ধর্মের মূল চেতনা ও আদর্শ শুধু উৎসব উদ্যাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দৈনন্দিন জীবন ও কর্মে প্রতিফলিত করার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি বলেছেন, ধর্মের প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিকতায়। ধর্মীয় শিক্ষাকে বাস্তব জীবনে ধারণ করতে পারলেই উৎসবের আয়োজন সার্থক হবে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে শারদীয় দুর্গাপূজার বিজয়া দশমী উপলক্ষে প্রতিমা বিসর্জন কার্যক্রম পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, ধর্ম সব সময় শান্তিময় পৃথিবীর বার্তা দেয়। আমরা ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করি, উৎসব উদ্যাপন করি। তবে এসব আয়োজন যেন কেবল বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। ধর্মের মহান আদর্শগুলো আমাদের কাজ ও আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ পেলেই সব আয়োজন অর্থবহ হয়ে উঠবে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জেলায় রেকর্ড ২ হাজার ৫৯৩টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা দেশের যেকোনো জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ। গত বছরের তুলনায় এবার জেলায় প্রায় ৪০০টি মণ্ডপ বেড়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় ২৭১টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবছরের মতো এবারও নগরীর অধিকাংশ মণ্ডপের প্রতিমা ঐতিহ্যবাহী পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে বিসর্জন দেওয়া হয়। বিপুলসংখ্যক ভক্তের উপস্থিতি সত্ত্বেও পুরো আয়োজন ছিল সুশৃঙ্খল।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, পূজা চলাকালে জেলার কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
এবারের দুর্গাপূজায় চট্টগ্রামজুড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল চিত্র ফুটে উঠেছে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, বিভিন্ন পূজামণ্ডপে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি মুসলিমসহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছেন। তাঁরা মণ্ডপের নিরাপত্তায় সহযোগিতা করার পাশাপাশি উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করেছেন। ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে মানুষের এই ঐক্যই বাংলাদেশের প্রকৃত ঐতিহ্য।
তিনি আরও বলেন, সম্প্রীতি বজায় রাখা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গত এক সপ্তাহে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রত্যন্ত এবং অতীতে গোলযোগের ঘটনা ঘটেছে—এমন এলাকার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়েছে।
অতীতে বাঁশখালীর পশ্চিম চাম্বল বাংলাবাজার জলদাশপাড়াসহ বিভিন্ন মন্দিরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছিল। এসব অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে এবার সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসক বাঁশখালীর পশ্চিম চাম্বল বাংলাবাজার সর্বজনীন বুড়া কালী মন্দির, শ্রীশ্রী অদ্বৈতানন্দ ঋষিমঠ ও মিশন, সাধনপুর পল্লিমঙ্গল সমিতি এবং বাণীগ্রাম জগন্নাথধামসহ বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর পাশাপাশি পুলিশ, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) এবং জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা দায়িত্ব পালন করেন।
এ ছাড়া বোয়ালখালীর ঐতিহাসিক মেধসমুনি আশ্রম ও লোহাগাড়ার প্রাচীন গুপ্তবাড়িসহ বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নারী পুণ্যার্থীদের মধ্যে শাড়ি বিতরণ এবং অসচ্ছল পূজামণ্ডপগুলোতে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়।
প্রতিমা বিসর্জনের ধর্মীয় তাৎপর্য তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, দুর্গাপূজার মূল শিক্ষা হলো অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে সমাজে শান্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা। বিসর্জনের মধ্য দিয়ে হিংসা ও ভেদাভেদ ভুলে নতুন করে মানবিক সমাজ গড়ার অঙ্গীকার করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চট্টগ্রাম সফরের প্রসঙ্গ তুলে জেলা প্রশাসক বলেন, প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—এই দেশ সবার। একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিরাপদে বসবাস করতে পারবে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিন, পতেঙ্গা সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহিদ ইসরাক এবং বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ, চট্টগ্রাম মহানগর শাখার নেতৃবৃন্দ।
সফলভাবে দুর্গাপূজা সম্পন্ন করতে সহযোগিতা করায় পূজা উদ্যাপন কমিটি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান জেলা প্রশাসক।
The post ধর্মের চেতনা শুধু উৎসবে নয়, প্রতিফলিত হোক কর্মে: ডিসি জাহিদুল ইসলাম appeared first on ভোরের চেতনা.
