
‘হেলস উইং’ ছবি : এআই
Published on
:
4 min read
দু’পা নেই। হাত-পা শক্ত করে বাঁধা অবস্থায় মাটিতে পড়ে রয়েছেন এক বন্দি। তাঁর সামনে এগিয়ে আসছেন এক সেনা, হাতে স্টান গান। তার পরে শরীরে ইলেকট্রিক শক। ইজ়রায়েলের অফার জেলের প্রাক্তন বন্দি প্যালেস্তাইনি ইসারের (নাম পরিবর্তিত) অভিযোগ, তাঁর সঙ্গে এমনই আচরণ করা হয়েছিল। ‘দ্য গার্ডিয়ান’ এবং ‘আরব রিপোর্টার্স ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজ়ম’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্দিদের উপর ব্যবহৃত অস্ত্রটি সম্ভবত আমেরিকান সংস্থা অ্যাক্সন এন্টারপ্রাইজ়ের তৈরি স্টান গান।
তবে এই অভিযোগ ঘিরে প্রশ্ন শুধু একটি অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে নয়। ইজ়রায়েলে স্টান গান বা টেজ়ারের ব্যবহার, জেল ও বন্দিশিবিরে নির্যাতনের অভিযোগ, আমেরিকান অস্ত্র প্রস্তুতকারক সংস্থার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলির উদ্বেগ — সব মিলিয়ে সামনে এসেছে এক বিস্তৃত চিত্র। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে প্রকাশিত নথি ও অভিযোগে কী উঠে এসেছে?
দু’পা হারানো বন্দির অভিযোগ কী?
ইসারের বয়স ৪৩ বছর। তাঁর দাবি, ইজ়রায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তিনি দু’টি পা হারিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে গাজ়ার জাবালিয়া শরণার্থী শিবির থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁকে রাখা হয় ইজ়রায়েলের অফার জেলে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে তিনি মুক্তি পান।
ইসারের অভিযোগ, জেলের ‘হেলস উইং’ নামে পরিচিত অংশে নিয়ে যাওয়ার পরে এক সেনা তাঁর দিকে দু’টি রাবার বুলেট ছোড়েন। তিনি মাটিতে পড়ে গেলে তাঁকে শক্ত করে বেঁধে ফেলা হয়। এর পর স্টান গান দিয়ে তাঁকে বার বার শক দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। নির্যাতনের দেড় বছরেরও বেশি সময় পরেও তাঁর শরীরে দাগ রয়ে গিয়েছে বলে জানা যায় বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে। ‘ইন্টারন্যাশনাল রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল ফর টর্চার ভিক্টিমস’-এর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দাগগুলি জোড়ায় জোড়ায় এবং পরস্পরের কাছাকাছি। তবে শুধু দাগের ধরন থেকে নির্যাতনের সম্পূর্ণ ঘটনা বা ব্যবহৃত অস্ত্রের নির্দিষ্ট মডেল নিশ্চিত করা যায় না।
আরও তিন প্রাক্তন বন্দির একই অভিযোগ
বিভিন্ন আন্তর্জার্তিক প্রতিবেদনে আরও তিন জন প্রাক্তন বন্দির বক্তব্য উঠে এসেছে। তাঁদের অভিযোগ, ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তাঁদের উপরও টেজ়ার ব্যবহার করা হয়েছিল।
এক প্রাক্তন বন্দির দাবি, শক দেওয়ার আগে তাঁর গায়ে জল ঢালা হয়। এর পর থেকে তাঁর দৃষ্টিশক্তির গুরুতর সমস্যা দেখা দিয়েছে, শরীরে খিঁচুনি হচ্ছে এবং বার বার জ্ঞান হারাচ্ছেন বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন। ইজ়রায়েলি জেল কর্তৃপক্ষের তৈরি দু’টি ভিডিয়ো ক্লিপে এমন একটি অস্ত্র দেখা গিয়েছে, যা দেখতে অ্যাক্সনের এন্টারপ্রাইজ়ের তৈরি টেজ়ারের মতো বলে দাবি বিশেষজ্ঞদের। চার প্রাক্তন বন্দির বক্তব্যেও একই ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
অ্যাক্সন এন্টারপ্রাইজ়ের সঙ্গে ইজ়রায়েলের সম্পর্ক
বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অ্যাক্সন এন্টারপ্রাইজ় তাদের পণ্যের বিতরণকারী হিসেবে ইজ়রায়েলি সংস্থা গোরেন-কিডন গ্রুপকে তালিকাভুক্ত করে। ওই সংস্থা টেজ়ার বিক্রি করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের সম্ভাব্য ক্রেতাদের মধ্যে ইজ়রায়েলি পুলিশ, জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রক, প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এবং জেল কর্তৃপক্ষ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
