কিছু অপেক্ষার কোনো গন্তব্য থাকে না। তবু মানুষ অপেক্ষা করে।
সুজয়ও করেছিল। প্রায় চার বছর ধরে।
সে জানত, নিতু কোন খাবারটা খেতে পছন্দ করে। জানত, দুপুরের পর মাথাব্যথা করলে সে আলো কমিয়ে কাজ করে। জানত, প্রচণ্ড ব্যস্ততার মধ্যেও সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কয়েক মিনিট বাইরে তাকিয়ে থাকতে ভালোবাসে। এমনকি নিতুর পছন্দের অভিনেতার নতুন সিনেমা দেখানোর ব্যবস্থা করে দিত। ভালোবাসা দিবস, চকলেট দিবস, বন্ধু দিবসগুলোতে সুজয় সব সময় নিতুকে বিভিন্ন ধরনের চকলেট উপহার দিত। জন্মদিনে ঠিক রাত ১২টায় একটা সুন্দর উপহার ও কেক পাঠাত। এসব সুজয়ের জীবনের অংশ হয়ে গিয়েছিল। নিতু অসুস্থ হলে তার ব্যস্ততা বেড়ে যেত। কখনো গরম কফি, কখনো ওষুধ, কখনো নিঃশব্দে ডেস্কের পাশে রাখা ছোট্ট একটা নোট—‘নিজের যত্ন নিয়েন।’
নিতু কখনো জিজ্ঞেস করেনি, এতটা যত্ন কেন নিতে বলছেন?
সুজয়ও কখনো বলেনি কারণ।
এভাবে তিন বছর কেটে গেল। তারপর চার বছর।
প্রতিবারই সুজয় ভেবেছে, আজ বলব। সেই ‘আজ’ আর আসেনি। কখনো অফিসের ব্যস্ততা, কখনো নিতুর মন খারাপ, কখনো নিজের ভয়—সবকিছু মিলিয়ে কথাটা গলার কাছেই আটকে থাকত। সুজয়ের সবচেয়ে বড় ভয় ছিল, কথাটা বলার পর সে যদি দূরে সরে যায়? যদি বন্ধুত্ব নষ্ট হয়! তাকে যদি অবিশ্বাস করা শুরু করে? তাই সে নীরবে ভালোবেসেই সন্তুষ্ট থাকে। কিন্তু মানুষ যতই নিজেকে বোঝাক, হৃদয়েরও তো একটা সীমা আছে।
সেই সীমাটা এসে দাঁড়াল নিতুর ২৮তম জন্মদিনে। সেদিন সকাল থেকেই সুজয়ের ভেতরে অদ্ভুত এক উত্তেজনা। ছোট্ট একটা উপহার কিনেছে। অনেক ভেবেচিন্তে কিনেছে। এমন কিছু, যেটা পছন্দ করবে। উপহারের সঙ্গে একটা ছোট্ট চিঠিও ছিল। চিঠির প্রথম লাইনটা লিখে আবার কেটে দিয়েছে।
আবার লিখেছে। আবার কেটেছে।
শেষ পর্যন্ত মাত্র একটি বাক্য লিখল, ‘চার বছর ধরে একটা কথা বলতে চেয়েছি…’
এরপর আর কিছু লিখতে পারেনি।
প্রতিদিনের মতো সেদিনও সকাল আটটায় অফিসে ঢুকে নিজের ডেস্কে বসেছিল সুজয়। কম্পিউটার চালু করার আগেই তার চোখ চলে গেল পাশের ডেস্কটির দিকে। চেয়ারটি খালি। অথচ সেই খালি চেয়ারটিই যেন প্রতিদিন তার অফিসে আসার অন্যতম কারণ।
নিতু তখনো আসেনি।
সুজয় ঘড়ির দিকে তাকাল।
সকাল ৮টা ১৭। তারপর ৮টা ২৩। ৮টা ২৯।
ঠিক ৮টা ৩১ মিনিটে দরজা ঠেলে নিতু ঢুকল। সুজয়ের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
‘সরি, আজ একটু দেরি হয়ে গেল।’ নিতু ব্যাগটা টেবিলে রেখে হালকা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।
সুজয় মৃদু হেসে বলল, ‘কোনো ব্যাপার না।’
সন্ধ্যায় শহরের একটি রেস্তোরাঁয় টেবিল বুক করল সুজয়। আজ আর কোনো ভয় নয়। আজ বলবেই। নিতুর চোখের দিকে তাকিয়ে বলবে, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি।’
সন্ধ্যা সাতটা।
রেস্তোরাঁর নরম আলোয় সুজয় এসে দেখল, নিতু আগেই বসে আছে। সুজয়কে দেখেই সে হাত নাড়ল।
‘এই যে! এত দেরি করলেন কেন?’
সুজয় হাসল, ‘আমি? আপনিই তো আগেই চলে এসেছেন!’
