Published on
:
2 min read
এই সময়: দুর্গাপুজো মানেই শুধু আলোকসজ্জা, প্রতিমা কিংবা প্যান্ডেলের সৌন্দর্য নয়। দুর্গাপুজো মানে শিল্পের মাধ্যমে সমাজকে দেখা, সময়ের সঙ্গে কথা বলা এবং মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তোলা। আর এই ভাবনাকে এক অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে বোসপুকুর শীতলা মন্দির দুর্গোৎসব কমিটি।
প্রতি বছর বোসপুকুর শীতল মন্দিরের এই পুজো শৈল্পিকভাষায় সমাজসচেতনতার বার্তা দিয়ে আসছে। কখনও পরিত্যক্ত উপকরণে, কখনও লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য হয়েছে সৃষ্টির অনুপ্রেরণা, আবার কখনও মানুষের জীবন, সমাজের সংকট ও পৃথিবীর ভবিষ্যৎ হয়ে উঠেছে শিল্পের মূল উপজীব্য। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে বোসপুকুর দুর্গাপুজোর বাংলা তথা বিশ্বমঞ্চে এক স্বতন্ত্র পরিচিতি হয়ে উঠেছে। ১৯৯৮–এ 'টাইলস' ভাবনায় এশিয়ান পেইন্টস পুরস্কার থেকে শুরু হয় এক উজ্জ্বল অধ্যায়। ১৯৯৯–এ 'এপার বাংলা ওপার বাংলা', ২০০০–এ 'তাসের দেশ', আর ২০০১ এর 'ভারের প্যান্ডেল'—প্রতিটি ভাবনাই শিল্পের প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। বিশেষত ২০০১–এর 'ভারের প্যান্ডেল' বোসপুকুরের শিল্পযাত্রাকে এক বিশেষ পরিচিতি ও স্বীকৃতির স্তরে পৌঁছে দেয়।
এ বছরের থিম 'চুপ'–এ শিল্পী বলতে চেয়েছেন, আমরা এক পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে পরিবেশদূষণ নিয়ে আলোচনা হয়, বৃক্ষনিধনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়, নদী বাঁচানোর আন্দোলন হয়, পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। কিন্তু পৃথিবীর বুকে যখন যুদ্ধের আগুন জ্বলে ওঠে, ক্ষমতা ও আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে একের পর এক জনপদ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়, তখন সেই ধ্বংসলীলার পরিবেশগত পরিণতি নিয়ে আলোচনা কি যথেষ্ট? রাষ্ট্রের ক্ষমতা, ভূখণ্ডের অধিকার, রাজনৈতিক আধিপত্য এবং সামরিক শক্তির প্রদর্শন—এই সমস্ত কিছুর সংঘাতে আজও অসংখ্য নিরীহ মানুষ হারাচ্ছেন তাঁদের ঘর, পরিবার, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ। আকাশে ধোঁয়া, মাটিতে বারুদের গন্ধ, ধ্বংস হয়ে যাওয়া বনভূমি, দূষিত জল, বিষাক্ত বায়ু এবং ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়া প্রাণ—যুদ্ধের এই ছবিগুলি শুধু মানবসভ্যতার ক্ষত নয়, প্রকৃতির বুকেও রেখে যায় গভীর ক্ষতচিহ্ন।
আমরা ভুলে যাচ্ছি, প্রকৃতির নিজস্ব এক শক্তি রয়েছে। মানুষ তার প্রযুক্তি, অস্ত্র ও সামরিক ক্ষমতা নিয়ে যতই গর্ব করুক না কেন, প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হলে সেই শক্তির অহংকারও একদিন অর্থহীন হয়ে পড়ে। প্রকৃতি কোনও রাজনৈতিক সীমানা মানে না, কোনও ক্ষমতার দম্ভের কাছে মাথা নত করে না। পৃথিবী অসুস্থ হলে কোনও জাতিই সম্পূর্ণ সুস্থ থাকতে পারে না। 'চুপ' মানে কি শুধুই নীরব থাকা? নাকি এই নীরবতার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে অসংখ্য প্রশ্ন, অগণিত আর্তনাদ এবং এক গভীর প্রতিবাদ? আজ নতুন কোনও অস্ত্র নয়, সবচেয়ে বেশি নতুন করে জেগে ওঠার বিবেক প্রয়োজন। এমন এক পৃথিবীর প্রয়োজন, যেখানে ক্ষমতার প্রতিযোগিতার চেয়ে শান্তির মূল্য বেশি, আধিপত্যের চেয়ে সহাবস্থানের গুরুত্ব বেশি এবং ধ্বংসের চেয়ে সৃষ্টির আনন্দ অনেক বড়। ৭৭তম বর্ষের এই গভীর উপলব্ধির বার্তা এই পুজোয়।
