নিজস্ব ছবি এই সময়
Published on
:
3 min read
এই সময়: ‘আতরের গন্ধে’, অ্যাপ-বাইক রাইডারের ‘খোলসে’ও আড়াল করা গেল না পরিচয়!
মুম্বইয়ের মাহিম মেট্রো স্টেশনের কাছ থেকে মহারাষ্ট্র অ্যান্টি টেররিজ়ম স্কোয়াডের (এটিএস) কালাচৌকি ইউনিটের হাতে ধরা পড়ে গেল পাকিস্তানি জঙ্গি সংগঠন জৈশ-ই-মহম্মদের ‘চর’ মহম্মদ হাসান আবু শারমাদ আখতার। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, বছর ৩৩-এর এই যুবক একটি অ্যাপ-বাইক সংস্থায় রাইডার হিসেবে কাজ করছিল। সঙ্গে চালাচ্ছিল আতরের ব্যবসাও। এই দুই পেশাকে সে ‘কভার’ হিসেবে ব্যবহার করছিল বলে গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, যার আড়ালে জৈশের হয়ে অনলাইনে সক্রিয় ভাবে প্রচার চালাচ্ছিল আখতার। সেখানে জিহাদের ডাক থেকে শুরু করে হিন্দু-বিরোধী কড়া বার্তা তো বটেই, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে হত্যার আহ্বান পর্যন্ত জানিয়েছিল সে।
আখতারের সোশ্যাল মিডিয়া ফুটপ্রিন্ট বিশ্লেষণ করে প্রাথমিক ভাবে জৈশ-যোগ পাওয়া গিয়েছে বলে সূত্রের খবর। সেই সঙ্গে পাকিস্তানি ইন্টেলিজেন্স অপারেটিভদের সঙ্গেও তার সরাসরি যোগাযোগ ছিল বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।
জৈশ-যোগ
‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর থেকে সরাসরি ভারতে ঢুকে নাশকতা চালানোর চেনা ছকের পাশাপাশি বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে রিক্রুটমেন্ট বা উস্কানিমূলক প্রচারের মাধ্যমে উগ্র মৌলবাদ ছড়ানোর কৌশল যে জৈশ-ই-মহম্মদ নিয়েছে, সে কথা আগেই জানতে পেরেছিলেন গোয়েন্দারা। বিশেষ করে তাদের মহিলা উইং ‘জামাত-উল-মোমিনাত’কে এ বিষয়ে পুরোদমে সক্রিয় করেছে মৌলানা মাসুদ আজ়হারের জঙ্গি সংগঠন।
মাহিম থেকে ধৃত আখতার জৈশের সেই কৌশলেরই একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ লিঙ্ক হতে পারে বলে প্রাথমিক ভাবে মনে করছেন তদন্তকারীরা। ‘ইন্ডিয়ান মুসলিম’ নামে একটি টেলিগ্রাম গ্রুপে মাসুদ আজ়হারের একাধিক অডিয়ো ক্লিপ পোস্ট করেছে সে। যার প্রথমটি করেছিল গত ১ জুন। তাতে বাবরি মসজিদ ছাড়াও জৈশ-প্রধানের ভারত-বিরোধী অনেক বার্তা রয়েছে।
‘ইব্ন-ই-কাশিম’ নামে একটি পাকিস্তানি টেলিগ্রাম চ্যানেলের সঙ্গেও আখতারের যোগসূত্র মিলেছে। মাসুদের এই সব ঘৃণা-ভাষণ কী ভাবে আখতারের হাতে এলো, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। তার মোবাইলেও ভারত-বিরোধী বহু অডিয়ো, ভিডিয়ো এবং নথি মিলেছে বলে তদন্তকারীদের দাবি। সূত্রের খবর, অন্তত ৩৯টি এমন স্ক্রিনশট তার ফোনে মিলেছে, যার ভিত্তিতে তদন্তের জাল অনেকটা বিস্তৃত হয়েছে।
আড়ালে আইএসআই?
গোয়েন্দা সূত্রের বক্তব্য, এই মুহূর্তে লস্কর-ই-তৈবা বা জৈশের মতো পাক জঙ্গি সংগঠনগুলির কাজকর্ম পরিচালনার ভার সেনার সঙ্গে সরাসরি রয়েছে পাক গুপ্তচর সংস্থা ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) হাতে। তাদের মূল কাজ হলো আখতারের মতো অপারেটিভদের নিয়ন্ত্রণ করা, যাদের কাছে নির্দেশ আসে সরাসরি ইসলামাবাদের জি ৭/৪ সেক্টরের আবপারার অফিস (আইএসআই-এর সদর দপ্তর) থেকে।
সূত্রের খবর, প্রাথমিক ভাবে আখতারের সঙ্গে পাকিস্তানের এক ইন্টেল-অপারেটিভের যোগাযোগের প্রমাণও গোয়েন্দাদের হাতে এসেছে। তবে, আখতারের পাক-যোগ আরও ভালো ভাবে খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। তাঁদের বক্তব্য, জৈশের কাণ্ডকারখানা সম্পর্কেও আরও ভালো চিত্র মিলবে আখতারের পাক-লিঙ্ক পরিষ্কার হওয়ার পরে।
টার্গেট পিএম?
সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতেই আখতার প্রথমবার এটিএসের নজরে পড়ে বলে সূত্রের দাবি। বিভিন্ন উস্কানিমূলক পোস্ট এবং কমেন্টের জন্য @hasanshaikh6603 নামে একটি ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডল এটিসের আতশকাচের তলায় আসে। সেটিকে ‘ফ্ল্যাগ’ করে চলতে থাকে নিয়মিত নজরদারি। এই হ্যান্ডলটি আখতারের বলে সূত্রের খবর।
গত ৮ সেপ্টেম্বর সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্টে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মুম্বই সফরের আগে নিরাপত্তার ফাঁক নিয়ে একটি প্রতিবেদনের উল্লেখ করা হয়। ওই ঘটনায় দু’জনের গ্রেপ্তারি এবং একটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের খবরও ছিল তাতে। সেখানেই ওই ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডল থেকে আখতার কমেন্ট করে — ‘কুছ করনা হ্যায় ইন্দিরা গান্ধী কি তরহা মোদী কো ভি ভাইলোগ (ইন্দিরা গান্ধীর মতো মোদীকেও কিছু করতে হবে)।’ কেরলমের বিধানসভা নির্বাচনের ফল নিয়ে কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধীর একটি পোস্টেও আখতারের কমেন্ট রয়েছে। তবে সেটির বক্তব্য ঠিক কী, তা স্পষ্ট নয় বলে তদন্তকারীদের দাবি।
জিহাদের ডাক ও হিন্দু-বিদ্বেষ
আখতারের সোশ্যাল মিডিয়ার ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে রয়েছে জিহাদ এবং হিন্দুদের উপরে তীব্র বিদ্বেষ। গত ১৫ মে মধ্যপ্রদেশের কামাল মৌলা মসজিদের রায় নিয়ে এক্স-এ (সাবেক টুইটার) একটি পোস্টে আখতার কমেন্ট করে — ‘অব জিহাদ কা জ়মানা আ গ্যয়া হ্যায়।’ বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং বজরং দলের ‘শৌর্য ট্রেনিং ক্যাম্প ২০২৬’ নিয়ে একটি পোস্টে আখতারের কমেন্ট — ‘অব হর মুসলিম কো ভি হাতিয়ার রখনা চাহিয়ে, উঠানা চাহিয়ে।’ একই ভাবে একটি পোস্টে সে লিখেছে, ‘জিহাদ করো আল্লাহ কে লিয়ে আগর হিন্দুস্তান মে ইসলাম, মসজিদ অওর মাদ্রাসা দেখনা চাহতে হো তো।’ আর একটি পোস্টে সে লিখেছে, ‘কাশ্মীর মে হিন্দুওঁ কো ব্যান করনা হ্যায়।’
হঠাৎ নীরব
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গিয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় এ হেন সক্রিয় আখতার গত দিনদশেক আচমকা একেবারে উবে যায় অনলাইন কর্মকাণ্ড থেকে। শনিবার তার বিরুদ্ধে বিএনএস-এর একাধিক ধারায় মামলা রুজু করেছে এটিএস। মুম্বইয়ের যে এলাকায় সে থাকত, সেখানকার এক প্রতিবেশী বলেন, ‘প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে এখানে রয়েছে। ঘরের বাইরে বসে থাকত অনেক সময়ে। আমার সঙ্গে কথাও হতো। বলত, আতর বিক্রি করে। রাতে কোনও একটা কাজ করত।’
তদন্তের অভিমুখ
গোয়েন্দা সূত্রের বক্তব্য, অ্যাপ-বাইকের রাইডার পরিচয় কাজে লাগিয়ে মুম্বইয়ের নানা জায়গায় যাওয়া একেবারেই কঠিন কাজ নয়। তার উপরে আতর বিক্রির ছকে নানা মহল্লায় ঘোরাফেরা করত আখতার। এই দুই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সে কী কী করেছে, কোনও বড় ছকের গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটি হয়ে উঠেছে কি না — সে সবই এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আর এই সূত্রেই খুব জোরালো ভাবে তদন্তের আওতায় চলে এসেছে আখতারের পাক-যোগ।