২০২৫ সালের জুনে ইজ়রায়েলে একটি সম্মেলনেরও আয়োজন করে অ্যাক্সন। সেখানে দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলির প্রতিনিধিদের সামনে সংস্থার নতুন টেজ়ার মডেল প্রদর্শন করা হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে।
এক যুগ আগেও টেজ়ার ব্যবহারের নথি
আমেরিকান সংগঠন ‘আমেরিকান ফ্রেন্ডস সার্ভিস কমিটি’ (এএফএসসি)-র তৈরি একটি তথ্যভাণ্ডারে ইজ়রায়েলে টেজ়ার ব্যবহারের দীর্ঘ ইতিহাসের উল্লেখ রয়েছে। সেই তথ্য অনুযায়ী, ইজ়রায়েলি পুলিশ প্রথম দিকে টেজ়ার এম২৬ মডেল ব্যবহার করত। পরে এক্স ২৬পি মডেলের ব্যবহার শুরু হয়। ২০২৩ সালের একটি সরকারি দরপত্রে ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ইজ়রায়েলি পুলিশের প্রায় ১,৮০০টি এক্স২৬পি টেজ়ার কেনার তথ্য রয়েছে বলে এএফএসসি দাবি করেছে। দরপত্রে নির্বাচিত সংস্থা এম.আর. হান্টারকে ইজ়রায়েলে টেজ়ারের অনুমোদিত বিক্রেতা হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে।
এএফএসসি-র তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে মাভি মারমারা জাহাজে ইজ়রায়েলি অভিযানের সময় টেজ়ার ব্যবহারের নথিরও উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ, সাম্প্রতিক জেল-সংক্রান্ত অভিযোগের বহু বছর আগে থেকেই ইজ়রায়েলে এই ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।
সদে তেইমান থেকে গিলবোয়া: নির্যাতনের অভিযোগ
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ইজ়রায়েলের সদে তেইমান বন্দিশিবিরে এক প্যালেস্তাইনি বন্দির উপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগে পাঁচ ইজ়রায়েলি সেনার বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপের ঘটনা সামনে আসে। পরবর্তী তদন্ত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে ওই ঘটনায় টেজ়ার ব্যবহারের উল্লেখ করা হয়। বন্দিকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়।
২০২৫ সালের অগস্টে ‘প্যালেস্তাইনি কমিশন অফ ডিটেনিজ অ্যান্ড এক্স-ডিটেনিজ অ্যাফেয়ার্স’ গিলবোয়া জেলে বন্দিদের উপর নির্যাতনের অভিযোগ তোলে। তাদের দাবি, বন্দিদের টেনে নিয়ে গিয়ে শাওয়ারের কাছে জল ঢেলে আবার বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়েছিল।
২০২৫ সালের নভেম্বরে রাষ্ট্রপুঞ্জের ‘কমিটি অ্যাগেনস্ট টর্চার’ ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পরে ইজ়রায়েলি হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ বেড়ে যাওয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। কমিটির উদ্বেগের তালিকায় যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ এবং যৌনাঙ্গ ও পায়ুতে বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার অভিযোগও ছিল।
গাজ়া ফ্লোটিলার অভিযাত্রীদের অভিযোগ
বন্দিদের উপর বৈদ্যুতিক শক ব্যবহারের অভিযোগ শুধু জেলেই সীমাবদ্ধ নয়। গাজ়ার অবরোধ ভাঙার উদ্দেশে সমুদ্রপথে যাত্রা করা ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’-র অভিযাত্রীদের কয়েক জনও ইজ়রায়েলি হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর প্রতিবেদনে এই অভিযোগগুলি উঠে এসেছে। অভিযাত্রীদের মধ্যে কয়েক জনের চিকিৎসার নথিতে পাঁজরের হাড় ভাঙা, মেরুদণ্ডে আঘাত এবং ফুসফুস চুপসে যাওয়ার মতো গুরুতর সমস্যার উল্লেখ রয়েছে বলে জানানো হয়। তিন জন অভিযাত্রীর অভিযোগ, শিপিং কন্টেনারের ভিতরে মারধরের সময় তাঁদের টেজ়ার দিয়ে শক দেওয়া হয়েছিল।
কী বলছে ইজ়রায়েলি সেনা?
