Published on
:
4 min read
রঞ্জি ট্রফিতে (Ranji Trophy) ইতিহাস গড়েছেন মিজোরামের (Mizoram) চিন্ময় সুতার (Chinmay Sutar)। ২৯ বছরের এই ব্যাটার অপরাজিত ৪০০ রান করে প্রতিযোগিতার ৯২ বছরের ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয় ক্রিকেটার হিসেবে এক ইনিংসে ৪০০ রানের নজির গড়েছেন। এর আগে ১৯৪৮-৪৯ মরশুমে মহারাষ্ট্রের হয়ে কাথিয়াওয়াড়ের বিরুদ্ধে অপরাজিত ৪৪৩ রান করেছিলেন বিবি নিম্বলকর। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও ব্রায়ান লারার ২০০৪ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে অপরাজিত ৪০০ রানের পর এই প্রথম কোনও ব্যাটার এক ইনিংসে ৪০০ রান করলেন। তবে চিন্ময়ের এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষা, বারবার উপেক্ষিত হওয়ার যন্ত্রণা এবং শেষ পর্যন্ত নতুন দলের হয়ে নিজেকে প্রমাণ করার কাহিনি।
শতরানের স্বস্তি থেকে ৪০০, দলের প্রয়োজনে ব্যাটিং
চিন্ময়ের ইনিংসের শুরুটা হয়েছিল নিজের প্রথম শতরান করার তাগিদ নিয়ে। লাল বলের ক্রিকেটে এর আগে কখনও শতরান করতে পারেননি তিনি। আগের ম্যাচে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেকেই ৯৯ রানে আউট হয়েছিলেন। তাই এ বার শতরানে পৌঁছনোই ছিল তাঁর প্রথম লক্ষ্য। শুরুতে বল সুইং করছিল। প্রথম এক ঘণ্টা সাবধানে কাটানোর পর ধীরে ধীরে নিজের ছন্দ খুঁজে পান চিন্ময়। একের পর এক উইকেট পড়লেও অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে রান করে যেতে থাকেন তিনি। শতরান করার পর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। তবে ২০০, ২৫০ কিংবা ৩০০ রানের কথা ভেবে ব্যাট করেননি চিন্ময়। বরং দলের জন্য যত বেশি সম্ভব রান তোলাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। তৃতীয় দিনের সকালে ২০০ রানে পৌঁছনোর সময় মিজোরামের সাত উইকেট পড়ে গিয়েছিল। এর পর ছয় নম্বরে ব্যাট করতে নামা জেহু অ্যান্ডারসনের সঙ্গে ১৬৮ রানের জুটি গড়েন তিনি। কিন্তু সেই জুটি ভাঙার পর আবারও চাপে পড়ে যায় মিজোরাম।
ইন্ডিয়া টুডে-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চিন্ময় বলেন, ‘১০০ রানে পৌঁছনোর পর সব থেকে বেশি স্বস্তি পেয়েছিলাম। আগের ম্যাচে ৯৯ রানে আউট হয়েছিলাম। তার পর শুধু চেয়েছিলাম, দলের জন্য আরও বেশি রান করতে এবং বড় ইনিংস খেলতে। ২০০, ২৫০ বা ৩০০ রান করার কথা মাথায় ছিল না। ২০০ রানে পৌঁছনোর সময় আমাদের সাত উইকেট পড়ে গিয়েছিল। তাই শুধু আরও রান করে যেতে চেয়েছিলাম।’
শেষ উইকেটে ১৮৯ রানের জুটি, ৪০০ করেই থামলেন চিন্ময়
