শিক্ষার্থী বিক্ষোভে ধ্বংসস্তূপ প্যারিস, দেশজুড়ে লুটপাট, গ্রেপ্তার ১,৮০০!
শিক্ষা সংস্কার, শিক্ষক সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে ফ্রান্সে শুরু হওয়া শিক্ষার্থী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। বিক্ষোভ, সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে বিপর্যস্ত রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহর। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে প্রায় ১ হাজার ৮০০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৫০০ জনেরও বেশি পুলিশ সদস্য, জেন্ডারমেস ও দমকলকর্মী। সহিংসতার পাশাপাশি পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।

রোববার প্যারিসের প্রাণকেন্দ্র প্লেস দ্য লা রিপাবলিক এলাকায় দেখা গেছে ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন। ভাঙা কাচ, ক্ষতিগ্রস্ত দোকানপাট ও পুড়ে যাওয়া স্থাপনা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দীর্ঘ ৭১ বছর ধরে প্যারিসে বসবাস করা রাবাহ নামের এক প্রবীণ নাগরিক বলেন, এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর ভাষ্য, তাঁরা অতীতেও আন্দোলন করেছেন, তবে তা ছিল শান্তিপূর্ণ।
পোড়া একটি পত্রিকার স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে ৫৬ বছর বয়সী ক্লেয়ার বলেন, প্যারিসকে এতটা বিধ্বস্ত দেখতে তাঁর ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। এদিকে ফরাসি প্রজাতন্ত্রের প্রতীক ‘মারিয়ান’-এর মূর্তিতেও দেখা গেছে প্রতিবাদী গ্রাফিতি। সেখানে লেখা ছিল, ‘যারা কষ্ট বোনে, তারা ক্ষোভের ফসল কাটে।’

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক সংকট ও শিক্ষার সুযোগের অভাব নিয়ে ক্ষোভ থেকে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। পরে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি ও সরকারের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। কর্তৃপক্ষের হিসাবে, শনিবার ফ্রান্সজুড়ে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। তবে আন্দোলনকারীদের দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ।

তবে সহিংসতার কারণে আন্দোলনের মূল দাবিগুলো আড়ালে পড়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক বিক্ষোভকারী। প্যারিসে মিছিল শুরুর আগেই পুলিশ টিয়ারগ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ২৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী স্টেফানির দাবি, তাঁদের মিছিল শান্তিপূর্ণ ছিল। কিন্তু সহিংসতার ঘটনাগুলো বেশি গুরুত্ব পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের প্রকৃত ক্ষোভের কারণগুলো আলোচনার বাইরে চলে যাচ্ছে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ জানিয়েছেন, সহিংসতার ঘটনায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাঁদের অর্ধেকই প্যারিস থেকে। সংঘর্ষে ৫০০ জনেরও বেশি পুলিশ সদস্য, জেন্ডারমেস ও দমকলকর্মী আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের শীর্ষ মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকের পর প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জাতির উদ্দেশে বিশেষ ভাষণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

রাজধানীর বাইরেও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মার্সেইতে ব্যাপক লুটপাটের পাশাপাশি নগর ভবনে হামলার ঘটনা ঘটেছে। লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক সিটি হল ভবনে আগুন দেওয়া হয়েছে। বর্দোসহ অন্যান্য শহরেও সরকারি সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
মার্সেইয়ের মেয়র বেনোয়া পায়ান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কিছু দুর্বৃত্তের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের কারণে শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিগুলো গুরুত্ব হারাচ্ছে।

অন্যদিকে, বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলে সমালোচনা করেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। পুলিশের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে ৩৬টি অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়েছে। মানবাধিকার আইনজীবীদের দাবি, সংঘর্ষে এক কিশোরের হাত বিচ্ছিন্ন হয়েছে, একজনের চোয়াল ভেঙেছে এবং অন্য একজন এক চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন।
প্যারিস ইয়ং লয়ার্স ইউনিয়নের সভাপতি ক্রিস্তফ কালভাও বলেন, ভিড় নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কঠোর পদ্ধতি জনসাধারণের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এদিকে, প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর মেয়াদ শেষ হতে প্রায় এক বছর বাকি থাকলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে। বাজেট ঘাটতি কমাতে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকোর্নুর ব্যয়সংকোচন ও করনীতির পরিকল্পনাও জনঅসন্তোষ বাড়িয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যে বামপন্থী নেতা জঁ-লুক মেলেনশঁ সরকারকে ব্যর্থতার জন্য দায়ী করেছেন। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী লেকোর্নু চরমপন্থী দলগুলোর বিরুদ্ধে সহিংসতায় ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।
শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন ফ্রান্সের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, পুলিশের ভূমিকা এবং সরকারের নীতিকে ঘিরে বড় ধরনের সংকটে রূপ নিয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবি পূরণ এবং সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেদিকেই নজর দেশটির মানুষের।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা ও রয়টার্স।
