যাঁর জন্য ১০ বছর অপেক্ষা, তাঁকে ফিরে পেয়েও আমিনার অপেক্ষা ফুরোয় না। স্বামীর চোখে নিজের ভালোবাসার স্বীকৃতি খোঁজেন তিনি। অথচ নছরের কাছে স্ত্রীর দীর্ঘ প্রতীক্ষা, ত্যাগ কিংবা বেঁচে থাকার সংগ্রামের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে তাঁর সতীত্বের প্রশ্ন! নিজে ভিনদেশে আরেকটি সংসার পেতেছেন যে পুরুষ, তিনিই ফিরে এসে প্রশ্ন তোলেন স্ত্রীর জীবন নিয়ে। ‘আমিনা সুন্দরী’ দেখতে গিয়ে এ জায়গাটিই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে। ৩০০ বছরের পুরোনো গল্পের সঙ্গে আজকের জীবনের দূরত্ব যেন মুহূর্তেই ঘুচে যায়।

থিয়েটার আর্ট ইউনিটের এই সংগীতনির্ভর প্রযোজনা শততম প্রদর্শনীর দ্বারপ্রান্তে। আজ বৃহস্পতিবার ও আগামীকাল শুক্রবার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার হলে হবে নাটকটির যথাক্রমে ৯৯তম ও শততম প্রদর্শনী। দুদিনই শুরু সন্ধ্যা সাতটায়। দলের ৩৫তম বর্ষে পদার্পণের আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এই মাইলফলক।
২০০৭ সালে মঞ্চে এসেছিল থিয়েটার আর্ট ইউনিটের দ্বাদশ প্রযোজনা ‘আমিনা সুন্দরী’। চট্টগ্রামের প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো লোককাহিনি ‘নছর মালুম ও ভেলুয়া সুন্দরী’ অবলম্বনে নাটকটি লিখেছেন এস এম সোলায়মান। নির্দেশনা দিয়েছেন রোকেয়া রফিক বেবী। দীর্ঘ মঞ্চযাত্রায় ঢাকার আলোচিত প্রযোজনাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে নাটকটি।

আমিনার স্বামী নছর জাহাজের মালুম বা নাবিক। বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বার্মায়, বর্তমান মিয়ানমারে গিয়ে এখিন নামের এক তরুণীকে বিয়ে করেন তিনি। ঘরে আমিনা তখন তাঁর ফেরার অপেক্ষায়। পরিবার ও সমাজের নানা চাপ এড়িয়ে নিজের ভালোবাসাকে রক্ষা করতে চান আমিনা। কিন্তু একসময় বন্দী হন ভোলা সওদাগরের ঘরে। অন্যদিকে প্রতারণার কথা জানতে পেরে এখিনও নছরকে প্রত্যাখ্যান করেন। সব হারিয়ে পথে পথে গান গেয়ে বেড়ানো নছর আশ্রয় নেন ভোলা সওদাগরের বাড়িতে। সেখানেই আবার দেখা হয় দুজনের। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই সাক্ষাৎ আমিনাকে দাঁড় করায় আরেক পরীক্ষার সামনে।
নাটক দেখতে দেখতে মনে হয়, আমিনাকে বারবার তাঁর নিজের জীবন থেকেই সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তিনি কী চান, কাকে ভালোবাসেন, কীভাবে বাঁচবেন—সেই সিদ্ধান্ত অন্যেরা নিতে চায়। এত কিছুর মধ্যেও নিজের ভালোবাসা আঁকড়ে থাকেন তিনি। কিন্তু যাঁর জন্য এই লড়াই, তাঁর কাছেও শেষ পর্যন্ত আমিনাকেই জবাবদিহি করতে হয়।
নির্দেশক রোকেয়া রফিক বেবীর ভাবনায়ও একজন আমিনার জীবনে ধরা আছে আরও অনেক নারীর অভিজ্ঞতা। তাঁর ভাষ্যে, ‘আমিনা সুন্দরী আমার কাছে কোনো সময়ের গল্প নয়, সর্বকালে পৃথিবীর সর্বপ্রান্তে এ গল্প সত্যনিষ্ঠ। তাই এক “আমিনা”র গল্পে আমি উপস্থাপন করেছি বহু আমিনার গল্প।’
নাটকের একটি সংলাপ এই ভাবনাকে আরও স্পষ্ট করে—‘জীবন তো একটাই। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না সব এই এক জীবনের মধ্যে। জীবন শেষ তো বেবাক শেষ।’ আমিনার এ কথায় তাঁর সব বেদনার সঙ্গে বাঁচার আকুতিও ধরা পড়ে। যে জীবনের ওপর এত মানুষের দাবি, সেই জীবন তো তাঁরও।
