কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সেন্সর, ক্যামেরা ও রোবোটিক্স প্রযুক্তির সমন্বয়ে স্মার্ট কৃষি-রোবট উদ্ভাবন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন তরুণ উদ্ভাবক মো. হাসিবুর রহমান খান। চলতি বছর মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত পরিবেশ বিজ্ঞান ও টেকসই প্রযুক্তিবিষয়ক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি একাধিক পুরস্কার অর্জন করেন তিনি।
হাসিবুর খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তার বাড়ি মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার রৌহাদহ গ্রামে।
হাসিবুরের উদ্ভাবিত কৃষি রোবট জমির মাটির গুণাগুণ ও আর্দ্রতা পরীক্ষা, ফসলের রোগ ও ক্ষতিকর আগাছা শনাক্ত এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সার ও পানি ব্যবহারে কৃষককে সহায়তা করতে পারে। প্রযুক্তিনির্ভর এ উদ্ভাবন কৃষিকাজে সময় ও খরচ কমানোর পাশাপাশি সার ও পানির অপচয় রোধে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
হাসিবুরের তৈরি রোবট জমিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলাচল করে মাটির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও আর্দ্রতার তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। মাটিতে কোন উপাদানের ঘাটতি রয়েছে, তা বিশ্লেষণ করে কৃষককে প্রয়োজনীয় তথ্যও জানায়। পরীক্ষামূলক ব্যবহারে মাটিতে নাইট্রোজেন ও পটাশিয়ামের মাত্রা কম এবং ফসফরাসের মাত্রাও শনাক্ত করে রোবটটি। পরে মুঠোফোনের পর্দায় সার ব্যবহারের প্রয়োজনিয়তা ও মাত্রা প্রদর্শন করে।
এ ছাড়া রোবটটিতে যুক্ত এআই ক্যামেরা ফসলের পাতা ও উদ্ভিদের ছবি বিশ্লেষণ করে রোগাক্রান্ত অংশ এবং ক্ষতিকর আগাছা শনাক্ত করতে পারে। ফলে এর ব্যবহারে মাটির প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমিত সার ও পানি প্রয়োগের ব্যবস্থা থাকায় কৃষক অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর সুযোগ পাবেন।
ওয়াইফাই কিংবা ব্লুটুথের মাধ্যমে রোবটটি মুঠোফোনের সঙ্গে সংযুক্ত করা যায়। ফলে কৃষক দূর থেকেই মাটির তথ্য পর্যবেক্ষণ এবং রোবটের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। প্রযুক্তিটি আরও উন্নত করে বাস্তব কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহার করা গেলে আধুনিক ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
নিজের আন্তর্জাতিক অর্জন সম্পর্কে হাসিবুর রহমান খান জানান, মালয়েশিয়ার সাইবারজায়ায় মাল্টিমিডিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড সাসটেইনেবল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট গোলস ২০২৬’ প্রতিযোগিতায় অংশ নেন তিনি। সেখানে ‘এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি’ বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হন। প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের উদ্ভাবকেরা অংশ নেন। নিজের উদ্ভাবিত কৃষি রোবটের জন্য তিনি প্লাটিনাম উইনার বা চ্যাম্পিয়ন অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন। এ ছাড়া সব বিভাগ মিলিয়ে সামগ্রিকভাবে দ্বিতীয় স্থান, পরিবেশবিষয়ক বিশেষ সম্মাননা ও স্বর্ণপদক লাভ করেন তিনি।
হাসিবুর বলেন, “আন্তর্জাতিক এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে আমি আনন্দিত। কৃষির বিভিন্ন সমস্যা প্রযুক্তির মাধ্যমে সমাধানের চিন্তা থেকেই রোবটটি তৈরি করেছি। ভবিষ্যতে এটিকে আরও উন্নত করে দেশের কৃষকদের সহযোগিতায় কাজে লাগাতে চাই।”
হাসিবুরের বাবা আব্দুল ওয়াহাব খান বলেন, “মালয়েশিয়ায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ছেলে প্রথম স্থান অধিকার করায় আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। ছোটবেলা থেকেই নতুন কিছু তৈরির প্রতি ওর তীব্র আগ্রহ ছিল। যেকোনো সমস্যার সহজ ও প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান খুঁজতে ভালোবাসত হাসিবুর। আজ তার এই অর্জনে আমরা আনন্দিত।”
মানিকগঞ্জ কৃষি উন্নয়ন কমিটির সমন্বয়কারী নজরুল ইসলাম বলেন, “কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে উৎপাদন ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তরুণদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি এসব প্রযুক্তি যেন সাধারণ কৃষকের নাগালের মধ্যে থাকে, সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। উদ্ভাবিত রোবটটি মাঠপর্যায়ে কার্যকর প্রমাণিত হলে কৃষকের সময়, শ্রম ও উৎপাদন খরচ কমাতে সম্ভাবনাময় ভূমিকা রাখবে।’’
প্রয়োজনীয় গবেষণা, কারিগরি সহায়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা পাওয়া গেলে হাসিবুরের এই উদ্যোগ দেশের কৃষিতে স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন নজরুল ইসলাম।
মানিকগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহজাহান সিরাজ বলেন, “কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো সময়ের দাবি। মাটির গুণাগুণ নির্ণয়, ফসলের রোগ শনাক্ত এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সার ও পানি ব্যবহারে এ ধরনের উদ্ভাবন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সফলভাবে প্রয়োগ করা গেলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো এবং সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এটি সহায়ক হতে পারে।”