মিজোরামের তখন ন'টি উইকেট পড়ে গিয়েছে। শেষ ব্যাটার লালরেমপুইয়া চাকছুয়াককে সঙ্গে নিয়ে লড়াই শুরু করেন চিন্ময়। সেই পিচে প্রথম ইনিংসে লিড নিয়ে তিন পয়েন্ট পেতে হলে মিজোরামের বড় রান করা প্রয়োজন ছিল। তাই শেষ উইকেটেও রান তোলার চেষ্টা থামাননি তাঁরা। শেষ পর্যন্ত দু'জনে মিলে ১৮৯ রান যোগ করেন। রঞ্জি ট্রফির ইতিহাসে শেষ উইকেটে এটি তৃতীয় সর্বোচ্চ রানের জুটি। ৭৬ বলের ইনিংসে লালরেমপুইয়াকে শরীরে একাধিক বলের আঘাতও সহ্য করতে হয়েছে। অন্য দিকে, অধিকাংশ রানই করেন চিন্ময়। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন ৩৫০ রানে আট উইকেট হারিয়ে ফেলেছিলাম, তখন ভেবেছিলাম দলকে অন্তত ৪৫০ রানে পৌঁছে দিতে হবে। সতীর্থদের সঙ্গে কথা বলছিলাম, কী ভাবে ২০ বা ২৫ রানের ছোট ছোট জুটি গড়ে ওই লক্ষ্যে পৌঁছনো যায়।’
৩৮০ রানের কাছাকাছি পৌঁছনোর পরই চিন্ময়ের মনে হয়, বিশেষ কিছু একটা ঘটতে চলেছে। ড্রেসিংরুম থেকে সতীর্থদের উচ্ছ্বাস শুনতে পাচ্ছিলেন তিনি। বিপক্ষ দলের ক্রিকেটাররাও তাঁর সম্ভাব্য নজির নিয়ে আলোচনা করছিলেন। শেষ পর্যন্ত ৪০০ রানে পৌঁছতেই ইনিংস ঘোষণা করে মিজোরাম। দুই দলের ডাগআউট থেকেই উঠে দাঁড়িয়ে অভিনন্দন জানানো হয় তাঁকে। মিজোরামের স্কোর তখন ৫৮১। দলের জন্য সেটাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দিনের খেলা শেষ হওয়ার পর প্রথমেই বাবাকে ফোন করেন চিন্ময়। তাঁর বাবা রাজেশ সুতারও এক সময়ে মুম্বইয়ের ক্রিকেটমহলে পরিচিত মুখ ছিলেন। ছক্কা মারার দক্ষতার জন্য নব্বইয়ের দশকে নাম করেছিলেন তিনি। মুম্বইয়ের হয়ে সাতটি রঞ্জি ট্রফি ম্যাচ এবং ৩০টি লিস্ট ‘এ’ ম্যাচ খেলেছেন রাজেশ।
১৯৯৮ সালে স্টিভ ওয়ার নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়া ভারত সফরে এলে মুম্বইয়ের হয়ে একটি প্রস্তুতি ম্যাচে সচিন তেন্ডুলকরের সঙ্গে ব্যাট করেছিলেন রাজেশ। সেই ম্যাচে শেন ওয়ার্নের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করেন দু'জনে। মাত্র ১৫ ওভারে ৯৭ রান যোগ করেন সচিন ও রাজেশ। রাজেশ ৪৩ বলে ৪৫ রান করেছিলেন, তাঁর ইনিংসে ছিল ছ'টি চার। অন্য দিকে, সচিন অপরাজিত ছিলেন ২০৪ রানে। ক্রিকেটের এমন পরিবেশেই বড় হয়েছেন চিন্ময়। তবে বাবার মতো মুম্বইয়ের সিনিয়র দলে জায়গা করে নেওয়ার লড়াইটা তাঁর জন্য মোটেও সহজ ছিল না।
মুম্বইয়ে সুযোগ না পেয়ে দলবদল, লন্ডন থেকে মিজোরামে
মহারাষ্ট্রের পালঘর জেলার উপকূলবর্তী শহর চিনচানিতে ছোটবেলার একটা সময় কাটে চিন্ময়ের। সেখানেই বড় হয়েছিলেন তাঁর বাবা। পরিবারের কাকা ও দাদুও ক্রিকেট খেলতেন। তাঁদের খেলা দেখেই এই খেলার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় চিন্ময়ের। ১১-১২ বছর বয়সে পরিবার থানে চলে আসে, যাতে ক্রিকেটে আরও ভালো সুযোগ পান তিনি। শুরুতে লেগ স্পিনার ছিলেন চিন্ময়। তাঁর আদর্শ ছিলেন শেন ওয়ার্ন। মুম্বইয়ের অনূর্ধ্ব-১৪ এবং অনূর্ধ্ব-১৬ দলের সম্ভাব্য ক্রিকেটারদের তালিকাতেও জায়গা পেয়েছিলেন তিনি। পরে স্কুল ও ক্লাব ক্রিকেটে রান করতে শুরু করলে ব্যাটিংয়ের দিকে বেশি মন দেন। মুম্বইয়ের অনূর্ধ্ব-২৩ দলকে নেতৃত্বও দিয়েছেন। সিকে নাইডু ট্রফিতে চারটি ম্যাচে দলের অধিনায়ক ছিলেন। ২০১৯ সালে এসিসি এমার্জিং টিমস এশিয়া কাপে ইন্ডিয়া এমার্জিং দলের হয়েও খেলেন তিনি। হংকংয়ের বিরুদ্ধে শতরান করেছিলেন।