রোকেয়া রফিক জানান, ছোট্ট এই সংলাপ তাঁকে বারবার আমিনার কাছে টেনে নিয়েছে, মুখোমুখি করেছে অসংখ্য প্রশ্নের। মানুষের প্রেম, সংগ্রাম আর মানবিকতায় গড়ে ওঠা জীবনের মহত্ত্ব তাঁকে তাড়িত করেছে। তাঁর ভাবনায় এসেছে সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনের সম্পর্কও। মহাকালের কাছে একটি মানবজীবন সামান্য। অথচ সেই জীবনের প্রেম, বেদনা ও সংগ্রাম তার নিজের কাছে কত গভীর! এই দ্বন্দ্ব থেকেই আমিনাকে দেখেছেন তিনি।
নির্দেশকের সেই ভাবনার ছাপ রয়েছে উপস্থাপনাতেও। লোককাহিনিকে মঞ্চে আনতে গিয়ে মুক্ত পরিসর রাখতে চেয়েছেন রোকেয়া রফিক। মঞ্চসজ্জায় ব্যবহার করেছেন জ্যামিতিক গঠন। পোশাকে ধরতে চেয়েছেন সমুদ্রপারের মানুষের জীবন—খোলামেলা ও গাঢ় রং, আঁটসাঁট বাঁধন। সময় ও অনুভূতির আবহ তৈরিতে আলোর পাশাপাশি কাজে লাগিয়েছেন সাইক্লোরামা, মঞ্চের পেছনের বিস্তৃত পর্দা।
আর আছে গান। আমিনা সুন্দরীর কথা বলতে গেলে গানের প্রসঙ্গ আলাদা করে আসবেই। মঞ্চে আমিনার অপেক্ষা ও বঞ্চনার গল্প যত এগোয়, সংগীতও তার আবহ ধরে রাখে। সংলাপের সঙ্গে সুর মিলে চরিত্রগুলোর অনুভূতি পৌঁছে দেয় দর্শকের কাছে। ঢাকার মঞ্চে নাটকটির গান বিশেষ সাড়া ফেলেছে।
দলের জ্যেষ্ঠ সদস্য ও নাটকের অভিনেতা ফেরদৌস আমিন বিপ্লব জানান, ভারতে নাটকটির ৯টি প্রদর্শনী হয়েছে। সেখানেও দর্শকেরা এর গান সাদরে গ্রহণ করেছেন। নাটকে এস এম সোলায়মানের লেখা বেশ কিছু গান রয়েছে। পাশাপাশি রামপ্রসাদ থেকে লালন—বিভিন্ন ধারার গানে সমৃদ্ধ হয়েছে প্রযোজনাটি।
সংগীত পরিকল্পনা করেছেন সেলিম মাহবুব। নাটকের হারানো সুর ধরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রয়াত জগলুল আলমের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন নির্দেশক। রোকেয়া রফিকের ভাষ্যে, এই প্রযোজনার নির্দেশনা দেওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল কঠিন। দলের সদস্যদের সহযোগিতায় কাজটি সম্পন্ন হয়েছে। সংগীত, মঞ্চ, কোরিওগ্রাফি ও আলোক পরিকল্পনার শিল্পীদের অবদানও স্মরণ করেছেন তিনি।
মঞ্চ পরিকল্পনায় শাহীনুর রহমান, আলোক পরিকল্পনায় ফয়েজ জহির এবং কোরিওগ্রাফিতে অনিকেত পাল বাবু। পোশাক পরিকল্পনা নির্দেশকের নিজের। মঞ্চ ব্যবস্থাপনায় রয়েছেন কামরুজ্জামান মিল্লাত।
দলের দেওয়া বর্তমান কুশীলব তালিকায় আমিনা চরিত্রে রয়েছেন তিনজন—পল্লবী মাতব্বর, ইন্দ্রাণী ঘটক ও সুকৃতি আজম শ্রেষ্ঠা। নছর চরিত্রে মেহমুদ সিদ্দিকী লেনিন এবং ভোলা সওদাগর চরিত্রে কামরুজ্জামান মিল্লাত। গায়েন হিসেবে রয়েছেন সেলিম মাহবুব ও কামরুজ্জামান মিল্লাত। অন্য চরিত্রের শিল্পীদের মধ্যে আছেন তানিয়া চৌধুরী শিল্পী, রেজাউল আমিন সুজন, ফেরদৌস আমিন বিপ্লব, স্বাধীন শাহ, সজল চৌধুরীসহ অনেকে।
দেশের বিভিন্ন মঞ্চের পাশাপাশি ভারতের ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামাতেও প্রদর্শিত হয়েছে ‘আমিনা সুন্দরী’। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে মহিলা সমিতির নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে হয়েছিল এর ৮০তম প্রদর্শনী। এবার এক শ ছোঁয়ার পালা। দলের জন্য এ এক আনন্দের উপলক্ষ, এটা বললে মোটেও ভুল হবে না।
