চার বছর ধরে নিখোঁজ ছিলেন মা। থানায় জিডি, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন, পোস্টার ছাপিয়ে নানা স্থানে খোঁজ-কোনো চেষ্টাই বাদ রাখেননি সন্তানেরা। একপর্যায়ে মাকে ফিরে পাওয়ার আশাও প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলেন তাঁরা।
অবশেষে জামালপুর সদর থানার পুলিশের আন্তরিক প্রচেষ্টায় দীর্ঘ চার বছর পর মায়ের দেখা পেলেন দুই সন্তান। আবেগঘন এই পুনর্মিলনে মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন জামালপুর সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. নাজমুস সাকিব।
ফিরে পাওয়া ওই মায়ের নাম আছিয়া (৫০)। তিনি নওগাঁ জেলার সাপাহার থানার চাচাহার গ্রামের জয়নাল আবেদীনের মেয়ে এবং নুরুল ইসলামের স্ত্রী। গত ১০ অক্টোবর জামালপুর শহরের জেলখানা এলাকার সামনে থেকে স্থানীয়দের সহায়তায় তাঁকে উদ্ধার করে থানায় নেওয়া হয়। সোমবার (১২ অক্টোবর) আছিয়ার পরিচয় শনাক্ত হওয়ার এবং তাঁকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন ওসি নাজমুস সাকিব।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আছিয়া বাক্প্রতিবন্ধী হওয়ায় নিজের পরিচয় স্পষ্টভাবে জানাতে পারছিলেন না। আকার-ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করলেও তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছিল না। এ অবস্থায় অসহায় ওই নারীর নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন ওসি। তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা না হওয়ায় তিনি বিকল্প উপায়ে তাঁর পরিচয় শনাক্তের উদ্যোগ নেন।
পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সহযোগিতায় আছিয়ার আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে তাঁর পরিচয় ও ঠিকানা পাওয়া গেলে পুলিশ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
মায়ের সন্ধান পাওয়ার খবর শুনে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না সন্তানেরা। দীর্ঘদিন ধরে খুঁজেও যাঁর সন্ধান পাননি, সেই মা জীবিত অবস্থায় ফিরে আসছেন-এ যেন তাঁদের কাছে অবিশ্বাস্য সংবাদ। পরে ১১ অক্টোবর আছিয়ার ছেলে রাশেদুল ও মাশেদুল জামালপুর সদর থানায় ছুটে আসেন। দীর্ঘ চার বছরের বিচ্ছেদ শেষে মা-সন্তানের মিলনে সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশ। আনন্দ, কান্না আর স্বস্তিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ।
প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ যাচাই শেষে আছিয়াকে তাঁর সন্তানদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
সোমবার দুপুরে মুঠোফোনে আছিয়ার ছেলে মাশেদুল জানান, প্রায় চার বছর আগে তাঁর মা ঢাকা যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন। এরপর থেকে তাঁর আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। মায়ের খোঁজে তাঁরা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেন এবং পোস্টার ছাপিয়ে বিভিন্ন স্থানে খোঁজ চালান। তবু মায়ের সন্ধান মেলেনি। একপর্যায়ে তাঁরা আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। এমন সময় জামালপুর সদর থানার ওসি নাজমুস সাকিবের ফোন পেয়ে প্রথমে তাঁরা বিষয়টি বিশ্বাস করতে পারেননি। পরে থানায় এসে মাকে দেখে তাঁদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটে।
এই মানবিক ঘটনার আরেকটি দিকও মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছে। জানা যায়, সম্প্রতি ওসি নাজমুস সাকিবের সন্তান জন্মের পর ভারতের একটি হাসপাতালে মারা যায়। ব্যক্তিগত জীবনের এমন গভীর শোকের মধ্যেও তিনি অন্য একটি পরিবারের হারিয়ে যাওয়া মাকে ফিরিয়ে দিতে আন্তরিকভাবে কাজ করেছেন। আছিয়াকে সন্তানদের হাতে তুলে দেওয়ার পর তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং কান্নায় ভেঙে পড়েন বলে জানা গেছে।
একদিকে নিজের সন্তান হারানোর বেদনা, অন্যদিকে চার বছর পর এক মাকে তাঁর সন্তানদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার তৃপ্তি-দুই বিপরীত আবেগের এই মুহূর্ত মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
ওসি নাজমুস সাকিব বলেন, “জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে মানবিক কাজের আনন্দ পাওয়ার সুযোগ থাকলে জীবনের সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায়। বর্তমানে মানবিক মানুষের বড় প্রয়োজন। যে পেশায়ই থাকুন না কেন, সবার মানবিক মানুষ হয়ে ওঠা উচিত।” এ সময় তিনি তাঁর সন্তানের জন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করেন।
এদিকে আছিয়ার মতো পরিচয়হীন, হারিয়ে যাওয়া ও অসহায় বয়স্ক মানুষকে উদ্ধারের পর তাঁদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে পুলিশকে অনেক সময় সমস্যায় পড়তে হয়। তাই এসব মানুষের সাময়িক নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য সরকারিভাবে বিশেষ আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলা জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকেরা।
চার বছর পর আছিয়ার ঘরে ফেরা শুধু একটি পরিবারের পুনর্মিলনের গল্প নয়; এটি মানবিক দায়িত্ববোধ, আন্তরিকতা ও মানুষের প্রতি ভালোবাসারও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দায়িত্বশীল একজন মানুষের আন্তরিক উদ্যোগ যে একটি পরিবারের জীবনে কত বড় আনন্দ ফিরিয়ে দিতে পারে, আছিয়ার ফিরে আসা তারই প্রমাণ।
বিআলো/শিলি