কিন্তু এত কিছু করার পরেও মুম্বইয়ের সিনিয়র দলে নিয়মিত সুযোগ পাননি চিন্ময়। ভারতের অন্যতম শক্তিশালী ঘরোয়া দল মুম্বইয়ে জায়গা পাওয়া বরাবরই কঠিন। ২০২৩ সালে BCCI কেন্দ্রীয় চুক্তিতে থাকা ক্রিকেটারদের ঘরোয়া ম্যাচ খেলার নির্দেশ দেওয়ার পর প্রতিযোগিতা আরও বেড়ে যায়। মুম্বই প্রিমিয়ার লিগে ধারাবাহিক ভাবে রান করেও লাভ হয়নি। ২০২৫ সালে মারাঠা রয়্যালস মুম্বই প্রিমিয়ার লিগ জেতার পথে চিন্ময় সাত ম্যাচে ২৭১ রান করে দলের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হয়েছিলেন। চলতি মরশুমেও দলকে শিরোপা জেতাতে সাহায্য করেন তিনি। এ বারও প্রতিযোগিতার পঞ্চম সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন। কিন্তু মুম্বইয়ের সিনিয়র দলে জায়গা মেলেনি।
চিন্ময় বলেন, ‘আমি সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকদের মধ্যে ছিলাম। তার পরেও মুম্বইয়ের সম্ভাব্য দলে জায়গা পাইনি। তখনই অন্য দলের হয়ে খেলার কথা ভাবতে শুরু করি। পরে মিজোরাম থেকে সুযোগ আসে। তাই দল বদলানোর সিদ্ধান্ত নিই।’ মুম্বই ছেড়ে যাওয়া সহজ ছিল না তাঁর কাছে। ক্রিকেট জীবনের পুরোটাই কেটেছে এই শহরে। মুম্বইয়ের হয়ে রঞ্জি ট্রফি খেলার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। কিন্তু ২৯ বছর বয়সেও সেই সুযোগ না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত অন্য পথ বেছে নেন।
সেই সময় ইংল্যান্ডে ব্রন্ডেসবেরি ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে খেলছিলেন চিন্ময়। ২০২৩ সাল থেকে ইংল্যান্ডে ক্লাব ক্রিকেট খেলতে যাচ্ছিলেন তিনি। কেন্টের ফোকস্টোন ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে প্রথম পূর্ণ মরশুমেই লিগের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হয়েছিলেন। মিজোরাম ট্রায়ালের ডাক পাওয়ার পর দেশে ফিরে সুযোগ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ে ছিলেন তিনি। বাবা তাঁকে সুযোগটা কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন। লন্ডন থেকে ভারতে ফিরে মাত্র দু'ঘণ্টার ট্রায়াল দিয়েই আবার ইংল্যান্ডে ফিরে যান চিন্ময়। দু'সপ্তাহ পর জানতে পারেন, মিজোরাম দলে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। মুম্বইয়ের ক্রিকেট জীবনে যাঁরা তাঁকে সাহায্য করেছেন, তাঁদের কথাও ভোলেননি চিন্ময়। মারাঠা রয়্যালসের মেন্টর অভিষেক নায়ার এবং মুম্বইয়ের বর্তমান অধিনায়ক সিদ্ধেশ লাডের অবদানের কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেছেন তিনি। গত বছরের বিজয় হাজারে ট্রফিতে রোহিত শর্মার সঙ্গে ড্রেসিংরুম ভাগ করে নেওয়ার অভিজ্ঞতাও তাঁর কাছে স্মরণীয়।
মুম্বই থেকে আবার ডাক পেলে ফিরবেন কি না, সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি চিন্ময়। তাঁর কথায়, ‘আমি জানি না। এই প্রশ্নের কোনও উত্তর আমার কাছে নেই। আমি বর্তমানে থাকতে পছন্দ করি। ভবিষ্যতে কী হবে, তা নিয়ে এখনই ভাবতে চাই না।’