মানুষ ভবিষ্যতের কথা ভেবেও বর্তমানের খরচ নির্ধারণ করে। যদি কেউ জানে, আগামী মাসে তার বেতন বাড়বে, তবে সে এখন থেকেই স্বচ্ছন্দে খরচ করবে। অন্যদিকে, ছ’-মাস পর চাকরি যাওয়ার ভয় থাকলে এখন পকেটে টাকা থাকলেও সে সঞ্চয়ী হবে। এই তত্ত্বের জন্য এ বছর অর্থনীতিতে নোবেল স্বীকৃতি পেলেন রবার্ট হল ও মাইকেল উডফোর্ড। লিখছেন সুজনকুমার দাস।
২০২৬ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন রবার্ট হল এবং মাইকেল উডফোর্ড। তাঁদের গবেষণার বিষয়টি শুনতে তাত্ত্বিক মনে হলেও, এর অন্তর্নিহিত বার্তাটি একেবারে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত। অর্থনীতি কেবল এখনকার জমা-খরচের হিসাবে চলে না; বরং আগামী কালের আশা এবং আশঙ্কার উপর ভিত্তি করে ওঠানামা করে। একজন সাধারণ মানুষ যদি আশঙ্কা করে যে, ভবিষ্যতে তার চাকরি নাও থাকতে পারে, তবে আজ পকেটে টাকা থাকা সত্ত্বেও সে খরচ করবে না। একই ভাবে, বিক্রেতা যদি মনে করে আগামীতে জিনিসের দাম বাড়বে, তবে সে এখন থেকেই দাম বাড়িয়ে দেবে। এই ‘প্রত্যাশা’-ই হল বাজারের মূল চালিকাশক্তি। ভারতের বর্তমান মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রবৃদ্ধি-সংক্রান্ত উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে এই তত্ত্বটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা।
আধুনিক অর্থনীতির ‘জনক’ অ্যাডাম স্মিথ মনে করতেন, বাজারের একটি ‘অদৃশ্য হাত’ রয়েছে। ক্রেতা-বিক্রেতা নিজেদের স্বার্থে কাজ করলেও বাজার স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি ভারসাম্য তৈরি করে নেয়, যেখানে সরকারের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই। কিন্তু ১৯২৯ সালের ‘মহামন্দা’– এই ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। বাজার ধসে পড়ে, কোটি কোটি মানুষ বেকার হয়ে যায় এবং বাজার নিজ থেকে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। তখন অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইন্স এক নতুন দিশা দেখান। তিনি বলেন, মন্দার সময় সরকারকে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না; বরং সরকারি ব্যয় বাড়াতে হবে, কর কমাতে হবে এবং সুদের হার কমিয়ে মানুষের হাতে টাকা পৌঁছে দিতে হবে। এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে এবং বাজার চাঙ্গা হবে। ভারতেও বিভিন্ন সময়ে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, জিএসটি কমানো, আয়করে ছাড় বা কর্পোরেট কর ৩০% থেকে কমিয়ে ২২% করার মতো পদক্ষেপে এই কেইন্সীয় নীতির প্রতিফলন দেখা যায়।
বিক্রেতা যদি মনে করে আগামীতে জিনিসের দাম বাড়বে, তবে সে এখন থেকেই দাম বাড়িয়ে দেবে। এই ‘প্রত্যাশা’-ই হল বাজারের মূল চালিকাশক্তি। ভারতের বর্তমান মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রবৃদ্ধি-সংক্রান্ত উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে এই তত্ত্বটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা।
কেইন্সের তত্ত্ব দীর্ঘদিন সফলভাবে কাজ করলেও, সাতের দশকে বিশ্ব অর্থনীতি ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ নামক এক অদ্ভুত সংকটের মুখে পড়ে। যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। ফলস্বরূপ, অর্থনীতিতে একসঙ্গে তিনটি সংকট দেখা দেয়– মূল্যবৃদ্ধি, প্রবৃদ্ধির পতন এবং ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব।
