মানবজীবনের সর্বক্ষেত্রে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র আদর্শই একমাত্র নিখুঁত দিকনির্দেশনা। কেবল আত্মিক ও আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক বিষয়ই নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনে মানুষ কীভাবে সুস্থ ও রোগমুক্ত থাকবে—সেই বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাড়ে ১৪শত বছর আগেই এমন কিছু কালজয়ী নীতি ও স্বাস্থ্যবিধি প্রদান করেছেন, যা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগেও অত্যন্ত উপযোগী ও বিজ্ঞানসম্মত।
সম্প্রতি ইসলামী স্কলার শায়খ আহমাদুল্লাহ তার এক গবেষণাধর্মী আলোচনায় (ইউটিউবে প্রকাশিত) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর আলোকে সুস্থ থাকার ১৪টি বিশেষ দিকনির্দেশনা চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। শায়খ আহমাদুল্লাহর সেই আলোচনার ওপর ভিত্তি করে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ১৪টি জীবন রক্ষাকারী সুন্নাহ ও এর বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য নিচে সাজিয়ে তুলে ধরা হলো:
১. মাদক ও ক্ষতিকর দ্রব্য বর্জন
ইসলামে মাদক গ্রহণ ও অন্যায় রক্ত পানকে কঠোরভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। শায়খ আহমাদুল্লাহর আলোচনা অনুযায়ী, মাদক মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করে এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিনষ্ট করে দেয়। মহামারিসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক সংকটকালে দেখা গেছে, যারা মাদক থেকে দূরে থাকে তাদের শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা অন্যান্যদের চেয়ে তুলনামূলক মজবুত থাকে।
২. ‘তাইয়্যেব’ বা ক্ষতিকর নয় এমন হালাল খাদ্য গ্রহণ
কোরআন মাজিদে কেবল ‘হালাল’ নয়, বরং ‘হালালান তাইয়্যেবা’ অর্থাৎ পবিত্র ও স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাফসিরে ইবনে কাছির, কুরতুবী ও তাহরীর ওয়াত তানভীরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী ‘তাইয়্যেব’ হলো এমন খাবার বা পানীয়, যা দুনিয়া ও আখেরাত কোনো স্থানেই মানুষের ক্ষতিকর কারণ হয় না। ফলে যেকোনো স্বাস্থ্যহানিকর খাদ্য বা ক্ষতিকর পানীয় থেকে দূরে থাকা সুন্নাহরই অংশ।
৩. খাওয়ার আগে ভালোভাবে হাত ধোয়া
খাবারের পূর্বে হাত পরিষ্কার করে ধোয়া ফুকাহায়ে কেরামের মতে একটি সুন্নাহসম্মত ও মুস্তাহাব আমল। সাড়ে ১৪শত বছর আগে আরবের মরুময় পরিবেশে পানির চরম সংকট থাকা সত্ত্বেও রাসুলুল্লাহ (সা.) হাত ধুয়ে খাওয়ার এ স্বাস্থ্যবিধি শিক্ষা দিয়েছেন, যা আধুনিক জীবাণুবিজ্ঞান ও পরিচ্ছন্নতার অন্যতম ভিত্তি।
৪. পরিমিত আহার গ্রহণ (১/৩ নীতি)
রাসুলুল্লাহ (সা.) অতিরিক্ত আহার করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন এবং পেটকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট পাত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সুন্নাহ অনুযায়ী পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং বাকি এক-তৃতীয়াংশ খালি রাখা উচিত। আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানও এ ধরনের পরিমিত খাদ্যাভ্যাস এবং ফলমূল ও শাকসবজিজাতীয় হালকা খাবারের পক্ষে পরামর্শ দেয়।
৫. পাত্রের মধ্যে নিঃশ্বাস না ফেলা
খাবার বা পানীয়ের পাত্রে নিঃশ্বাস ফেলা থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। সহিহ বোখারির হাদিস অনুযায়ী পানীয় গ্রহণের সময় পাত্রে শ্বাস ফেলা অনুচিত, কারণ এর মাধ্যমে বাতাসে থাকা জীবাণু বা কার্বন ডাই-অক্সাইড খাবারে মিশে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
৬. খাবার বা পানীয়তে ফু না দেওয়া
গরম খাবার বা পানীয় ঠান্ডা করার জন্য মুখ দিয়ে ফু দেওয়া রাসুলুল্লাহ (সা.) নিষেধ করেছেন। কোনো পাত্রে সামান্য ময়লা পড়লে ফু না দিয়ে পাত্রটি কাত করে ময়লাটুকু ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে মুখের বাতাসের মাধ্যমে খাবারে ব্যাকটেরিয়া সংক্রামিত হতে পারে।
