সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও উৎসবমুখর পরিবেশে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে কক্সবাজারের রামুতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব।
বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমীতে উপজেলার বাঁকখালী নদীর তীরে প্রতিমা নিরঞ্জনকে কেন্দ্র করে সমবেত হন হাজারো পূজারি ও দর্শনার্থী।
সিঁদুর খেলা, দেবীবরণ, ঢাকঢোলের বাদ্য আর অশ্রুসজল বিদায়ের আবহে নদীর দুই পাড় পরিণত হয় মানুষের মিলনমেলায়। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি ছাড়িয়ে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আয়োজনটি হয়ে ওঠে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
বুধবার বিকেলে রামুর ফকিরা বাজারের পূর্ব পাশে বাঁকখালী নদীর বালুচরে প্রতিমা নিরঞ্জন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। দুপুর থেকেই উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে ট্রাকে করে প্রতিমা নিয়ে আসা হয় নদীর তীরে। ঢাকঢোল ও বাদ্যবাজনার তালে পুরো এলাকায় সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। পরে সিঁদুর খেলা ও দেবীবরণের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ভক্তদের অশ্রুসজল বিদায়ের মধ্য দিয়ে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজন দেখতে নদীর দুই তীরে সমবেত হন হাজারো মানুষ।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর রামু উপজেলায় ২৪টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা এবং ১৩টি মণ্ডপে ঘটপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অর্থাৎ, উপজেলায় মোট ৩৭টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে বাঁকখালী নদীতে পাঁচটি প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। অন্য প্রতিমাগুলো রাজারকুলের রামকুট পুকুর, ঈশান পালের পৈতৃক পুকুর, উত্তর ফতেখাঁরকুলের বণিকপাড়া পুকুর, উমখালী-সংলগ্ন বাঁকখালী নদী এবং কক্সবাজারের বঙ্গোপসাগরে বিসর্জন দেওয়া হয়।
আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছর রামু উপজেলায় ২১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সে হিসাবে এ বছর দুর্গাপূজার মণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে তিনটি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিল্লুর রহমান। রামু উপজেলা প্রতিমা নিরঞ্জন উদযাপন পরিষদের সভাপতি বিভাষ সেনগুপ্ত জিগমীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে ফজলুল হক, ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কামাল উদ্দীন, রামু উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবুল বশর বাবু এবং রামু সর্বজনীন কেন্দ্রীয় কালীমন্দির পরিচালনা পরিষদের উপদেষ্টা ননী গোপাল দে ও সুনীল শর্মা।
অনুষ্ঠানে চণ্ডীপাঠ করেন মন্দিরের পুরোহিত সজল ব্রাহ্মণ চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য দেন প্রতিমা নিরঞ্জন উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক চন্দন দাশগুপ্ত। পরিষদের সহসভাপতি সুশান্ত পাল বাচ্চুর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন রাজনীতিক ও সমাজসেবক আতিকুল হক আতিক এবং রামু সর্বজনীন কেন্দ্রীয় কালীমন্দির দুর্গাপূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি রূপন ধর।
এ সময় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এসআরবি-১৫ ব্যাটালিয়নের ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর (ডিএডি) সাইফুল ইসলাম, রামু ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার আবদুল কাদের চৌধুরী, রামু উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সহসভাপতি সুবীর বড়ুয়া বুলু, উপজেলা দুর্গাপূজা উদযাপন পরিষদের সহসভাপতি প্রকাশ সিকদারসহ বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ও উদযাপন কমিটির নেতারা।
রামু উপজেলা প্রতিমা নিরঞ্জন উদযাপন পরিষদের সভাপতি বিভাষ সেনগুপ্ত জিগমী বলেন, “সম্প্রীতির আবহে উৎসবমুখর পরিবেশে বাঁকখালী নদীতে প্রতিমা নিরঞ্জন সম্পন্ন হয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসব হলেও এতে সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ রামুর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে আরও সুদৃঢ় করেছে।”
তিনি জানান, উপজেলা প্রশাসন, রামু থানা পুলিশ, এসআরবি-১৫ ব্যাটালিয়ন ও পূজা উদযাপন পরিষদের সমন্বিত উদ্যোগে অনুষ্ঠান শেষ হওয়া পর্যন্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। নদীতে দুর্ঘটনা এড়াতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরাও সতর্ক অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করেন।
প্রতিবছর বিজয়া দশমীতে বাঁকখালী নদীতে প্রতিমা বিসর্জনকে ঘিরে রামুতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মিলন ঘটে। দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর এ আয়োজন ধর্মীয় আবেগের পাশাপাশি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধনকে নতুন করে তুলে ধরে।
