ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংঘর্ষের কারণে জরুরি খাদ্যসহায়তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন প্রায় ৮ লাখ মানুষ। একই সঙ্গে আহতদের চাপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে দেশটির হাসপাতালগুলো। পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হলে খাদ্যসংকট ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) আল জাজিরার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে রয়টার্সের বরাতে এসব তথ্য জানানো হয়।
আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি (আইসিআরসি) এবং জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে সৌদি-সমর্থিত বাহিনী এবং ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ বাড়ায় বিভিন্ন অঞ্চলে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের সম্মুখসারিতে দ্রুত পরিবর্তন আসায় ত্রাণ সরবরাহের পথও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ডব্লিউএফপির তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনে আনুমানিক ৮ লাখ মানুষ জীবনরক্ষাকারী খাদ্যসহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। সেখানে প্রায় ৬ লাখ মানুষ খাদ্যসহায়তা পাচ্ছেন না। তাঁদের মধ্যে প্রায় ২ লাখ নারী ও শিশু রয়েছেন।
সাম্প্রতিক সংঘর্ষের তীব্রতা বৃদ্ধি এবং শহরটি হুতি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা দিয়ে ঘিরে থাকায় ত্রাণ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। খাদ্যনিরাপত্তার দিক থেকেও তাইজ ইয়েমেনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। ডব্লিউএফপির ইয়েমেনবিষয়ক পরিচালক এল-খিদির দালুম সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটলে তা ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ইয়েমেনজুড়ে ১ কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষের পর্যাপ্ত খাবার নেই। এ ছাড়া যেসব এলাকায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব, সেখানকার ৭৪ শতাংশ পরিবারও দৈনন্দিন খাদ্যচাহিদা পূরণ করতে পারছে না।
সংঘাতের প্রভাব পড়েছে দেশটির ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থায়ও। আইসিআরসির তথ্য অনুযায়ী, তাইজ, মারিব ও লোহিত সাগর উপকূলবর্তী এলাকার হাসপাতালগুলোতে আহত মানুষের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। কোনো কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এক সপ্তাহেই ৭০০ জনের বেশি আহত রোগী চিকিৎসা নিতে এসেছেন।
আইসিআরসির স্বাস্থ্যসেবা সমন্বয়ক ফিরাস আবু সামরা জানান, ইয়েমেনে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে—এমন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সংখ্যা খুবই সীমিত। সম্মুখসারির হাসপাতালগুলোতে অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম, অবেদন দেওয়ার ওষুধ, অক্সিজেন ও অন্যান্য জরুরি চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
মারিব জেনারেল হাসপাতালের আইসিআরসি সার্জন এদুয়ার্দো তোরো সতর্ক করেছেন, হাসপাতালে রোগীর চাপ আরও বাড়লে শয্যা ও চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট তীব্র হবে। এতে সংঘর্ষে আহত ব্যক্তিদের পাশাপাশি অন্যান্য রোগে আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসাও ব্যাহত হতে পারে।
ইয়েমেনে আইসিআরসির প্রতিনিধি দলের প্রধান ক্রিস্টিন চিপোল্লা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থা নতুন করে সংঘাত বাড়লে বিপুলসংখ্যক হতাহতকে সামাল দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই। বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবশিষ্ট সক্ষমতাও দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
ইয়েমেন দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের অন্যতম গুরুতর মানবিক সংকটে জর্জরিত। বছরের পর বছর সংঘাত, খাদ্যসংকট এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতায় দেশটির বিপুলসংখ্যক মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। নতুন করে লড়াই শুরু হওয়ায় সেই সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিশেষ করে তাইজের মতো সংঘাতপ্রবণ এলাকায় খাদ্যসহায়তা পৌঁছানো ব্যাহত হওয়া এবং হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা কমে যাওয়ায় বেসামরিক মানুষের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। খাদ্য, ওষুধ ও জরুরি চিকিৎসার অভাবে নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
পরিস্থিতির আরও অবনতি ঠেকাতে সংঘাতের পক্ষগুলোকে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ উন্মুক্ত রাখার আহ্বান জানিয়েছে ত্রাণ সংস্থাগুলো। সংস্থাগুলোর সতর্কবার্তা হলো, সংঘাত অব্যাহত থাকলে খাদ্যসংকট ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিপর্যয় একসঙ্গে ইয়েমেনকে আরও গভীর মানবিক দুর্যোগের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
The post ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত, খাদ্যসহায়তা থেকে বিচ্ছিন্ন ৮ লাখ মানুষ appeared first on ভোরের চেতনা.
