হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের দেওয়া সাতটি শর্তের কয়েকটি যুক্তরাষ্ট্র মেনে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি। তবে ওয়াশিংটনের জবাব এখনও ‘অপর্যাপ্ত’ বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। তেহরানের দাবি পূরণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেও ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এদিকে
যুদ্ধ আবার শুরু হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন তথ্যকেন্দ্র, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই স্থাপনা এবং যোগাযোগের তারে হামলার হুমকি দিয়েছে তেহরান।
হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনার মধ্যেই সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আবারও হামলা হয়েছে। সবশেষ রবিবারের এ হামলায় অন্তত একজন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন। বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৪-এ একটি অজ্ঞাত বস্তু আঘাত হানার পর আগুন ধরে যায়। পরে বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত রাখার সময় বাড়িয়েছে দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।
এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে সংলাপ আয়োজনে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। রিয়াদের ওপর ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা এবং ইয়েমেনে নতুন করে বিমান হামলা আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে তৃতীয় একটি তেলবাহী সুপার ট্যাংকার সামুদ্রিক মাইনে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার দাবি করেছে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।
ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে তেহরানের সাতটি শর্তের কয়েকটি যুক্তরাষ্ট্র গ্রহণ করেছে। তবে মার্কিন পক্ষের প্রতিক্রিয়া এখনও ইরানের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করা এবং ইরানের দাবিগুলো পূরণ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভিতে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে রেজায়ি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনীতি, হরমুজ প্রণালি এবং যুদ্ধ আবার শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রযুক্তি অবকাঠামোয় হামলার বিষয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও হরমুজ প্রণালির আশপাশে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত ব্যয়বহুল সম্পদ রয়েছে। এসব স্থাপনাকে এখনও ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তবে যুদ্ধ শুরু হলে ওই অঞ্চলের অনেক যোগাযোগের তার, তথ্যকেন্দ্র, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্থাপনা এবং অন্যান্য অবকাঠামো ধ্বংস করা হবে।
ইরানের নৌবাহিনীর উপপ্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল ফারামার্জ বেমানি যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে ভুল হিসাব না করার সতর্কবার্তা দিয়েছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আবার কোনো ভুল হিসাব করলে ইরানের নৌবাহিনী এমনভাবে জবাব দেবে, যাতে মার্কিন বাহিনী আগের চেয়েও আরও দূরে সরে যেতে বাধ্য হয়। তিনি জানান, শত্রুপক্ষের দুর্বলতাগুলো পরীক্ষা ও পর্যালোচনা করার পর ইরান নতুন অস্ত্র তৈরিতে কাজ করছে। প্রতিপক্ষ নতুন কৌশল গ্রহণ করায় ইরানও নতুন কৌশল নিচ্ছে।
হরমুজ প্রণালিতে গত ২৪ ঘণ্টায় তৃতীয় একটি তেলবাহী সুপার ট্যাংকার সামুদ্রিক মাইনে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে বলে দাবি করেছে আইআরজিসি। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত আইআরজিসির নৌবাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অনুমোদনহীন পথে চলাচলকারী জাহাজটি সোমবার সকালে আঘাতপ্রাপ্ত হয়।
সৌদি আরবের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রবিবার নতুন করে হামলায় অন্তত একজন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন। হুথিসংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম ইয়েমেনের রাজধানী সানায় বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণাধীন বিমানবন্দরে বিমান হামলার খবর প্রকাশ করার কয়েক ঘণ্টা পর রিয়াদে এ হামলার ঘটনা ঘটে। এর আগে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের একটি হামলায় ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়। সর্বশেষ হামলার পর সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের মেয়াদ বাড়িয়েছে। বিমানবন্দরের অবকাঠামোর নিরাপত্তা যাচাই এবং পরিচালনাগত প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে এক্সে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। তবে বিমানবন্দরের কার্যক্রম কখন আবার চালু হবে, তা জানানো হয়নি।
সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে সংলাপ সহজ করতে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। রবিবার সন্ধ্যায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। এ সময় তিনি সংলাপ আয়োজন এবং রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছানোর প্রচেষ্টায় তেহরানের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার প্রস্তুতির কথা জানান।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী আঞ্চলিক পরিস্থিতির সর্বশেষ অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। আরাগচি ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সামরিক পদক্ষেপের ওপর নির্ভরতা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। অঞ্চলের সংকট সামরিক উপায়ে সমাধান করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি রাজনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও রবিবার দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ফোনালাপের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়, আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং তা মোকাবিলার প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে সম্ভাব্য কূটনৈতিক উদ্যোগ কিংবা কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এবং ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী হুথিদের অবস্থান লক্ষ্য করে নতুন করে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। সানা, তাইজ এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশের এলাকায় এসব অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
হুথি নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের দাবি, সোমবার মধ্যরাতের দিকে ইয়েমেনের রাজধানী সানার দুটি এলাকায় বিমান হামলা চালানো হয়। সানার হামদান ও সাওরাহ জেলায় হামলার কথা জানিয়ে এর জন্য সৌদি আরবকে দায়ী করেছে গোষ্ঠীটি। তবে হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত জানানো হয়নি।
হুথিসংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সানার বিমানবন্দর সড়কসংলগ্ন সাওরাহ এলাকা ও হামদান জেলায় হামলা চালানো হয়েছে। এতে সম্পদের উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হলেও সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি।
তাইজ প্রদেশের আল-তুরবাহ শহরে একটি আবাসিক ভবনেও সৌদি বিমান হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে হুথি নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম। ওই হামলায় ভবন ও আশপাশের সম্পদের ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এসব হামলার বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
