দীর্ঘ ১৬ বছর পর দেশের শেয়ারবাজারে বেসরকারি খাতের কোম্পানিগুলোর জন্য আবারও উন্মুক্ত হলো সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ। প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে নতুন শেয়ার ছাড়ার পরিবর্তে বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ার বিক্রি করে শেয়ারবাজারে আসতে পারবে যোগ্য কোম্পানিগুলো। টানা দুই বছরের বেশি সময় ধরে আইপিওশূন্য বাজারে নতুন কোম্পানি আনতে এ উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। তবে অতীতের বিতর্কের
পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এবার আর্থিক সক্ষমতা, শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ ও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে রাখা হয়েছে একাধিক শর্ত। ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বিধিমালা, ২০২৬’-এর গেজেট গত সোমবার প্রকাশ করা হয়েছে।
জানা যায়, ২০১০ সালে খুলনা পাওয়ার ও ওশান কনটেইনারের তালিকাভুক্তি নিয়ে বিতর্কের পর বেসরকারি কোম্পানির জন্য ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের সুযোগ বন্ধ রাখা হয়েছিল। তখন এ সুবিধা শুধু সরকারি কোম্পানির জন্য সংরক্ষিত করা হয়। তবে পরবর্তী সময়ে কোনো সরকারি কোম্পানিও এ পদ্ধতিতে তালিকাভুক্ত হয়নি। এরপর ২০১৪ সালে আমান সিমেন্ট এবং ২০২২ সালে বেস্ট হোল্ডিংস সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে শেয়ার বিক্রির চেষ্টা করলেও বিএসইসি তা আটকে দেয়। অন্যদিকে ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত পাঁচটি বেসরকারি কোম্পানির অভিজ্ঞতাও এক রকম নয়। ২০০৯ সালে তালিকাভুক্ত নাভানা সিএনজি ও ২০১০ সালে তালিকাভুক্ত খুলনা পাওয়ার বর্তমানে ‘জেড’ ক্যাটেগরিতে রয়েছে। ২০০৮ সালে তালিকাভুক্ত শাইনপুকুর সিরামিক রয়েছে ‘বি’ ক্যাটেগরিতে। ওশান কনটেইনার পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়িক পুনর্গঠনের মাধ্যমে একই ব্যবসায়িক গ্রুপের সামিট অ্যালায়েন্স পোর্টের সঙ্গে একীভূত হয়েছে। অন্যদিকে সরাসরি তালিকাভুক্ত এসিআই ফর্মুলেশন এখনও সন্তোষজনক অবস্থানে রয়েছে।
কারা পাবে তালিকাভুক্তির সুযোগ : নতুন বিধিমালায় সব কোম্পানির জন্য এ সুযোগ রাখা হয়নি। সরকারের সম্পূর্ণ বা সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ১০ শতাংশ সরকারের মালিকানায় থাকা কোম্পানি এবং সম্পূর্ণ বা সংখ্যাগরিষ্ঠ বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানি এ প্রক্রিয়ায় আসতে পারবে। এ ছাড়া সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী অন্তত ৫০০ কোটি টাকা নিট সম্পদসম্পন্ন তফসিলি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা কোম্পানি এবং বছরে অন্তত এক হাজার কোটি টাকা টার্নওভার রয়েছে— এমন কোম্পানি যোগ্য হবে। স্টক এক্সচেঞ্জ, ডিপোজিটরি এবং ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট কোম্পানিও এ সুযোগ পাবে। কমিশন চাইলে অন্য কোম্পানিকেও যোগ্য হিসেবে নির্ধারণ করতে পারবে। তবে যোগ্য শ্রেণিতে থাকলেই তালিকাভুক্ত হওয়া যাবে না। কোম্পানিকে পাবলিক লিমিটেড হতে হবে এবং আবেদন করার আগে অন্তত পাঁচ বছর বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। আগের দুই অর্থবছরে মূল ব্যবসা থেকে মুনাফা অর্জন, সর্বশেষ অর্থবছরে পরিচালন কার্যক্রম থেকে ইতিবাচক নগদ প্রবাহ এবং কোনো পুঞ্জীভূত লোকসান না থাকার শর্তও রয়েছে। কোম্পানি, উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের ঋণখেলাপি হওয়া চলবে না। পাশাপাশি নিবন্ধিত ক্রেডিট রেটিং প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিনিয়োগযোগ্য মানের ঋণমান নিতে হবে। আর্থিক বিবরণী আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান (আইএফআরএস) অনুযায়ী তৈরি এবং নির্ধারিত নিরীক্ষা মান অনুসারে নিরীক্ষিত হতে হবে।
রেফারেন্স মূল্যের চেয়ে ২৫ শতাংশ কমে শুরু : নতুন নিয়মে উদ্যোক্তা, পরিচালক ও প্রাথমিক শেয়ারহোল্ডাররা বিদ্যমান শেয়ার বিক্রি করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে। তবে নতুন শেয়ার ইস্যু করে কোম্পানির জন্য অর্থ সংগ্রহ করা এ প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য নয়; বিক্রির অর্থ পাবেন সংশ্লিষ্ট শেয়ারহোল্ডাররা। মার্চেন্ট ব্যাংকারের পরামর্শে কোম্পানির সম্পদ, দায় ও আয় বিবেচনা করে শেয়ারের রেফারেন্স মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। এর অন্তত ২৫ শতাংশ কমিয়ে নির্ধারণ করতে হবে সর্বনিম্ন প্রস্তাবিত বিক্রয়মূল্য। তালিকাভুক্তির প্রথম দিনে প্রথম দুই ঘণ্টা থাকবে মূল্য অনুসন্ধানের সময়। এ সময়ে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কেনার প্রস্তাব দিতে পারবেন, তবে বিক্রেতারা বিক্রয়াদেশ দিতে পারবেন না। এরপর বাজারে প্রচলিত সর্বোত্তম দামে শেয়ার বিক্রি হবে। প্রথম দুই লেনদেন দিবসে একক আদেশে ১০০টির কম বা এক হাজারের বেশি শেয়ার কেনার আদেশ গ্রহণ করা হবে না। একই সঙ্গে একজন ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বিক্রির জন্য নির্ধারিত মোট শেয়ারের সর্বোচ্চ ১ শতাংশ কিনতে পারবেন।
মালিকানা ধরে রাখার বাধ্যবাধকতা : তালিকাভুক্তির পর উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ৩০ শতাংশ শেয়ার ধরে রাখতে হবে। পরবর্তী সময়েও এ ন্যূনতম মালিকানা বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিএসইসির প্রত্যাশা, নতুন বিধিমালার মাধ্যমে দীর্ঘ ও জটিল আইপিও প্রক্রিয়ায় আগ্রহী নয়— এমন বড় ও আর্থিকভাবে সক্ষম কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারে আসার সুযোগ পাবে। তবে এ উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে যোগ্য কোম্পানির অংশগ্রহণ, শেয়ারের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগের ওপর।