অর্থনীতিবিদরা তখন বুঝতে পারেন, কেবল মানুষের কেনাকাটা বা চাহিদা বাড়লেই মূল্যবৃদ্ধি হয় না; উৎপাদন বা কঁাচামালের খরচ বাড়লেও জিনিসের দাম বাড়ে। তেলের দাম বাড়লে মানুষের কেনাকাটা কমলেও সবকিছুর দাম বাড়তে বাধ্য। এই পরিস্থিতিতে কেবল সুদের হার কমিয়ে বা বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তখন থেকেই অর্থনীতিতে মানুষের মনস্তত্ত্ব, ভয়, আশা এবং আস্থার মতো বিষয় গুরুত্ব পেতে শুরু করে। আর ঠিক এখান থেকেই রবার্ট হল এবং মাইকেল উডফোর্ডের তত্ত্বের সূত্রপাত।
রবার্ট হলের মূল প্রশ্ন ছিল– একটি পরিবার কত টাকা খরচ করবে, তা কীভাবে নির্ধারিত হয়? সাধারণ ধারণা হল, পকেটে টাকা থাকলেই মানুষ খরচ করে। কিন্তু হল তঁার বিখ্যাত ‘র্যান্ডম ওয়াক’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন, মানুষ ভবিষ্যতের কথা ভেবেও বর্তমানের খরচ নির্ধারণ করে। যদি কেউ জানে, আগামী মাসে তার বেতন বাড়বে, তবে সে এখন থেকেই স্বচ্ছন্দে খরচ করবে। অন্যদিকে, ছ’-মাস পর চাকরি যাওয়ার ভয় থাকলে এখন পকেটে টাকা থাকলেও সে সঞ্চয়ী হবে।
আবার প্রতিটি পরিবারের খরচ করার প্রবণতা আলাদা আলাদা। সরকার যদি প্রত্যেককে এককালীন ১০ হাজার টাকা দেয়, তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত বিত্তবান ব্যক্তি সেই টাকা জমিয়ে রাখবে। অন্যদিকে, দিনমজুর হয়তো নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার করতেই তা খরচ করে ফেলবে। অর্থাৎ, কেবল মানুষের হাতে টাকা গুঁজে দিলেই বাজার চাঙ্গা হয় না। চিকিৎসা, শিক্ষা, বা চাকরির মতো মৌলিক বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে মানুষ টাকা খরচ না করে জমিয়ে রাখে, ফলে বাজারে চাহিদাও তৈরি হয় না।
রবার্ট হলের মূল প্রশ্ন ছিল– একটি পরিবার কত টাকা খরচ করবে, তা কীভাবে নির্ধারিত হয়? সাধারণ ধারণা হল, পকেটে টাকা থাকলেই মানুষ খরচ করে। কিন্তু হল তঁার বিখ্যাত ‘র্যান্ডম ওয়াক’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন, মানুষ ভবিষ্যতের কথা ভেবেও বর্তমানের খরচ নির্ধারণ করে।
মাইকেল উডফোর্ডের তত্ত্বের মূল আলোচ্য– সুদের হারই কি শেষকথা? উডফোর্ড বিষয়টি দেখেছেন কর্পোরেট বিনিয়োগের দৃষ্টিকোণ থেকে। একটি কোম্পানি যখন নতুন কারখানা তৈরির জন্য ঋণ নিতে যায়, তখন তারা আগামী ৫ বছরে সুদের হার কেমন হবে, তা নিয়ে ভাবে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক যদি এখন সুদের হার ৬% রাখে, কিন্তু ভবিষ্যতের কোনও সুস্পষ্ট ইঙ্গিত না দেয়, তবে অনিশ্চয়তার ভয়ে কোম্পানি বিনিয়োগে পিছিয়ে যাবে।
উডফোর্ড প্রমাণ করেন, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র বর্তমান সুদের হার নয়, বরং ‘ফরওয়ার্ড গাইডেন্স’ বা আগাম দিকনির্দেশনা। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক যদি বাজারকে আশ্বস্ত করে যে, আগামী কয়েক বছর সুদের হার বাড়ানো হবে না, তবে ব্যবসায়ীদের মনে আস্থা ফেরে এবং বিনিয়োগ বাড়ে, কর্মসংস্থান তৈরি হয়।
একইভাবে, সাধারণ মানুষ ও বিক্রেতারা যদি বিশ্বাস করে যে, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম, তবে বাজারে অযথা দাম বাড়ানোর প্রবণতা কমে যায়। এখানে ‘বিশ্বাস’ বা আস্থা-ই সবচেয়ে বড় নিয়ামক।