৭. বসে পানাহার করা
দাঁড়িয়ে খাওয়া বা পান করার চেয়ে বসে পানাহার করা সুন্নাহসম্মত। দাঁড়িয়ে পানাহার করলে শ্বাসযন্ত্র বা পরিপাকতন্ত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা বা অস্বস্তি তৈরি হতে পারে, যা বসে নিয়ম মেনে খেলে দূর হয়।
৮. অতিরিক্ত গরম খাবার না খাওয়া
রাসুলুল্লাহ (সা.) অতিরিক্ত গরম খাবার বা পানীয় গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। খাবার স্বাভাবিক ও সহনীয় তাপমাত্রায় এলে তা গ্রহণ করা সুন্নাহসম্মত, যা পাকস্থলী ও খাদ্যনালীর সুরক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর।
৯. বড় পাত্রের মুখে সরাসরি মুখ দিয়ে পানি না খাওয়া
জগ, কলসি বা বড় কোনো পাত্রের মুখে সরাসরি মুখ লাগিয়ে পানি পান করতে রাসুলুল্লাহ (সা.) বারণ করেছেন। এর ফলে হঠাৎ অতিরিক্ত পানি গলায় গিয়ে বিপত্তি ঘটতে পারে কিংবা পুরো পাত্রের পানি দূষিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
১০. তিন ঢোকে থেমে থেমে পানি পান করা
এক টানে পুরো এক গ্লাস বা বোতল পানি পান না করে কমপক্ষে তিন ঢোকে থেমে থেমে পান করা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ। এটি হৃদযন্ত্র ও পরিপাকতন্ত্রের ওপর হঠাৎ অতিরিক্ত চাপ পড়া থেকে শরীরকে রক্ষা করে।
১১. নিয়মিত রোজা বা ফাস্টিং পালন করা
রাসুলুল্লাহ (সা.) সপ্তাহে দুই দিন (সোমবার ও বৃহস্পতিবার) এবং প্রতি হিজরী মাসে তিন দিন (আইয়ামে বীজ) রোজা রাখার শিক্ষা দিয়েছেন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও স্বীকার করেছে যে, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বা নির্দিষ্ট সময় উপবাস থাকা শরীরের স্টমাক ও কোষের পুনর্গঠনে চমৎকার ভূমিকা পালন করে।
১২. রাতে দ্রুত ঘুমানো ও ভোরে ওঠা
রাসুলুল্লাহ (সা.) এশার সালাতের পূর্বে ঘুমানো এবং এশার পর অনর্থক গল্পগুজব বা আড্ডা দেওয়া অপছন্দ করতেন। রাতের প্রথম প্রহরে ঘুমিয়ে পড়া শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করে। একই সাথে ভোরে সূর্য ওঠার আগেই ঘুম থেকে উঠে কাজ শুরু করা এবং দুপুরে অল্প বিশ্রাম নেওয়া (কাইলুলা) স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
১৩. সালাতে রুকু ও সেজদা ধীরস্থিরভাবে আদায় করা
রাসুলুল্লাহ (সা.) সালাতে অত্যন্ত খুশু-খুজুর সাথে সময় নিয়ে রুকু ও সেজদা আদায় করতেন। সময় নিয়ে সুন্নাহসম্মতভাবে রুকু ও সেজদা করলে শরীরের প্রতিটি জোড়া ও পেশির উত্তম ব্যায়াম সম্পন্ন হয়, যা শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখতে দারুণ সহায়ক।
১৪. রোগ প্রতিরোধের জন্য আগাম সুন্নাহসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ
অসুখ হওয়ার পূর্বেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) আজওয়া খেজুর (সকালে ৭টি), কালোজিরা ও মধু সেবনের পরামর্শ দিয়েছেন।
শায়খ আহমাদুল্লাহর মতে, রোগাক্রান্ত হওয়ার আগেই শরীরের সুরক্ষা নিশ্চিত করার এই সুন্নাহ থেকেই মূলত আধুনিক টিকাদান ও প্রিভেন্টিভ মেডিসিনের মূল ধারণা লাভ করা যায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের কেবল সুস্থ থাকার জীবনমুখী গাইডলাইনই দেননি, বরং এর পাশাপাশি কোনো কারণে অসুস্থ হয়ে পড়লে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণের স্পষ্ট নির্দেশও দিয়েছেন। কারণ আল্লাহ তাআলা এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি যার প্রতিষেধক বা নিরাময় তিনি পৃথিবীতে রাখেননি। আমরা যদি আমাদের দৈনিক জীবনযাত্রায় নবীজি (সা.)-এর এই ১৪টি সুন্নাহ বাস্তবায়ন করি, তবে একদিকে যেমন শারীরিক সুস্থতা অর্জিত হবে, অন্যদিকে প্রতিটি পদক্ষেপে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ ও ইবাদতের সাওয়াব হাসিল হবে।