ইজ়রায়েলি সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, বন্দিদের উপর নির্যাতন কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। তাঁর কথা অনুযায়ী, ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে বন্দিদের বেঁধে রাখা হতে পারে, তবে তা ইজ়রায়েলি আইন, আন্তর্জাতিক আইন এবং সেনাবাহিনীর নির্দেশিকা মেনেই হওয়ার কথা।
মানবাধিকার সংগঠনগুলির দাবি
বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ জানিয়ে আসছে মানবাধিকার সংগঠনগুলি। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই ধরনের অস্ত্রের ঝুঁকি নিয়ে আগে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাদের দাবি, বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার অস্ত্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের আওতা আরও স্পষ্ট ও শক্তিশালী করা হোক।
‘প্যালেস্তাইনি প্রিজনার্স ক্লাব’-এর আমানি আল-সারহানাহর বক্তব্য অনুযায়ী, ইলেকট্রিক শক বন্দিদের উপর ব্যবহৃত একাধিক অস্ত্রের মধ্যে মাত্র একটি হতে পারে। কোন সংস্থা কোন অস্ত্র সরবরাহ করছে, তার সম্পূর্ণ তথ্য তাঁদের কাছে নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
হেফাজতে মৃত্যু ও জবাবদিহির প্রশ্ন
কয়েকটি ইজ়রায়েলি বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে হেফাজতে ৯২ জন প্যালেস্তাইনির মৃত্যু কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বন্দিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগে বিচার ও জবাবদিহির পরিসর নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অ্যাক্সন এন্টারপ্রাইজ়ের নিজস্ব দাবি, বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশের ১৮ হাজারের বেশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা তাদের টেজ়ার ব্যবহার করে।
বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ জানিয়ে আসছে মানবাধিকার সংগঠনগুলি। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই ধরনের অস্ত্রের ঝুঁকি নিয়ে আগে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাদের দাবি, বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার অস্ত্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের আওতা আরও স্পষ্ট ও শক্তিশালী করা হোক।
‘প্যালেস্তাইনি প্রিজনার্স ক্লাব’-এর আমানি আল-সারহানাহর বক্তব্য অনুযায়ী, ইলেকট্রিক শক বন্দিদের উপর ব্যবহৃত একাধিক অস্ত্রের মধ্যে মাত্র একটি হতে পারে। কোন সংস্থা কোন অস্ত্র সরবরাহ করছে, তার সম্পূর্ণ তথ্য তাঁদের কাছে নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
হেফাজতে মৃত্যু ও জবাবদিহির প্রশ্ন
কয়েকটি ইজ়রায়েলি বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে হেফাজতে ৯২ জন প্যালেস্তাইনির মৃত্যু কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বন্দিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগে বিচার ও জবাবদিহির পরিসর নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অ্যাক্সন এন্টারপ্রাইজ়ের নিজস্ব দাবি, বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশের ১৮ হাজারের বেশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা তাদের টেজ়ার ব্যবহার করে।