নিতু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ থেমে গেল। তার মুখে এমন এক রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল, যা দেখে বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল।
‘আজ আপনাকে একটা সারপ্রাইজ দেওয়ার আছে।’
‘আমাকে?’
‘হ্যাঁ। জানেন? আজ আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন।’
সুজয়ের বুকের ভেতর হঠাৎ আশার আলো জ্বলে উঠল। তাহলে কি...নিতু কিছু বুঝতে পেরেছে?
ঠিক তখনই নিতু দরজার দিকে তাকিয়ে হাসল—‘ও এসে গেছে!’
সুজয় অবাক হয়ে ঘুরে তাকাল। রেস্তোরাঁর কাচের দরজা দিয়ে একজন সুদর্শন যুবক ভেতরে ঢুকছে। লম্বা, পরিপাটি পোশাক, আত্মবিশ্বাসী হাসি। যুবকটি সোজা তাদের টেবিলের দিকে এগিয়ে এল। সুজয়ের মনে শঙ্কা জন্ম নিল। নিতু চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। তারপর যুবকটির হাত ধরে সুজয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘ও হলো তানভীর।’
এক মুহূর্ত থেমে নিতু আরও উজ্জ্বল হাসি দিয়ে বলল, ‘আমার বয়ফ্রেন্ড।’
সুজয়ের মনে হলো, কেউ যেন তার চারপাশের পৃথিবীটা এক মুহূর্তে থামিয়ে দিয়েছে।
নিতু তখনো বলে চলেছে, ‘আমরা চার বছর ধরে সম্পর্কে আছি।’
চার বছর!
সুজয়ের মাথার ভেতর শব্দটা বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। ঠিক যত বছর ধরে সে নিতুকে ভালোবাসে।
নিতু বলল, ‘আজ আমরা আমাদের সম্পর্কটা সবার সামনে অফিশিয়ালি জানাতে চেয়েছিলাম। আর আমি চেয়েছিলাম, সবার আগে আপনাকে বলি।’
সুজয় কিছু বলল না। তার চোখ একবার নিতুর দিকে গেল। তারপর তানভীরের দিকে। তারপর টেবিলের নিচে রাখা উপহারের ব্যাগটির দিকে। চার বছর ধরে জমিয়ে রাখা অনুভূতিগুলো যেন মুহূর্তের মধ্যে অর্থহীন হয়ে গেল।
তানভীর হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে দিল।
‘হাই! নিতু আপনার অনেক প্রশংসা করে। বলে, অফিসে আপনি নাকি ওর খুব খেয়াল রাখেন। থ্যাংক ইউ সো মাচ।’
সুজয় হাত বাড়াল। হ্যান্ডশেক করল। তার হাত ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল।
‘হ্যাঁ...কোনো সমস্যা নেই।’
তারপর নিতুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হ্যাপি বার্থডে।’
নিতু হাসছিল। তানভীরের সঙ্গে কথা বলছিল। কেক কাটছিল। ছবি তুলছিল।
আর সুজয়? সে চুপচাপ বসে ছিল। তার সামনে রাখা উপহারের প্যাকেটটি কেউ খুলল না। কেউ জানল না, ওই প্যাকেটের ভেতরে শুধু একটা উপহার ছিল না। ছিল চার বছরের ভালোবাসা। ছিল অসংখ্য না-বলা কথা। ছিল একটা চিঠি। যে চিঠির শুরুটা ছিল—
‘নিতু, চার বছর ধরে একটা কথা বলতে চেয়েছি...’
সেই কথার শেষ আর লেখা হয়নি।
রাত বাড়তে লাগল। একসময় সুজয় উঠে দাঁড়াল। নিতু অবাক হয়ে বলল, ‘এত তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছেন?’
সুজয় মৃদু হাসল।
‘হ্যাঁ। একটু কাজ আছে।’
মিথ্যা বলতে তার কষ্ট হলো। তবু সে হাসল।
রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে সুজয় ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল। পেছনে জন্মদিনের আলো। সামনে অন্ধকার রাস্তা। কয়েক পা যাওয়ার পর সে থেমে গেল। ব্যাগটা খুলল। চিঠিটা বের করল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে চিঠিটা ভাঁজ করে আবার ব্যাগের ভেতর রেখে দিল। ফেলে দিতে পারল না।
সেদিন রাতে প্রথমবার সে বুঝেছিল, সব ভালোবাসার পরিণতি পাওয়া জরুরি নয়। কিছু ভালোবাসা জীবনে আসে কোনো সম্পর্ক হওয়ার জন্য নয়; বরং হৃদয়ের গভীরে একটি স্থায়ী অনুভূতি হয়ে থেকে যাওয়ার জন্য।
দুজনের ভালোবাসা সত্যি ছিল। শুধু তাদের গল্পটা এক ছিল না।
সহকারী শিক্ষক (বিজ্ঞান), বাবুডাইং আলোর পাঠশালা
