চট্টগ্রামে অগ্রণী ব্যাংকের লালদিঘী পূর্ব করপোরেট শাখার ভল্ট থেকে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ব্যাংকটির ক্যাশ ইনচার্জসহ দুজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুদকের চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়-১ এ মামলাটি নথিভুক্ত হয়। দুদকের উপপরিচালক মো. আল আমিন বাদী হয়ে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০ ও ১০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলাটি করেন।
বিষয়টি দুদকের উপপরিচালক মো. আল আমিন কালবেলাকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, তদন্তে নতুন তথ্য বা অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
মামলার প্রধান আসামি মো. কামরুল হোসেন (৪১) ব্যাংকটির ওই শাখার সিনিয়র অফিসার ও ক্যাশ ইনচার্জ ছিলেন। অপর আসামি মো. জাফরুল্লাহ তানভীর (২৫)। দুদকের এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, ভল্টে টাকা জমা দেখানোর সময় এক হাজার টাকার নোটের বান্ডেলের মধ্যে ১০০ টাকা বা তার চেয়ে কম মূল্যমানের নোট ঢুকিয়ে হিসাব মেলানোর কৌশল ব্যবহার করা হতো। আত্মসাৎ করা অর্থের একটি অংশ দিয়ে হাটহাজারীতে ইশরাত অ্যাগ্রো নামে একটি গরুর খামার গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে।
দুদকের এজাহার সূত্রে জানা গেছে, কামরুল হোসেন অগ্রণী ব্যাংকের লালদিঘী পূর্ব করপোরেট শাখার ক্যাশ ও ভল্টের দায়িত্বে ছিলেন। ব্যাংকের অফিস স্টাফ শিহাবের মাধ্যমে তানভীরের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ২০২৬ সালের ৯ আগস্ট ব্যাংকের নিয়মিত লেনদেন শেষে নগদ অর্থের হিসাব মেলাতে গিয়ে গরমিল ধরা পড়ে। প্রাথমিক হিসাব-নিকাশ, ভল্টের হিসাব ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করে চার কোটি ৩৮ লাখ টাকার ঘাটতি পাওয়া যায়।
এজাহারে বলা হয়, হিসাবের গরমিলের বিষয়ে জানতে চাইলে কামরুল সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ একাধিকবার নগদ অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব চাইলেও তিনি তা উপস্থাপন করতে পারেননি। পরে ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার মোস্তাক আহমেদ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি জানতে পারেন।
ভল্টে নগদ অর্থ জমা দেখানোর সময় এক হাজার টাকার বড় বান্ডেলের ভেতরে ১০০ টাকা বা তার চেয়ে কম মূল্যমানের ছোট নোট ঢুকিয়ে রাখা হতো। এতে বাইরে থেকে বান্ডেল দেখে ভল্টে টাকা রয়েছে বলে মনে হলেও প্রকৃত অর্থের ঘাটতি আড়াল করা সম্ভব হতো। এভাবে হিসাব মেলানোর কৌশল ব্যবহার করে বিভিন্ন সময়ে টাকা ভল্টে না রেখে সরিয়ে নেওয়া হয়।
কামরুল ও তানভীরের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা কয়েকজনও এ প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন। আত্মসাৎ করা অর্থ ব্যবসায় বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তানভীরের কাছে স্থানান্তর করা হয়েছিল।
দুদকের এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, আত্মসাৎ করা অর্থ দিয়ে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার সুবুরিশ্চর এলাকায় ফজলদের আলী ফকির বাড়িতে ইশরাত অ্যাগ্রো নামে একটি গরুর খামারের কার্যক্রম শুরু করা হয়। সেখানে বর্তমানে বিভিন্ন জাতের ৫০ থেকে ৬০টি গরু রয়েছে।
এজাহারের বিবরণ অনুযায়ী, অর্থের ঘাটতি শনাক্ত হওয়ার পর ১০ আগস্ট কামরুল ও তানভীরকে ব্যাংকের ভেতরে আটক করে পুলিশে খবর দেওয়া হয়। পরে পুলিশ তাদের আটক করে থানায় নিয়ে যায়। এ ঘটনায় ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার মোস্তাক আহমেদ বাদী হয়ে কোতোয়ালী থানায় মামলা করেন। ওইদিন থানায় ২২ নম্বর মামলা হিসেবে সেটি নথিভুক্ত হয়।
দুদকের এজাহারে বলা হয়েছে, অভিযোগটি কমিশনের তফশিলভুক্ত হওয়ায় মামলার নথি পরে দুদকের চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়-১-এ পাঠানো হয়। গত ২৩ আগস্ট অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। এরপর ১৮ অক্টোবর প্রধান কার্যালয় থেকে নতুন করে মামলা করার অনুমোদন দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার দুদকের পক্ষ থেকে নিয়মিত মামলাটি করা হয়।
দুদকের অভিযোগ, সরকারি কর্মচারী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ক্ষমতার অপব্যবহার, অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ ও প্রতারণার মাধ্যমে কামরুল অর্থ আত্মসাৎ করেন এবং তানভীর তাকে সহযোগিতা করেন।