এই নোবেলজয়ী তত্ত্ব থেকে ভারতের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য তিনটি বড় শিক্ষা পাওয়া যায়– প্রথমত, আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি আস্থার প্রয়োজন। ভারতের জিডিপি বাড়লেও সাধারণ মধ্যবিত্তর মনে ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা রয়েছে। সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত সুবিধার অভাব, বেসরকারি চিকিৎসায় বিপুল ব্যয়, শিক্ষার খরচ এবং চাকরির অস্থিরতার কারণে আয় বাড়লেও মানুষ বিপদের জন্য সঞ্চয় করছে। ভারতের অর্থনীতির প্রায় ৬০% নির্ভর করে অভ্যন্তরীণ কেনাকাটার ওপর। মানুষের মনে আস্থা ফেরাতে কেবল কর্মসংস্থান নয়, বরং স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে মানুষ নিশ্চিন্তে খরচ করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সুদের হার এবং প্রবৃদ্ধির ভারসাম্য রাখা প্রয়োজন। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক-কে প্রতিনিয়ত একটি কঠিন ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সুদ কমালে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা থাকে, আবার মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে সুদ বাড়ালে ইএমআই ও ঋণের খরচ বেড়ে যায়, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে বাধাগ্রস্ত করে। উডফোর্ডের তত্ত্ব অনুযায়ী, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক-কে কেবল সুদের হার পরিবর্তন করলেই হবে না, বরং তাদের ভবিষ্যৎ নীতি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সুস্পষ্ট ধারণা দিতে হবে। মানুষ সরকারের নীতি সুস্পষ্ট ভাবে বুঝতে পারলেই বাজারে স্থিতিশীলতা আসবে।
নোবেলজয়ী তত্ত্ব থেকে ভারতের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য তিনটি বড় শিক্ষা পাওয়া যায়– প্রথমত, আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি আস্থার প্রয়োজন। ভারতের জিডিপি বাড়লেও সাধারণ মধ্যবিত্তর মনে ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা রয়েছে।
তৃতীয়ত, কাঠামোগত সমস্যা সমাধানে জোর দিতে হবে। ভারতে পেঁয়াজ, টমেটো বা আলুর মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম মূলত বন্যা, খরা বা পরিবহণ সংকটের (জোগানজনিত) কারণে বাড়ে। এই ধরনের মূল্যবৃদ্ধি কেবল সুদের হার বাড়িয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। বরং এতে কৃষকের ঋণের খরচ আরও বেড়ে গিয়ে জিনিসের দাম উল্টে বাড়িয়ে দেয়। এর প্রকৃত সমাধান হতে পারে কাঠামোগত উন্নয়ন– উন্নত হিমাগার তৈরি, টেকসই যোগাযোগ ব্যবস্থা, এবং কৃষকের মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত সাপ্লাই চেনের আধুনিকীকরণ। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে একযোগে এই কাজ করতে হবে।
অর্থনীতি কেবল খাতা-কলমের অঙ্কের খেলা নয়, এটি মানুষের মনস্তত্ত্বের জটিল খেলা। মানুষ কোনও যন্ত্র নয় যে, টাকা পেলেই খরচ করবে; তারা আশা করে এবং ভয় পায়। ভবিষ্যৎ নিরাপদ মনে করলেই মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে খরচ ও বিনিয়োগ করে। ভারতের মতো বিশাল অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে হলে সরকারের রাজস্ব নীতি এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মুদ্রানীতির মধ্যে কেবল গাণিতিক সামঞ্জস্য থাকলেই হবে না, সাধারণ মানুষের মনে আস্থা ও ভরসা তৈরির সমন্বয়ও থাকতে হবে। মানুষ যখন বিশ্বাস করবে– আগামী দিন এখনকার চেয়ে সুরক্ষিত, ঠিক তখনই অর্থনীতির চাকা সত্যিকারের গতি ফিরে পাবে।
(মতামত নিজস্ব)
