ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা। এ উৎসব ঘিরে কক্সবাজারের বৌদ্ধ বিহারগুলোতে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ।
রোববার (২৫ অক্টোবর) বুদ্ধপূজা, শিবলী পূজা, পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণ, কর্মদেশনা, ধ্যান অনুশীলন, প্রার্থনা, হাজারো প্রদীপ প্রজ্বালন ও ফানুস ওড়ানোর আয়োজন করা হয়। সোমবার (২৬ অক্টোবর) প্রবারণা পূর্ণিমার দ্বিতীয় দিনে আকাশে ওড়ানো হবে শত শত রঙবেরঙের ফানুস। ২৬ অক্টোবর রামুতে এবং ২৭ অক্টোবর কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে কল্পজাহাজ ভাসানোর মধ্য দিয়ে এ উৎসব শেষ হবে।
শহরের কেন্দ্রীয় মাহাসাংদোগ্রী বৌদ্ধ বিহারে গিয়ে দেখা যায়, বিকেল থেকে রাখাইন সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ নতুন পোশাক ও উন্নতমানের খাবার নিয়ে বিহারে আসেন। সেখানে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় প্রার্থনা করেন সবাই। এবার শহরের অগ্গমেধা বৌদ্ধ বিহার, পিটাকেট, মোহাজের পাড়া বৌদ্ধ বিহার, জাদিরাং বিহার এবং রাখাইন সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনগুলো নজরকাড়া প্রায় ৫০টি নান্দনিক প্যান্ডেল তৈরি করেছে। প্যান্ডেলগুলোর মূল আকর্ষণ বুদ্ধের প্রতিকৃতি। জমকালোভাবে সাজানো হয়েছে এসব প্যান্ডেল। বিহারগুলোও সেজেছে নতুন রূপে। বর্ণিল আলোকসজ্জায় আলোকিত হয়ে উঠেছে চারপাশ। প্রবারণা ঘিরে বৌদ্ধপল্লির ঘরে ঘরে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ।
শহরের মোহাজের পাড়া, বাজারঘাটা, বৈদ্যঘোনা ও জাদিরাম বৌদ্ধ বিহারসহ মহেশখালী, উখিয়া, চকরিয়া, রামু, পেকুয়া, টেকনাফ ও নাইক্ষ্যংছড়িতেও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রবারণা পূর্ণিমা উদযাপিত হচ্ছে।
উৎসব ঘিরে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে কক্সবাজার শহরের ঐতিহ্যবাহী অগ্গমেধা ক্যাং ও মাহাসিংদ্রোগী বিহার। বিকেল থেকেই বিহার প্রাঙ্গণে ভিড় করছেন পূর্ণার্থী ও দর্শনার্থীরা। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, প্রার্থনা আর উৎসবের আনন্দে মেতে উঠেছেন সবাই। সেখানে একটি বড় ফানুস ওড়াতেও দেখা যায়। ফানুসের আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে চারপাশ। এ সময় উপস্থিত সবাই উল্লাসে মেতে ওঠেন।
কক্সবাজার রাখাইন একতা সংঘের সভাপতি উসেন থোয়েন (উসেনমি বাবু) বলেন, প্রবারণার মূল প্রতিপাদ্য আত্মশুদ্ধি, শুভ, সত্য ও সুন্দরকে বরণ করে অসত্য ও অসুন্দরকে বর্জন করা। তিনি কামনা করেন, মানুষের অন্তর থেকে সব মলিনতা দূর হয়ে অহিংসা, সাম্য, মৈত্রী, প্রেম ও দয়া জাগ্রত হোক।
কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক মং এ খেন বলেন, প্রবারণা উপলক্ষে সব ধর্মের মানুষ বিহারগুলোতে আসছেন। এতে সম্প্রীতির বন্ধন তৈরি হয়েছে। মূলত আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত বৌদ্ধ ভিক্ষুদের তিন মাসের বর্ষাব্রত শেষে এ প্রবারণা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মাসজুড়ে অনুষ্ঠিত হবে কঠিন চীবর দানোৎসব।
বৌদ্ধ ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, সিদ্ধার্থ যখন বোধিসত্ত্ব রূপে শ্রাবস্তী নগর থেকে গৃহত্যাগ করেন, তখন অনুমাদ্ধর্শী নদীর তীরে অবস্থানকালে সংকল্প করে নিজের চুল কেটে ঊর্ধ্বদিকে নিক্ষেপ করেন। সেই চুলগুচ্ছ মহাতাবতিংস স্বর্গের প্যাগোডায় সংরক্ষিত রয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়। এ কারণে চুলামনি প্যাগোডাকে উদ্দেশ্য করে পূজা ও প্রদীপ প্রজ্বালনের জন্য ফানুস ওড়ানো হয়। বৌদ্ধ ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, তথাগত ভগবান বুদ্ধ আড়াই হাজার বছর আগে তাবতিংস স্বর্গে তিন মাস বর্ষাবাস শেষে কার্তিকী পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে মানবজগতে অবতরণ করেন।
