
কেন বিপাকে রোহিত? গ্রাফিক্স: রাতুল মণ্ডল
Published on
:
3 min read
’‘হইহই করব বলে, কোমর দুলে, দু’হাত তুলে...’ পুজো শেষ। আজ ত্রয়োদশী। তবু এই গানটা এখনও অনেকেরই কানে বাজছে। কেউ আবার অফিসে কাজের ফাঁকে গুনগুন করে গেয়েও উঠছেন। এ বছর পুজোয় পাড়ার প্যান্ডেল থেকে সোশ্যাল মিডিয়ার রিল, সর্বত্র এই গান ছেয়ে গিয়েছে। ‘দুগ্গা ঠাকুর আসবে বলে’ প্রবাসের বাঙালিরাও কোমর দুলিয়েছেন এই গানে। ইনস্টাগ্রামের অসংখ্য রিলই তার প্রমাণ। পুজোর গান নিয়ে বাঙালি একটু যেন বেশিই স্পর্শকাতর।
‘মহুয়ায় জমেছে আজ মৌ গো’ থেকে ‘কত যে সাগর নদী’... এমন কতশত গান বছরের যে কোনও সময়ে পুজোর আমেজ ফিরিয়ে আনে। তবে এ বছর পুজোয় সমস্ত নস্ট্যালজিয়াকে পিছনে ফেলে যে গান বাঙালির মুখে মুখে ঘুরল, সেই গানের জন্মবৃত্তান্ত নিয়ে চরম কৌতূহল তৈরি হয়েছে শ্রোতাদের মধ্যে। গানটি কে গেয়েছেন, কার লিরিক্স, কার সুর... এমন নানা প্রশ্ন বার বার উঁকি দিচ্ছে অনেকের মনেই। খোঁজখবর করতে গিয়ে জানা গেল, গানটি গেয়েছেন পেশায় ইঞ্জিনিয়ার রোহিত সাহা। গানের কথা এবং সুরও তাঁরই।
দমদম নিবাসী রোহিত চাকরির পাশাপাশি গানবাজনাও করেন। তিনি জানালেন, এই গান এক বছরের পুরোনো। ২০২৫ সালে পুজোর ১০-১২ দিন আগে গানটি রিলিজ় করে। তখন অবশ্য খুব বেশি মানুষের কাছে গানটি পৌঁছয়নি। গানের ভিউ হাজার ৩০-এর গণ্ডিতেই আটকে ছিল। এই সময় অনলাইনকে রোহিত বলেন, ‘ভিউ নিয়ে আমার বিশেষ কোনও এক্সপেক্টশনও ছিল না। কারণ আমি কোনও আশা নিয়ে গান বানাই না। ভালোলাগে, তাই স্রেফ ভালোবেসেই গান তৈরি করি। তবে এ বছর আমার এই গানটা যে এত মানুষ ভালোবাসবেন, ভাইরাল হবে... সত্যিই সেটা ভাবিনি। বাঙালিরা তো বটেই, অসম থেকেও বেশ কিছু কভার ভিডিয়ো হয়েছে গানটার।’
গানজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে নানা গল্প। সারাবছর অন্য শহরে থাকলেও, পুজোর সময় শিকড়ের কাছে ফেরার যে তাগিদ, সেই অনুভূতি নিয়ে গান বুনেছেন রোহিত। গান তৈরির ভাবনার মালিক তিনি একা নন। শিল্পী জানিয়েছেন, এই গান তৈরির অনুপ্রেরণা তাঁর প্রেমিকার দাদা। কেমন সে গল্প?
