিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বলা হয়েছে। তা না হলে যান চলাচলে বিড়ম্বনা সৃষ্টি হতে পারে।
সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, ইন্টারচেঞ্জসহ পুরো চার লেন সড়ক চালু হলে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিপণ্য ও শিল্পসামগ্রী দ্রুত রাজধানীতে পৌঁছানো যাবে। পরিবহন সময় ও ব্যয় কমলে ব্যবসায়ী ও সাধারণ ভোক্তা— উভয়েই এর সুফল পাবেন।