খোলসা করলেন রোহিত। তিনি বলেন, ‘আমার প্রেমিকার দাদা বাইরে থাকেন। সে বার পুজোয় ওঁর বাড়ি ফেরা নিয়ে টানাপড়েন চলছিল। তখনই আইডিয়াটা আমার মাথায় খেলে যায়। কিছু মানুষ পুজোয় ফিরতে পারবেন, কিছু মানুষ ফিরতে পারবেন না এবং সেই আক্ষেপ থেকে যাবে তাঁদের মনে। সেই ভাবনা থেকেই লিখেছিলাম: যারা পাচ্ছে ছুটি, আসছে ছুটে / বাই রোডে বা ফ্লাইং রুটে।’ তবে গানটা ভাইরাল হতেই নাকি প্রেমিকা বেশ বিরক্ত হয়েছিলেন, জানাচ্ছেন রোহিত।
কারণ পুরো গানটা না শুনে শুধু হুকলাইনটা দিয়েই সবাই রিল বানাচ্ছেন। রোহিত জানান, বিষয়টি কিছু ক্ষেত্রে তাঁর কাছেও বিরক্তিকর। গানের ভাবনার অনুপ্রেরণা প্রেমিকার দাদা হলেও, গানটির জন্ম নাকি মেট্রোতে! রোহিত জানান, একদিন তিনি দমদম থেকে মেট্রোয় চেপে টালিগঞ্জ (উত্তমকুমার) যাচ্ছিলেন। ভিড় মেট্রোয় ভাগ্যক্রমে একটা বসার জায়গা পেয়ে যান। সুর আগেই বেঁধে রেখেছিলেন। মেট্রোয় বসে ফোনে গানের কথা লিখে ফেলেন। রোহিত বলেন, ‘অনেকেই এটা বিশ্বাস করতে চান না। বিশ্বাস করানোর কোনও দায়ও আমার অবশ্য নেই। তবে হ্যাঁ, সত্যিই মেট্রোয় বসেই গানটা লিখেছি।’
এই গান নিয়ে হইচই যেমন হয়েছে কিংবা হচ্ছে, তেমনই দোসর রূপে জুড়ে গিয়েছে বিতর্কও। গানটি ভাইরাল হতেই কপিরাইট নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। একটি মিউজ়িক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম থেকে গানটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে রোহিত বলেন, ‘যেহেতু বিষয়গুলি নিয়ে আইনি পদক্ষেপ করেছি, তাই কোনও সংস্থা কিংবা ব্যক্তির নাম প্রকাশ্যে বলার নিয়ম নেই। তবে হ্যাঁ এটা ঠিক যে, গানটির সত্ত্ব দাবি করেছিলেন কিছু ব্যক্তি।’ উক্ত স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম থেকে একটা বট অ্যাটাক করে গানটা সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, এমনটাই অভিযোগ রোহিতের। তাঁর সংযোজন, ‘তারপর আমি থানা পুলিশ করি এবং গানটা ওই মিউজ়িক স্ট্রিমিং অ্যাপ-এ আবার ফেরত আসে।’ কিন্তু তাঁর মতো একজন নবাগত শিল্পীকে আক্রমণ করার কারণ কী হতে পারে?
রোহিতের ব্যাখ্যা, ‘পুজোতে অনেক গানই রিলিজ় করে। এ বার একটা গান লাখ লাখ মানুষ ব্যবহার করতে শুরু করলে তো অনেকেরই গাত্রদাহ হতে পারে। সব গান ছাপিয়ে যদি একটা গানই মাথা তুলে দাঁড়ায়, তা হলে কোনও কম্পিটিটর তো চাইবেই... সেটা যে-ই হোক। তা-ই হয়তো সরিয়ে দেওয়ার ভাবনা।’ গানটি মুছে ফেলার সম্ভাব্য আরও একটি কারণের কথাও জানালেন রোহিত।
তাঁর কথায়, ‘এই গানটাই কপি করে কোনও গান হয়তো তৈরি করার করার প্ল্যান চলছিল। আসল গানটা থাকলে সেই পরিকল্পনা বানচাল হয়ে যেত। ইতিমধ্যে আমার গান থেকে নকল করে একটি গান ঘুরছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। যেটা সম্পূর্ণ ভাবে আমার গান থেকে টোকা এবং কপি করা। আমি সেটা নিয়েও আইনি জটিলতায় ফেঁসে আছি এই মুহূর্তে।’
অবশ্য এই গান থেকে পাওয়া সমস্ত প্রাপ্তির ভাগীদার যে একা তিনি নন, সেটা জানিয়েছেন রোহিত। তিনি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন গানটিকে ইন্সট্রুমেন্টালাইজ় করা এবং মিক্সিংয়ের দায়িত্বে থাকা জ়াকির উদ্দিন খাঁকে। সেই সঙ্গে মিউজ়িক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ‘ইসি মিউজ়িক’-কেও ধন্যবাদ দিয়েছেন গানটি পাবলিশ করার জন্য। রোহিতের কথায়, ‘গানের ক্রেডিটটা আমাদের তিনজনেরই পাওয়ার কথা। এবং আমরা তিনজনই পাচ্ছি। তাতেই আমরা খুব খুশি।’
